বদর প্রধান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর

42

যুগবার্তা ডেস্কঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কুখ্যাত আল-বদর বাহিনীর প্রধান মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে পঞ্চম ব্যক্তির সর্বোচ্চ সাজার রায় কার্যকর হল। তিনি হলেন সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তৃতীয় ব্যক্তি যাকে এ দেশে দণ্ডিত হয়ে ফাঁসিকাষ্ঠে যেতে হল।
মঙ্গলবার মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে রাত ১২টা ৯ মিনিটে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।
চার দশক আগে তার পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছিল। প্রাণদণ্ডই তার একমাত্র সাজা হতে পারে বলে রায় দিয়েছিল সর্বোচ্চ আদালত।
গোলাম আযমের উত্তরসূরী হিসেবে ২০০০ সাল থেকে নিজামীই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন।গত মার্চে ৭৩ বছর পূর্ণ করেন এই যুদ্ধাপরাধী।
পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে পাবনার বাউশগাড়ি, ডেমরা ও রূপসী গ্রামের প্রায় সাড়ে ৪০০ মানুষকে হত্যা ও ৩০-৪০ জন নারীকে ধর্ষণ; পাবনার ধুলাউড়ি গ্রামে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ৫২ জনকে হত্যা এবং পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী গণহত্যার মতো ভয়ঙ্কর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত নিজামী মৃত্যুর আগেও তার কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করেননি।
দণ্ড কার্যকরের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাতেই নিজামীর লাশ নিয়ে যাওয়া হবে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ধোপাদহ ইউনিয়নের মন্মথপুর গ্রামে। সেখানেই পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
জামায়াত আমির নিজামীর মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন গত ৫ মে সর্বোচ্চ আদালতে খারিজ হয়ে যায়; সোমবার রায় যায় কারাগারে। এরপর ফাঁসিকাষ্ঠ এড়াতে তার সামনে খোলা ছিল শুধু রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সুযোগ।
নিজামী সেই সুযোগ না নেওয়ায় মঙ্গলবার বিকালে সরকার কারা কর্তৃপক্ষকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেয় বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানান।
জ্যেষ্ঠ জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির সন্ধ্যায় সরকারের ওই নির্বাহী আদেশ নিয়ে কারাগারে প্রবেশের পর পাল্টে যায় দৃশ্যপট।
ওই সময় কারাগার এলাকার নিরাপত্তা কয়েক গুণ বাড়ানো হয়। নাজিমউদ্দিন রোডে কারাগারের সামনের সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেন কারাগারের আশেপাশের উঁচু ভবনে।
কারা কর্তৃপক্ষ খবর দেওয়ার পর রাত পৌনে ৮টার দিকে তিনটি গাড়িতে করে স্ত্রী, দুই ছেলেসহ পরিবারের সদস্যরা কারাগারে যান জামায়াত আমির মতিউর রহমান নিজামীর সঙ্গে শেষ দেখা করতে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর কারাগার থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই বেরিয়ে যান তারা।
নিজামীর স্বজনরা বেরিয়ে যাওয়ার পর কারাগারসহ আশেপাশের এলাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেষ্টনীর মধ্যে নেওয়া হয়। রাতেই ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতির ইংগিত মিলতে থাকে কারা কর্তৃপক্ষের তৎপরতায়।
পরে সিভিল সার্জন আব্দুল মালেক মৃধা, ঢাকার জেলা প্রশাসক (জেলা ম্যাজিস্ট্রেট) মো. সালাউদ্দিন, অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মো. ইকবালসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কারাগারের ভেতরে ঢোকেন। অ্যাম্বুলেন্স এনে রাখা হয় কারাগারের ভেতরে।
নিয়ম অনুযায়ী ফাঁসির আসামি নিজামীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন হয়; ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মনির হোসেন ইসলামী রীতি অনুযায়ী তওবা পড়ান। এরপর আসামিকে কনডেম সেল থেকে নেওয়া হয় ফাঁসির মঞ্চে।
শীর্ষ এই যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর আসার সঙ্গে সঙ্গে কারাগারের বাইরে এবং শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে উল্লাস প্রকাশ করে জনতা। স্বস্তি প্রকাশ করে নিজামীর গ্রামের বাড়ি পাবনার মানুষ, যারা একাত্তরে এই জামায়াত নেতার যুদ্ধাপরাধের কারণে স্বজন হারিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নানাভাবে।
১৯৪৩ সালের ৩১ মার্চ, পাবনার সাঁথিয়ায় জন্ম নেওয়া মতিউর রহমান নিজামী নিখিল পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি হিসেবে পদাধিকার বলে আল-বদর বাহিনীর যুদ্ধাপরাধে নেতৃত্ব দেন। সে সময় বাংলাদেশের পতাকার বিরোধিতা করলেও স্বাধীন দেশে সেই নিজামীই মন্ত্রী হয়ে গাড়িতে পতাকা উড়িয়েছিলেন।
পাবনা-১ আসন থেকে তিনবার সাংসদ নির্বাচিত হওয়া নিজামীকে ২০০১ সালে মন্ত্রিত্ব দেন বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া। প্রথমে দুই বছর কৃষি মন্ত্রীর দায়িত্বে থেকে সরকারের পরের তিন বছর ছিলেন শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্বে।
ওই সময়েই ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার জন্য পাচারের পথে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়ে, যে মামলার রায়ে ২০১৪ সালে নিজামীর ফাঁসির আদেশ হয়। কন্টেইনার ডিপোর ইজারা নিয়ে গেটকো দুর্নীতি মামলারও আসামি ছিলেন তিনি।
মতিউর রহমান নিজামীর গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়াকে লাখো শহীদদের প্রতি চপেটাঘাত বলে মন্তব্য করা হয়েছিল যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে।
ট্রাইব্যুনালে রায়ে বলা হয়েছিল, মতিউর রহমান নিজামী বাঙালি জাতিকে সমূলে ধ্বংস করার লক্ষ্যে তরুণদের উসকে দিতে সচেতনভাবে ইসলাম ধর্মের অপব্যবহার করেছিলেন।
২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ওই রায়ে বলা হয়, “আদালত সম্মত হয়েছে যে, তিনি যে মাত্রায় হত্যা, গণহত্যা ঘটিয়েছেন, তাতে সর্বোচ্চ সাজা না দিলে তা হবে ন্যায়বিচারের ব্যর্থতা।”
গত ৬ জানুয়ারি আপিল বিভাগ সর্বোচ্চ সাজার রায়ই বহাল রাখে। গত ১৫ মার্চ প্রকাশিত ওই রায়ের ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপিতে বলা হয়, “মৃত্যুদণ্ড কমানোর মতো কোনো সুযোগ এ মামলায় নেই, বরং বাড়ানোর পরিস্থিতি রয়েছে।”
আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে নিয়ম অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে। পরদিন গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে ফাঁসির আসামি নিজামীকে তা পড়ে শোনায় কারা কর্তৃপক্ষ।
নিজামী ওই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করলে শুনানি শেষে গত ৫ মে আপিল বিভাগ তা খারিজ করে দেয়।
প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ও আপিল বেঞ্চের অন্য তিন বিচারকের দেওয়া রিভিউ খারিজের রায়ে বলা হয়, ওই আবেদনের কোনো সারবত্তা খুঁজে না পাওয়ায় তা খারিজ করা হল।
এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের এ মামলার সব আইনি লড়াইয়ের পরিসমাপ্তি হয়। সোমবার ওই রায় প্রকাশের পর কারা কর্তৃপক্ষ নিজামীকে তা পড়ে শুনিয়ে জানতে চায়- কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনার কথা জানিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে তিনি প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না।
একাত্তরের বদরপ্রধান নিজামী সেই সুযোগ নেননি। ২০১২ সালের ২৮ মে বিচার শুরুর হওয়ার চার বছর পর সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে মঙ্গলবার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হল।