বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতায় ইসলামের মর্যাদা ও মূল্যবোধ

সোহেল সানি:
বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি ঘোষণা করে বলেছিলেন, “যে দেশের শতকরা ৯৫ জনই মুসলমান সেই দেশে ইসলাম বিরোধী আইন পাসের কথা ভাবতে পারেন কেবল তারাই, যারা ইসলামকে ব্যবহার করেন দুনিয়াটাকে ফায়স্থা করে তোলার কাজে।
আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হয়, আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নই। সুস্পষ্ট বক্তব্য আমার, আমরা লেবেল সর্বস্ব ইসলামে বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে। আমাদের ইসলাম হযরত রসূলে করীম (সাঃ) এর ইসলাম। যে ইসলাম জগতবাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র। ইসলামের প্রবক্তা সেজে দেশের মাটিতে বরাবর যারা অন্যায় অত্যাচার, শোষণ, বঞ্চনার পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছেন, আমাদের সংগ্রাম সেই মোনাফেকদের বিরুদ্ধে।”
মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করা হয়। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান পাসের মুহূর্তে গণপরিষদে দেয়া ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু চারটি মূলনীতির ব্যাখ্যা দেন। সংবিধান কার্যকর হয় ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিজয় দিবসে। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সকলের মিলিত রক্তস্রোতের বিনিময়ে। যা বাঙালী জাতীয়তাবাদের অর্জিত ফসল। বঙ্গবন্ধুর সুদীর্ঘ সংগ্রামের জাতি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত হয়েছিল। কিন্তু জাতির পিতাকে হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শত্রুদেরই উত্থান ঘটানো হয়। মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতির “জাতীয়তাবাদ” ও “ধর্মনিরপেক্ষতা”কে উচ্ছেদ করা হয় সংবিধান থেকে। সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ রহিত করার ফলে নিষিদ্ধ ঘোষিত স্বাধীনতা বিরোধী দলগুলো রাজনীতির অধিকার ফিরে পায়। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,
“বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ধর্মনিরপেক্ষ মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমান মুসলমানের ধর্মপালন করবে, হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে, খ্রীষ্টান তার ধর্ম পালন করবে, বৌদ্ধ তার ধর্ম পালন করবে। এ মাটিতে ধর্মহীনতা নেই, ধর্মনিরপেক্ষতা আছে। এর একটা মানে আছে। এখানে ধর্মের নামে ব্যবসা চলবে না। ধর্মের নামে মানুষকে লুট করে খাওয়া চলবে না। ধর্মের নামে রাজনীতি করে রাজাকার, আলবদর হওয়া চলবে না এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে দেয়া হবে না।, “রাজনীতির অঙ্গনে ঢাক ঢাক গুড় গুড়” নীতিতে আমরা বিশ্বাসী নই। জনগণের জন্য যা চাই তা সুস্পষ্ট ভাষায়, সরাসরি ঘোষণা করি। এ কারণে কখনো ইসলাম বিরোধী, কখনো রাষ্ট্রদ্রোহী, কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আবার কখনো “বিদেশী চরের আখ্যা পেতে হয়েছে। “
তারপরও রক্তচক্ষুর সামনে সত্যকে বর্জন করিনি- রক্তচক্ষু দিয়েই জবাব দিয়েছি। ন্যায়বিচার দাবি করায় মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ আমার ওপর নেমে এসেছিল। সংবিধানে
জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যায় বলেন, “আমার বাংলার সভ্যতা, আমার বাঙালী জাতি- এ নিয়ে হলো বাঙালী জাতীয়তাবাদ।” বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সংবিধান রাতারাতি জাতীয়তাবাদ বাঙালীর স্থলে “বাংলাদেশী” হয়ে যায়। সমাজতন্ত্রের ব্যাখ্যায় আনা হয় পরিবর্তন।
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেব, “সমাজতন্ত্র হবে দ্বিতীয় স্তম্ভ। “এ সমাজতন্ত্র আমি দুনিয়া থেকে ভাড়া করে আনতে চাই না, এ সমাজতন্ত্র হবে বাংলার মাটির সমাজতন্ত্র। এ সমাজতন্ত্র বাংলার মানুষের সমাজতন্ত্র, তার অর্থ হলো শোষণহীন সমাজ, সম্পদের সুষম বন্টন। বাংলাদেশে ধনীদের আর ধন সম্পদ বাড়াতে দেব না। বাংলার কৃষক, মজদুর, শ্রমিক, বাংলার বুদ্ধিজীবী এ দেশে সমাজতন্ত্রের সুবিধা ভোগ করবে। “সমাজতন্ত্র যেখানে আছে সেদেশে গণতন্ত্র নাই। দুনিয়ায় আমি বাংলার মাটি থেকে দেখাতে চাই যে, গণতন্ত্রের মাধ্যমে আমি সমাজতন্ত্র কায়েম করবো। আমি ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। আমি জনগণকে ভালোবাসি, আমি জনগণকে ভয় পাই না। দরকার হলে আবার ভোটে যাবো। “
বঙ্গবন্ধু খাঁটি জাতীয়তাবাদী ছিলেন বলেই অপর এক ভাষণে বলেন, “আমার দেশ স্বাধীন দেশ। ভারত হোক, আমেরিকা হোক, রাশিয়া হোক, গ্রেট বৃটেন হোক, কারো এমন শক্তি নাই যে আমি যতক্ষণ বেঁচে থাকি ততক্ষণ আমার দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারে। একদল লোক বলছে মুজিবুর রহমান লন্ডন চলে যাবে। কিন্তু মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ ছেড়ে কোথাও যাবে না। মুজিবুর রহমান বাংলার মানুষকে ফেলে বেহেস্তে গেলেও শান্তি পাবে না। “
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “সব দলেই ভাল-মন্দ মানুষ আছে। যারা খারাপ, তারা সব সময়ই খারাপ। আমার দলের মধ্যে কেউ যদি দুর্নীতি বা চুরি করে, বিশ্বাস রাখতে পারেন, তাকে কেমন করে শায়েস্তা করতে হয়, আমি জানি। ৩৭ জন এমসিএ- কে (এমপি) বহিষ্কার করেছি। ভবিষ্যতে যদি কোনো এমসিএ বা পার্টি – সে যে পার্টিরই হোক না কেনো, কিংবা কোনো শ্রমিক নেতা বা ছাত্রনেতা চুরি করে তাহলে মাফ করবো না। মজুদদার, চোরাকারবারি আর চোরাচালানিরা হুঁশিয়ার হয়ে যাও। হুশিয়ার করে দিয়ে বলতে চাই, যারা শহরে সরকারি বাড়ি, গাড়ি দখল করে আছো, যারা দোকান বা অন্যের জমি দখল করে আছো, যারা মজুদ করছো, জিনিসের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছো, তাদের রেহাই নেই। আমি এক একটা এলাকায় কারফিউ দেবো আর সমস্ত পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট সেখানে তল্লাশি চালাবেন। এতদিন আমি কিছু বলি নাই। এখন বলে দিলাম, হুকুম দিয়ে দিলাম। এরপরেও বড় বড় বক্তৃতা করবে আর রাত্রি বেলায় চোরা গাড়িতে চড়বে, এটা হবে না। আমার প্রাণ থাকতে নয়। বারবার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান। আর ঘুঘু ধান খাওয়ার চেষ্টা করো না। আমি পেটের মধ্য হতে ধান বের করে ফেলবো। “
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আমি যদি আত্ম বিশ্লেষণ করতে না পারি, আত্মসংযম করতে না পারি, তাহলে অন্যকে বলার আমার কোনো অধিকার নাই। সারাদিন কি করলে তা রাতে শোবার সময় একবার হিসাবনিকাশ করো। আজ ভালোমন্দের হিসাব রাখলে পরের দিন কাজে লাগবে। মানুষ তোমাদের কথা শুনবে, দেখবে, শিখবে, ভালবাসবে, শ্রদ্ধা করবে। কেউ কোন দিন বলপ্রয়োগে ভাল কিছু করতে পারে না। সোনার বাংলা গড়তে সোনার মানুষের দরকার। তা না হলে শেখ মুজিবুরকে বেটে খাওয়ালেও পারা যাবে না। “
Enter

আশার কথা হচ্ছে দেরিতে হলেও সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে সংবিধানের চার মূলনীতি পুনঃস্থাপিত হয়েছে। রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম হলেও ব্যাখ্যায় সকল ধর্মকে সম অধিকার দেয়া হয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ফিরে এসেছে। বাংলাদেশী শব্দটি নাগরিক পরিচয়ে ব্যবহারের নির্দেশনা রেখেই সংবিধানের প্রস্তাবনায় জাতীয়তাবাদ বাঙালী পুনঃস্থাপন করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে মূলনীতিগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছিল। সংবিধানে ইনডেমনিটি ঢুকিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকে বৈধতাদানের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে কবর দেয়া হয়েছিল। সেই ইনডেমনিটি আইন বাতিল হয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। এ সবই সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বের কারণে। তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্ব কালে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল বিশ্বের কাছে। ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ না হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে জাতিকে কলঙ্ক মুক্ত করেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা।
বঙ্গবন্ধু দৈহিকভাবে নেই। কিন্তু আছে তাঁর প্রতিটি কথার উচ্চারণ ও ধ্বনি-প্রতিধ্বনি। আর তা দেশের যে কোনো সংকটে।
প্রসঙ্গত দেশে হেফাজতের তান্ডব আমরা দেখেছি। সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের দমনে সাধুবাদ পেতেই পারে। আমরা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকে কেন্দ্র করেও দেখেছি ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর সন্ত্রাস। যখন প্রাণঘাতী করোনা বাড়াচ্ছিল মৃত্যুর মিছিল। হিন্দু ধর্মালম্বীদের শারদীয় উৎসবকে কেন্দ্র করেও ধর্মান্ধ গোষ্ঠিরা যে দেশে একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত করার নীলনকশা বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে উঠেছে তা দেশবাসীর কাছে ইতিমধ্যে পরিস্কার হয়ে গেছে। সরকারের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তড়িঘড়ি পদক্ষেপ কার্যকর ভুমিকা রাখলেও ঘটনার সূত্রপাত স্থল কুমিল্লা ফুঁসে ওঠার নেপথ্যে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীরই কারো কোন সদস্যের তাৎক্ষণিক ভূমিকায় প্রশ্ন উঠেছে। আমরা দেখেছি স্থানীয় পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তার এক হাতে পুজা মন্ডপ থেকে উদ্ধার করা পবিত্র কুরআন শরীফখানা আর অন্য হাতে মোবাইল ফোনে কথা বলার দৃশ্য। স্থানীয় ধর্মান্ধ লোকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে সেই দৃশ্য ধারণ করে। যা রীতিমত ভাইরাল হয়ে যায়। প্রশ্ন হচ্ছে ওসি ঘটনাস্থলে কেনো কুরআন শরীফখানা হাতে রেখে অনবরত মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। হতে পারে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উর্ধতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলছিলেন। কিন্তু কেনো তিনি ঘটনাস্থলে এমন দৃশ্যের অবতারণা করলেন? অসাধু লোকরা এ থেকে ফায়দা লুটতে পারেন – এমনটি কেনো ওসি সাহেবের বোধদয় হলো না? ওই দৃশ্য যারা ফেইসবুক ইউটিউবের মাধ্যমে লাইভে এসে প্রচার করেছে তারা প্রত্যেকেই সাম্প্রদায়িক উস্কানীমূলক ভাষা ব্যবহার করেছে। পুজা মণ্ডপে হিন্দু দেবতা গণেশের পায়ের তলে অনেকগুলো গ্রন্থের মধ্যে পবিত্র কুরআন শরীফখানা প্রথমে কোন ব্যক্তির নজরে পড়লো সেটা একটা প্রশ্ন। নিশ্চয়ই পুজা মণ্ডপে যাওয়া সেই ব্যক্তিটি কি মুসলিম নাকি হিন্দু ধর্মালম্বী কোন জাতীয়তাবাদী? আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে ওসি সাহেব কুরআন শরীফখানা জনগণের মধ্যে প্রদর্শন না করে তা সুরক্ষণ করলেন না কেনো। এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা দরকার। যারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছুঁড়ে ছিলো, যারা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফর ঠেকাতে সংঘাত সংঘর্ষের সৃষ্টি করেছিলো তারা মূলত ইসলামের নামে একটি অভ্যুত্থান সংঘটিত করার স্বপ্নে বিভোর। এদের মূল উৎপাটন করা যে সম্ভব হয়নি, তা কুমিল্লার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত ঘটনায় প্রমাণ মেলে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ না হলে এদের শেকড় আরও বিস্তৃত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মধ্যেও স্বাধীনতা বিরোধী অনুপ্রবেশকারী রয়েছে। এমন কথা যখন দলের শীর্ষ নেতারা বলেন তখন স্বাধীনতা বিরোধীদের শেকড় কতটা বিস্তৃত তা আঁচ করা যায়।-লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।