প্রিয় দেশবাসী

ফজলুল বারীঃ ময়মনসিংহের রেললাইনের পাশের বস্তিতে থাকা মুন্না ছেলেটির জন্যে আমরা কাজ শুরু করেছি। খুব ছোটবেলায় ট্রেনে কাটা পড়ে মুন্না তার ডান হাত, বাম পা হারিয়েছে। অনলাইনে তার এমন এক পায়ে চলা জীবন দেখে তার জন্যে আমাদের কিছু করতে ইচ্ছা করে। এ ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়ে ফেসবুকে একটি পোষ্ট দেবার পর তাকে খুঁজে দিয়েছেন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজের ছাত্রলীগ নেতা আমার প্রিয় প্রজন্ম দ্বীপ চাকলাদার আকাশ। এরপর থেকে তার মাধ্যমেই প্রতিদিন আমাদের মুন্নার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। মুন্নার চিকিৎসা, একটি নকল হাত একটি নকল পায়ের ব্যবস্থা এবং পরিবারটির স্থায়ী একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা আমাদের প্রাথমিক টার্গেট।
এরও আগে আমরা যে কাজটি শুরু করেছি তাহলো মুন্নাকে ভালোবাসা দেয়া। বস্তির অভাবী জীবনে হয়তো এই ভালোবাসাটিই সে সেভাবে পায়নি। শনিবার মুন্নার পরিবারকে আমরা একটি মোবাইল ফোন কিনে দিয়েছি। আর দেয়া হয়েছে মুন্নাকে নতুন কিছু জামাকাপড়, ভালো খাবারের জন্যে কিছু বাজারসদাই, আর মুন্নার মায়ের হাতে কিছু নগদ টাকা। পরিবারটিকে বলা হয়েছে তাদের একটি স্থায়ী কর্মসংস্থান, অর্থ সংস্থানের ব্যবস্থার আগ পর্যন্ত এমন যখন যা লাগে তা আমরা দেবো। বাসা বাড়িতে কাজ করেন মুন্নার মা। মুন্নার জন্যে আমাদের স্বপ্নের ব্যবস্থাগুলো বাস্তব রূপ নেবার আগ পর্যন্ত মা তার বর্তমান পেশাই চালিয়ে যাবেন।
আজ আমাদের উপহারগুলো হাতে পেয়ে মুন্নার পরিবারটি খুব খুশি হয়েছে। তাদের খুশিগুলো লিখে পাঠিয়েছে আমার প্রিয় প্রজন্ম দ্বীপ। তার লেখাটি আপনার পড়ার জন্যে শেয়ার করছি এখানে। পড়ুন, আপনাদেরও ভালো লাগবে। দ্বীপ লিখেছেঃ “তখন বেলা ২ টা। রোদ ঝলমলে দিনটায় মুন্নার মুখটা বারবার মনে ভেসে উঠছিল। এরমাঝে বারী ভাইর পাঠানো টাকাগুলো এলো আমার মোবাইলের বিকাশ একাউন্টে। কি কি কিনতে হবে এসব নিয়ে বারী ভাইর সঙ্গে আগেই আলাপ হয়েছে। টাকাগুলো পেয়ে সে অনুসারে বাজারসদাই করে রওয়ানা দিলাম মুন্নাদের বাসার উদ্দেশে। মুন্নার মুখে হাসি দেখার লোভটা গত দু’দিন ধরেই কাজ করছিলো। আজই সেই দিন।
ব্যাগ ভর্তি মুন্নার পছন্দের খাবারের বাজার আর মুন্নার জন্য নতুন জামাকাপড় আর নতুন একটা মোবাইল ফোনের সেট নিয়ে মুন্নার বাসার কাছে যেতেই সামনে পড়লো মুন্নার বোন। সে এক দৌড়ে তার মা কে ডেকে আনলো। মুন্নার মা আর তার আরেক বোন তরকারি রান্না করার জন্য আনাজ কাটছিলেন বারান্দাতেই।
খালাকে বাজারের ব্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে বললাম খালা এখানে পোলাও’র চাল আর মুরগীর মাংস আছে। এখনি রান্না করে ফেলেন। ব্যাগটা তার বোন ঘরে নিয়ে গেলো। খালার কাছে মুন্না কোথায় জানতে চাইলাম। “মুন্না তো কিছুক্ষণ আগেই ক্ষুদায় বের হয়ে গেছে বাসা থেকে। ওর অনেক ক্ষুদা লাগছিল। আম্মার কাছ থেকে ১০ টাকা নিয়ে গেছে।” -জবাব দিলেন মুন্নার বোন।
আমার মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল আবার। ভাবলাম আজ হয়তো আর মুন্নার সাথে দেখা হবে না। তারপর খালা ঘরে যেতে বললেন। আমি ঘরে গেলে তাদের ব্যস্ততার অন্ত ছিলো না। আমায় কোথায় বসতে দিবে এই ভেবে। পাশের বাড়ি থেকে চেয়ার আনতে যাচ্ছিলেন খালা। আমি খালাকে আশ্বস্ত করে বারান্দা থেকে একটা মুড়া টেনে নিয়ে তাতেই বসলাম উনাদের সাথে। তারপর একে একে মুন্নার জন্য আনা মোবাইল, টি শার্ট আর প্যান্ট গুলো বের করে দেখালাম। হঠাৎ করে মুন্নার মা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। আবেগে আপ্লুত জড়িয়ে যাওয়া কÚে বললেন- “আজ মুন্না অনেক খুশি হবে। ছোটবেলা থেকে ওকে কখনও ভাল কিছু কিনে দিতে পারি নি। ”
এরপর খালাকে কে আবার আশ্বস্ত করে তার হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললাম ঘরে তো চাল ফুরিয়ে এসেছে। এগুলো দিয়ে এক বস্তা চাল কিনে নিয়েন। আর যা যা বাজার দরকার করতে পারেন। এমন সময় মুন্নার বাবা খাবার জন্য বাসায় ফিরেছেন। বারান্দা থেকে আমার কথাগুলো শুনে ভিতরে ঢুকলেন। আমার হাত টা ধরে বললেন, বাবা ছেলেটাকে কখনও ভাল কিছু খাওয়াতে পারি না। আপনি আজ মুন্নার জন্য যা করলেন বাবা আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন।” আমি উনার হাতটা ধরেই বললাম মুন্নার এখন থেকে যা যা প্রয়োজন আমরা দেখবো। আপনারা শুধু ওকে দেখে রাখবেন। আর উনাকে বললাম ওকে যিনি সাহায্য করছেন আপনারা তাকে চেনেনও না। আমি শুধু এসব পৌঁছে দেওয়ার উছিলা মাত্র। উনার চোখগুলো ছলছল করছিল। উনাকে ঘরে রেখে খালাকে নিয়ে বাইরে আসলাম। খালা বললেন, “সাপ্লাই এর পানি ছাড়ে বিকাল ৪ টায়। তখনই মুন্নার খাওয়ার সময়। এর আগে হয়তো আসবে না।”
বাসায় বসে না থেকে খালার ভোটার আইডি কার্ড টা নিয়ে খালার সাথে পাটগুদাম মোড়ের একটা দোকান থেকে সিমকার্ড কিনে দেই। তারপর আবার বাসায় ফিরি। খালাকে বললাম এখন থেকে মোবাইল চালানো শিখবেন আপনার মেয়ের কাছে। আর মুন্নার তো মোবাইলে গান শুনার শখ। সে গান ও শুনতে পারবে এখন থেকে। কোন দরকার হলে সংকোচ না করে আমায় ফোন দিবেন। আর এখন থেকে আসার আগে আমি ফোন দিয়ে আসবো যে মুন্না বাসায় আছে কিনা। এই বলে বিদায় নিলাম আজকের মতো। যখন ফিরছিলাম তখন একবারও পেছন দিকে তাকাইনি। কারন আমি জানতাম তিনি এক দৃষ্টিতে আমার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।”
প্রিয় দেশবাসী, মুন্নার জীবন বদলে দেবার মিশনটিতেও আমরা অগ্রসর হবো আমাদের প্রিয় অগ্রজ ডাঃ শরফুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে। আবুল মিশনটিও আমরা এই ডাঃ শরফুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে শুরু করেছিলাম। গত পৌরসভা নির্বাচন উপলক্ষে পাইকগাছায় রিপোর্ট করতে গিয়ে আবুলকে প্রথম দেখেন খুলনার সাংবাদিক সুনীল চৌধুরী। আবুলের কিছু ছবি তুলে আমার ইনবক্সে দিয়ে সুনীল চৌধুরী আবুলের জন্য কিছু করতে অনুরোধ করেছিলেন। আমি বিদেশ বিভূঁইয়ে থাকি। তখন ডাঃ শরফুদ্দিন আহমদকে আবুলের জন্যে কী করা যায় এর উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি প্রথম খুলনায় আবুলকে ডাক্তার দেখানো ব্যবস্থা করেন। এরপর তাকে নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। আবুলের বাকি ইতিহাসতো এখন সবাই জানেন।
এখন মুন্নাকে নিয়ে আমাদের প্রাথমিক চিন্তাটি বলি। অপুষ্টি সহ শারীরিক নানা সমস্যা আছে ছেলেটির। এরমাঝে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের কতিপয় ছাত্রের সঙ্গে মুন্নার বিষয়ে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে। মুন্নার চিকিৎসা স্থানীয়ভাবে ময়মনসিংহে শুরু করার চিন্তা রয়েছে। সুস্থ হবার পর তার একটি কৃত্রিম হাত একটি কৃত্রিম পায়ের ব্যবস্থা করা হবে। এরপর পুনর্বাসনে একটা দোকান জাতীয় ব্যবসা গড়ে দেবার চিন্তা। তার মাকে বলা হয়েছে ছেলেটিকে প্রতিদিন গোসল-দাঁত ব্রাশ এসব করাতে। এখন কিছু কাপড়চোপড়, প্রতিদিন একটু ভালো খাওয়াদাওয়ার আয়োজন এসবে স্বপ্ন হারানো ছেলেটিকে আমরা মানসিকভাবে প্রফুল্ল রাখতে, স্বপ্ন দেখিয়ে উদ্যমী-উজ্জিবিত করতে চাই। তার জন্যে করনীয় গঠনমূলক আরও পরামর্শ পাওয়া গেলে সে সবও সাদরে গ্রহন করা হবে। মুন্নাকে সহায়তায় যারা আগ্রহ দেখিয়েছেন তার সহায়তা পাঠাতে পারেন এই ব্যাংক একাউন্টেঃ
Dr. Sharfuddin Ahmed
Account Number : 2801764680001
Bank Name : The City Bank Limited.
Branch Name & Address: New Market Branch, Novera Square, Plot-5, Road-2, Dhanmondi Residential Area, Dhaka-1205, Bangladesh.Branch SWIFT Code : CIBLBDDH.
মুন্নার পাশে দাঁড়ান প্রিয় দেশবাসী। ময়মনসিংহে আমার প্রিয় প্রজন্ম দ্বীপের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে তাকে ফোন দিন ০১৯১৭৭৯০২৬১ নাম্বারে। আপনারা সঙ্গে থাকলে এই মিশনেও আমরা সফল হবো। জয় বাংলা।-সূত্র: ফেইসবুক