বনভোজনের জের তিনদিন ধরে বিমানের ফ্লাইট লণ্ডভণ্ড

55

যুগবার্তা ডেস্কঃ শাহজালালের ব্যাগেজ এরিয়ায় দায়িত্ব পালন না করায় দুই কর্মচারীকে (শোকজ) কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়ায় ক্ষুব্ধ সিবিএ নেতারা তিনদিন ধরে বিমানের সব ফ্লাইট দেরিতে ছেড়েছে। হুমকি দিয়েছে অবিলম্বে তাদের নেতাকর্মীদের শোকজ প্রত্যাহার না করলে তারা বিমান ও বিমানবন্দর অচল করে দেবে। অপরদিকে সরকারি কার্য দিবসে বিমানের গ্রাউন্ড সার্ভিস ইকুইপমেন্ট শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পিকনিক করায় বৃহস্পতিবার শাহজালালের সব ফ্লাইট লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছিল। আজ অপর একটি শাখা আবারও পিকনিকের আয়োজন করেছে।
এতে আজও শাহজালালের গ্রাউন্ড সার্ভিস ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে বলে আশংকা করেছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় বিমান ম্যানেজমেন্ট ট্রাফিক ও জিএসই (গ্রাউন্ড সার্ভিস ইকুইপমেন্ট) বিভাগের দুই কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলে ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে সিবিএ নেতারা বিমানের সবগুলো ফ্লাইট দেরিতে ছাড়তে বাধ্য করেন। এদিকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নিয়ে সিবিএ নেতাদের এ ধরনের হুমকি ও ফ্লাইট দেরিতে ছাড়ার খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার বিমানবন্দরে ছুটে যান বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ও সচিব খোরশেদ আলম চৌধুরী। সিবিএর হুমকির মুখে তারা নতি স্বীকার করে বিমান ম্যানেজমেন্টকে দুই সিবিএ নেতার শোকজ প্রত্যাহার করে নেয়ার নির্দেশ দেন। মন্ত্রী-সচিবের এ নির্দেশনায় গোটা বিমানজুড়ে তোলপাড় উঠে। এর আগেও বিমানমন্ত্রী ও সচিবের নির্দেশে বিমানের একজন শীর্ষ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেনি বিমান ম্যানেজমেন্ট।
বিমান বোর্ডের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল জামাল আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ, বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল সানাউল হকসহ বিমান বোর্ড ওই কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। কিন্তু বিমান পরিচালনা পর্ষদ না থাকার অযুহাতে মন্ত্রী ও সচিব ওই দুর্নীতবাজ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত না করে তাকে পোস্টিং দেয়ার নির্দেশ দেন বিমানকে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বিমান সচিবের গ্রামের বাড়ির ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বিমান কর্তৃপক্ষ ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত ৩১ ডিসেম্বর বিমান বোর্ড ভেঙে দেয়া হয়েছে ঘোষণা দিয়ে পুরো বিমানের দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের কাঁধে নিয়ে নেয়া হয়। এরপরই বিমান বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে সচিবের নেতৃত্বে দুই মাস ধরে একাধিক সভা হয়। সভায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কোনো পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে এভাবে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয় নিতে পারে না।
৩ দিন ধরে বিমানের সব ফ্লাইট দেরিতে ছেড়েছে : বিমান সূত্রে জানা গেছে, ২ ফেব্রুয়ারি বিমানের কলকাতা-ঢাকা ফ্লাইটের ব্যাগেজ পেতে ৩/৪ ঘণ্টা দেরি হয়েছে। এ ঘটনায় শাহজালালে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। ব্যাগেজের জন্য দীর্ঘ সময় যাত্রীরা ভোগান্তি পোহান। ওই ফ্লাইটে আসা একজন মন্ত্রীর ব্যাগেজ পেতেও ২ ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছিল। বিমানের কাস্টমার সার্ভিস বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ওইদিন শাহজালালের লাগেজ এরিয়ার দায়িত্বে ছিলেন বিমান শ্রমিক লীগের প্রভাবশালী নেতা আলমগীর ও জাকির। বিমানের কোটিপতি হিসেবে পরিচিত এই দুই শ্রমিক লীগ নেতা দীর্ঘদিন লাগেজ এরিয়ায় কর্মরত আছেন। এখানে থেকে তারা আদম পাচার, সোনা পাচার ও বৈদেশিক মুদ্রা পাচারসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি করতেন। অভিযোগ আছে, সিবিএ নেতা মসিকুর ও মন্তাসারের ঘনিষ্ঠভাজন হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কেউ টুঁ শব্দ করতে পারছে না বিমানে। আমির (সি সিফট) নামে বিমানের গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগের আরেক দুর্নীতিবাজ গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিসটেন্টের সহায়তায় এই দুই সিবিএ নেতা দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে আদম পাচার করতেন। সম্প্রতি যুক্তরাজ্য এভিয়েশন গোয়েন্দা টিমের কড়াকড়ি আরোপের কারণে তাদের আদম পাচারে বিঘ্ন ঘটে। এতে তারা শাহজালালে কোনো ধরনের কাজকর্ম না করে ঘোরাফেরা করেন। এর আগেও তাদের বিরুদ্ধে একাধিকবার ব্যবস্থা নিতে গেলে সিবিএ নেতাদের হুমকির কারণে বিমান কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি। কাস্টমার সার্ভিস বিভাগের একজন শীর্ষ কর্তা জানান, খোদ মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের নির্দেশে আলমগীর ও জাকিরকে শোকজ করা হয়েছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার আবার সেই মন্ত্রী-সচিবের নির্দেশে তাদের শোকজ প্রত্যাহার করে নিতে হয়েছে।
২৩ ফেব্রুয়ারি সিবিএর খামখেয়ালি ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ৬টি ফ্লাইট গড়ে ৪৫ মিনিট থেকে ৪ ঘণ্টা দেরিতে ছাড়তে হয়েছে। ২৪ ফেব্রুয়ারি একই কারণে ৬টি ফ্লাইট ১ থেকে ৩ ঘণ্টা দেরিতে ছাড়তে হয়েছে বিমানকে। আর ২৫ জানুয়ারি ৭টি ফ্লাইট দেড় থেকে ৩ ঘণ্টা দেরিতে ছাড়তে হয়েছে। অভিযোগ, সিবিএ নেতারা ট্রাফিক ও গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে প্রতিটি ফ্লাইটে বিদ্যুৎ-পানি ও জ্বালানি দিতে দেরি করেছে। যথাসময়ে বোর্ডিং ব্রিজ তৈরি না করে ফ্লাইট ভিড়তে দেয়া হয়নি। বাস সার্ভিস বিলম্ব করে যাত্রীদের ফ্লাইটে উঠতে দেয়নি। উড়োজাহাজ উড্ডয়নের জন্য প্রয়োজনীয় মেশিনপত্র পুশকার্ট, পুশব্যাক, জিপিইউ মেশিন না এনে ফ্লাইট ছাড়তে দেরি করানো হয়েছিল।
সরকার সমর্থিত সিবিএ নেতাদের কাছে জিম্মি বিমান : সরকার সমর্থিত সিবিএ নেতাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্স। জানা গেছে, সরকার সমর্থিত বিমান শ্রমিক লীগের একাধিক শীর্ষ নেতা রয়েছেন যারা ছেলে, মেয়ে, আত্বীয়স্বজন এমনকি স্ব নামে ট্রেড লাইসেন্স করে বিমানের বিভিন্ন শাখায় টেন্ডারবাজি ও ব্যবসা করছেন। এরাই বিভিন্নভাবে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছে। এই খাত থেকেও ওই নেতাদের প্রতি মাসে আয় হয় শত কোটি টাকা।
ক্ষমতাসীন দলের ইউনিয়নের নেতা হলেই তাকে অফিস করতে হয় না। অফিস করা তো দূরের কথা উল্টো অনেকে অফিস না করেও বছরে লাখ লাখ টাকার ওভারটাইম বিল হাতিয়ে নিচ্ছেন। অনেক ইউনিয়ন নেতার ২/৩টি গাড়ি আছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিমান শ্রমিক লীগ নেতাদের অঙ্গুলীর নির্দেশনা অনুযায়ী চলছে বিমানের প্রশাসন। সব ধরনের অনিয়ম দুর্নীতির ঊর্ধ্বে এসব সিবিএ নেতারা। দুর্নীতি অনিয়ম করলেও কোনো তদন্ত করা যায় না তাদের বিরুদ্ধে। আর দুর্নীতিবাজ ইউনিয়ন নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে যদি কাউকে দায়িত্ব দেয়া হয় তাহলে ওই তদন্ত কর্মকর্তার রক্ষা নেই। তার বিরুদ্ধে মিছিল, স্লোগান, হুমকি, মিথ্যা অপবাদ, উড়ো চিঠি দিয়ে এমন অবস্থার সৃষ্টি করা হয় যাতে তদন্ত বেশি দূর এগোতে না পারে। এ ক্ষেত্রে বিমানের নিরাপত্তা ও তদন্ত শাখার কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত নাজেহাল হচ্ছেন এসব ইউনিয়ন নেতাদের হাতে। খোদ মন্ত্রী-সচিব তাদের হাতে জিম্মি।
বর্তমানে বিমানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ মোট ৪টি শ্রমিক সংগঠন আছে। এছাড়া আছে বিমান অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশন। এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন বিমান শ্রমিক ইউনিয়ন। জানা গেছে, যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন ওই সরকারের আওতাধীন শ্রমিক সংগঠনটি শক্তিশালী হয়- যার কারণে প্রশাসনের পাশাপাশি কর্মচারীরাও ওই শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের কথামতো চলে। এর আগে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীনও জাতীয়তাবাদাী শ্রমিক দল সিবিএর ক্ষমতায় ছিল।