Home মতামত প্রান্তজনের জেল জীবনঃ ৮ম কিস্তি

প্রান্তজনের জেল জীবনঃ ৮ম কিস্তি

51

সাইফুল ইসলাম শিশির: সকাল সকাল করতোয়া বিল্ডিংয়ের নিচে বসে আছি। জুয়েল আসলে একসাথে নাস্তা খাবো। করতোয়া থেকেই সব ওয়ার্ডে বন্দিদের জন্য নাস্তা, ভাজি, ডাল সাপ্লাই হয়। সকাল বিকেলে এখানে লোক গম গম করে। পাম্প হাউজের সামনে বিডিআর বাদশা আমাদের জন্য বসার ব্যবস্থা করেছে। জুয়েল এলো। তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা বিনয়ের হাসি। পিঠে ঝুলানো গিটার। নাস্তা- কফি শেষে ‘জুয়েল ফর জুয়েল’স এর কাহিনী শুনলাম। যতই শুনছি ততই যেন অভিভূত হচ্ছি। তার জীবনের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে হাজারো কথা। সেই পাথর চাপাপড়া কথাগুলি সে কী সাবলিল ভাবে বলে গেল। মন ছুঁয়ে যায়।
সাইফুল ইসলাম জুয়েল, পিতাঃ নূরুল ইসলাম, গ্রামঃ ভূলির পাড়, ডাকঘরঃ গৌরীপুর, থানাঃ দাউদকান্দি, জেলাঃ কুমিল্লা।
ছোট্ট বেলায় বাবার হাত ধরে হাটে গিয়ে জুয়েল একবার হারিয়ে যায়। বাবা খুঁজতে গিয়ে দেখেন জুয়েল হাটের কোণায় বট গাছের নীচে দাঁড়িয়ে দোতারা বাজানো দেখছে। এরপর থেকে সে প্রায়ই লুকিয়ে হাটে যেত,গান শুনতো। বাড়ি ফিরে সময় পেলেই সাথীদের নিয়ে গোল হয়ে মাঠের মধ্যে পালাগানের আসর বসাতো। মাঝখানে দাঁড়িয়ে মাথা দুলিয়ে সে গান গাইত। সবাই আশ্চর্য হতো তার গায়কী ঢং ও সুরেলা কণ্ঠ শুনে । সেই থেকে বন্ধু বান্ধবদের মাঝে তার গায়েন খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
পড়াশোনায় তার মন বসে না। যেখানে গান সেখানেই ছুটে যায় জুয়েল। এই পরিবর্তন তার বাবা নূরুল ইসলামকে দারুণ ভাবে ভাবিয়ে তোলে। জুয়েলকে বাড়ি থেকে সরিয়ে মামা বাড়ি স্কুলে ভর্তি করে দেয়। তাতে খুব একটা লাভ হয়না। নানির কাছে বায়না ধরে সে দোতারা কিনবে। “এমনি সখিনা ঘরে থাকেনা তার উপর চাচি দিছে ছাগল কিনা।”
সময় করে সে শহীদুল আলম বাউলের কাছে দোতারা বাজানো শেখে। আশেপাশের গ্রামে যাত্রা- পালাগান হলে সে জাতীয় পতাকা হাতে স্টেজ প্রদক্ষিণ করে। জাতীয় সংগীত গায়। দোতারায় ঝংকার তুলে আসর বন্দনা করে। উত্তরে হিমালয় পর্বত জানেন সুধীজন তাহার কোলে ঘুমিয়ে আছেন কত গুণীজন–
৯৩ সালে এসএসসি পাস করে জুয়েল ঢাকায় আসে। এখানে এসেও বাউল সংগীতের প্রতি নেশার ঘোর কাটেনি। গান তার রক্তের সাথে মিশে আছে। গান তাকে ভীষণ ভাবে টানে। বাউল- আধ্যাত্মিক গান নিজেকে চিনতে শিখায়। আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। এই বিশ্বাস থেকে প্রচণ্ড শীত, ঝড়বৃষ্টি, বাদল উপেক্ষা করে কমলাপুর রেলস্টেশন, হাইকোর্টের মাজার, মহাস্থানগড়, লালনের আখড়ায় সে খুঁজেফেরে সত্যের সন্ধানে।
একদা উচ্চ শিক্ষার জন্য জুয়েল ভারতের তামিলনাড়ুতে গমণ করে। Kodaikanal Christian College, Madurai, India থেকে BS in CIS তে পড়াশোনা করে। মাদুরাই ভারতের অন্যতম সাংস্কৃতিক রাজধানী। মাদুরাই ভারতের চিকিৎসা-পর্যটনশিল্প নগরীও বটে। প্রতি বছর এক কোটির মতো পর্যটক মাদুরাই ভ্রমণ করে থাকে। সেকারণে বহু ভাষাভাষী, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের সাহচর্যে আসার তার সু্যোগ ঘটে।
একসময় জুয়েল বই পড়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। বিশ্বের অন্যতম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের সংবিধান প্রনেতা মহামতি আম্বেদকার এর জলঅচল- জাতপাত বিরোধী ভাবাদর্শে সে অনুপ্রাণিত হয়। তামিলনাড়ু- কর্ণাটকসহ সমগ্র দাক্ষিণাত্যের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জীবন জীবিকার সংগ্রাম, জীবনাচার খুব কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করে। ছুটে যায় সুদূর কন্যাকুমারীকা পর্যন্ত।
এসব করতে গিয়ে তার পড়াশোনা লাটে ওঠার যোগাড়। ছাত্র হিসেবে সে অনিয়মিত হয়ে পড়ে। স্কলারশিপ বাতিল হয়ে যায়। ছাত্রত্ব বাতিল হওয়ার ফলে ভিসা রিনিউ করা সম্ভব হয়না। জটিল সমীকরণের মধ্যে পড়ে। চোখেমুখে অন্ধকার দেখে জুয়েল।
বিপদের সময় মানুষ খড়কুটো ধরে বাঁচতে চায়। জুয়েল অনন্যোপায় হয়ে ডঃ স্যামুয়েল আব্রাহাম, চেয়ারম্যান হাউজ অব আব্রাহাম চ্যারিটেবল ট্রাস্ট এর স্মরণাপন্ন হয়। স্যামুয়েল আব্রাহাম কাদাইকানাল ক্রিশ্চিয়ান কলেজের প্রতিষ্ঠাতা।
আব্রাহাম সাহেব হৃদয়বান মানুষ। তিনি জুয়েলের বিষয়টি সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখেন। ট্রাস্টি বোর্ডের সভায় উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। উল্লেখ্য যে কেসিসি আব্রাহাম জনহিতকর ট্রাস্টের একটি স্বসাশিত প্রতিষ্ঠান।
জুয়েল অধীর প্রতিক্ষায় প্রহর গুনছে। বুকের ভিতর তার ধুকধুক শব্দ ক্রমশই স্পষ্ট হচ্ছে। ট্রাস্টি বোর্ড যদি দয়াপরবশ হয়ে তার স্কলারশিপ রিনিউ করে, তবেই কেবল তার পক্ষে ছাত্রত্ব বজায় রাখা- পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। নতুবা খালি হাতে ব্যাক টু দ্যা প্যাভিলিয়ন।
চলবে —–
১ জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
থানা রোড, সিরাজগঞ্জ

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।