প্রয়াত কমরেড হাফিজুর রহমান ভূঁইয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনী

যুগবার্তা ডেস্ক: কমরেড হাফিজুর রহমান ভূঁইয়া খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামোদর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৪৪ সালের ১ ফেব্রæয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আব্দুর রব ভূঁইয়া ও মাতার নাম তহুরুন্নেছা। ১৯৫৯ সালে ফুলতলা রি-ইউনিয়ন হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। ১৯৬০-৬১ সালে দৌলতপুর বিএল কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্র ইউনিয়নে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ। ছাত্রাবস্থায় তিনি ফুলতলার প্রবীণ রাজনীতিবিদ কালিপদ ঘোষের হাত ধরে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। এ সময় কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকায় প্রকাশ্যে ভাসানী ন্যাপের রাজনীতি করতেন।

১৯৬৩ সালে খুলনা আযম খান কমার্স কলেজ থেকে বিকম পাস করেন এবং ১৯৬৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমকম পাস করে কর্মজীবনের শুরুতে বটিয়াঘাটা ডেউয়তলা হাই স্কুলে ৬ মাসের জন্য প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে কমরেড নজরুল ইসলামের প্রেরণায় ১৯৬৬ সালের ১১ এপ্রিল শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হয়ে খালিশপুরের প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে চাকরিতে যোগদান করেন। চাকরির সুবাদে ঐ মিলের এমপ্লয়িজ ইউনিয়নে বারবার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। এছাড়া আলিম ও ইস্টার্ন জুট মিলস মজদুর ইউনিয়নে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বহুবার বিজেএমসি কর্তৃপক্ষ পদোন্নতি দিতে চাইলেও তিনি শ্রমিক আন্দোলনের স্বার্থে পদোন্নতি নেন নি। এমনকি আশির দশকের প্রথম দিকে ডিজিএম পদে লোভনীয় পদোন্নতি প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৭০ সালের প্রথমদিকে পার্টির সভ্যপদ লাভ করেন। দেশ স্বাধীনের পর লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালে ইউপিপি-তে এবং ১৯৮৫ সালে ওয়ার্কার্স পার্টির এক অংশের কেন্দ্রীয় সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (নজরুল) ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগÑ এই দুই পার্টির ঐক্যের মধ্যদিয়ে ১৯৮৮ সালে গঠিত ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ও বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল একত্রিত হয়ে ১৯৯২ সালে তিন পার্টির ঐক্য কংগ্রেসের মধ্যদিয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও খুলনা জেলা সম্পাদক নির্বাচিত হন।

কমরেড হাফিজুর রহমান ভূঁইয়া ২০০৫ সালে যশোরে অনুষ্ঠিত ওয়ার্কার্স পার্টির সপ্তম কংগ্রেসে পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৫ সাল থেকে অদ্যবধি তিনি পার্টির খুলনা জেলা সভাপতি ছিলেন। একই সাথে তিনি জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন।

তাঁর বর্ণাঢ্য আন্দোলনমুখর জীবনে রক্ষীবাহিনীর হাতে নির্মম নির্যাতন ও কারাভোগসহ বিভিন্ন সময় ও মেয়াদে ৫ বার কারাভোগ করেন। শ্রমিক নেতৃত্ব ছাড়াও ১৯৯৬-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্টির প্রার্থী এবং ১৯৯০ ও ২০০৯ সালে ফুলতলা উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী ছিলেন।

তিনি পাট-সুতা-বস্ত্রকল সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক, বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন কমিটির সদস্য, খুলনা-যশোর পাট শিল্প সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক, বিল ডাকাতিয়া সংগ্রাম কমিটি, পানি ঠেকাও ফুলতলা বাঁচাও আন্দোলন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আন্দোলন, খুলনা শিল্প কারখানা রক্ষা ও মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন, বিভিন্ন সময় সা¤্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন, স্বৈরাচারী-দুঃশাসনবিরোধী আন্দোলন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত¡ পাটকলের শ্রমিক আন্দোলনের রূপকার হিসেবে খালিশপুরসহ দেশব্যাপী আন্দোলনের চালিকা শক্তি হিসেবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

তাঁর হাত ধরে ফুলতলা এমএম কলেজ, ফুলতলা মহিলা ডিগ্রি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়। জামিরা বাজার আসমোতিয়া স্কুল এন্ড কলেজ, ফুলতলা রি-ইউনিয়ন হাই স্কুল, দামোদর মুক্তময়ী হাই স্কুল, ফুলতলা মহিলা ডিগ্রি কলেজ ও ফুলতলা এমএম কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি, ফুলতলা লিটল এ্যাঞ্জেল কিন্ডার গার্টেনের উপদেষ্টা হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।