বঙ্গবন্ধুর খুনি ও যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত

যুগবার্তা ডেস্কঃ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারী এবং দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের সব স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত দিয়েছে জাতীয় সংসদ।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহামের হত্যাকারীদের সকল স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হউক’ শীর্ষক প্রস্তাবটি করেন সাংসদ ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি। উত্থাপিত সিদ্ধান্ত প্রস্তাবটি সমর্থন করে বক্তব্য দেন নূরজাহান বেগম, মনিরুল ইসলাম, আবদুল মতিন, বেগম সানজিদা খানম ও ড. মোহাম্মদ শামছুল হক ভূঁইয়া। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হওয়ার পর সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে তাদের সমর্থন জানান।

সিদ্ধান্ত ও সংশোধন প্রস্তাবকারীদের বক্তব্য শেষে আইনমন্ত্রী আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার প্রধান আইনজীবী আনিসুল হক বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনী এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষকে হত্যাকারী যুদ্ধাপরাধী-মানবতাবিরোধীদের কোন সম্পত্তি এই স্বাধীন দেশে থাকতে পারে না, রাখার কোন অধিকার নেই। অতি দ্রুতই বঙ্গবন্ধুর খুনী এবং দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের নামে-বেনামে থাকা সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। এই কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে কোন আইনের প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বঙ্গবন্ধুর খুনীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে গেলে আইনের কিছুটা সংশোধনী আনতে হবে। আর যারা মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধ করেছে তাদেরও কোন সম্পত্তি থাকতে পারে না। তাদের নামে থাকা সকল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। এ লক্ষ্যে আইন মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে একটি বিল প্রস্তুত করা হচ্ছে। অবিলম্বেই এই সংসদে বিল এনে পাসের মাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা হবে।

এ প্রসঙ্গে আইনগত বিভিন্ন বিধান বিশ্লেষণ করে আইনমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু সবসময়ই নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করে গেছেন। আর তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করেন বলেই প্রচলিত আইনে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছেন। তাই বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের যে মুহূর্তে ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, সেই মুহূর্ত থেকে তাদের সকল সম্পত্তি তাদের উত্তরাধীকারের কাছে চলে গেছে। তাই তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে হলে নতুন আইনের প্রয়োজন হবে। আমি দৃঢ়ভাবে দেশবাসীকে জানাতে চাই, এই আইন প্রণয়নের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। খুনীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে গেলে কিছুটা সময় লাগবে। তবে এটুকু বলতে চাই, খুব শিগগিরই আইনটি প্রণয়ন করা হবে। আর যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আইন প্রণয়নের কাজও শুরু হয়ে গেছে।

আবেগজড়িত কন্ঠে আইনমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে বাঙালী জাতির হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে, সেই রক্তক্ষরণ এখনও চলছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার মাধ্যমে ঘাতকরা যে কলঙ্কের তিলক এঁটে দিয়ে গেছে, খুনীদের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর এবং তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করলেও সেই কলঙ্ক মুছবে না। যতদিন এদেশে আমরা বেঁচে থাকবো, বাংলাদেশ বেঁচে থাকবে- ততদিন এই রক্তক্ষরণ চলতেই থাকবে। কোন ডাক্তার সেলাই করে এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে পারবে না।

আইনমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় সাক্ষীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিবরণের কিছুটা উক্তি তুলে বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের যে সকল আসামিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তাদের নামে-বেনামে থাকা সকল সম্পত্তি খুঁজে বের করার জন্য গঠিত একটি টাস্কফোর্স কাজ শুরু করেছে। চলতি বছরের ৩১ মে টাস্কফোর্সের বৈঠকে এ বিষয়ে বেশকিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। পলাতক খুনীদের ফেরত আনার চেষ্টা চলছে। তবে অনেক সতর্কতার সঙ্গে করতে হচ্ছে, কেননা জানাজানি হলেই খুনীদের সম্পত্তি বেনামী করার চেষ্টা করা হতে পারে। আর এমন ঘটনা এদেশে অনেকেই ঘটেছে। তবে একথা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, অবিলম্বেই আইনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর খুনী ও দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের সকল স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের দাবি জানিয়ে বেসরকারি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব উত্থাপনকারী বেগম ফজিলাতুন নেনা বাপ্পি বলেন, জাতির পিতা আমাদের ভাষা, স্বাধীনতা, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত দিয়ে গেছেন। কিন্তু খুনী মোশতাক-জিয়ারা বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করে। ইয়াহিয়া-ভুট্টো কবর খুঁড়েও বঙ্গবন্ধুর গায়ে হাত দেওয়ার সাহস দেখাতে পারেনি, যা করেছে মোশতাক-জিয়ারা। ছোট শিশু রাসেলকেও নির্মমভাবে হত্যা করে ঘাতকরা। এই ভয়াল হত্যাযজ্ঞ বিশ্ব সভ্যতার কোথাও ঘটেনি।

তিনি বলেন, হামলার সময় বঙ্গবন্ধুর পরিবারের একজনও ঘাতকদের কাছে প্রাণভিক্ষা চাননি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মোশতাক ও জিয়ারা খুনীদের বিচার না করে উল্টো পুরস্কৃত করেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউর রহমান যে জড়িত ছিলেন, তা মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণেই বেরিয়ে আসে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারী এই জিয়াউর রহমান। ঘাতক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে স্বাধীন দেশ, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে হত্যা করতে চেয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়ারা প্রটেকশন দিয়েছে, আমি তাদের ঘৃণা জানাই। তাই বঙ্গবন্ধুর খুনীদের স্বাধীনতা বাংলাদেশে কোন স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি থাকতে পারে না, থাকতে পারবে না। অবিলম্বে খুনীদের সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানান তিনি।