Home মতামত প্রান্তজনের জেল জীবনঃ সপ্তদশ কিস্তি

প্রান্তজনের জেল জীবনঃ সপ্তদশ কিস্তি

59

সাইফুল ইসলাম শিশির: সালিমুল হক কামাল একজন সৌখিন মানুষ। সৌখিনতা তাঁকে মানায়। ট্র‍্যাকস্যুট- মাথায় ক্যাপ পরে তিনি সেল থেকে বের হলেন। একসাথে পাশাপাশি হাটছি। সূর্যমুখী থেকে মধুমতি বামে ফেলে যমুনার দিকে। পুকুর পাড়ে এসে তিনি দাঁড়ালেন। বিশাল শানবাঁধানো ঘাট। সময় পেলেই বন্দিরা এখানে বসে গল্প করে, আড্ডা দেয়, প্রাণ জুড়ায়। অনেকে সচ্ছ জলে অজু- গোসল করে। পাড়ে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ে।
সম্প্রতি কামাল সাহেব নিজ উদ্যোগে পুকুরটি খনন করেছেন। তলদেশে বেলেমাটির আধিক্যের কারণে শুরুতে পুকুরে পানি থাকতো না। কামাল সাহেব হাল ছেড়ে দেবার লোক নন। জেল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে পুকুরের তলদেশে এঁটেল মাটি, গোবর, খড়, পঁচা-পাতা মিশিয়ে মাটি ট্রিটমেন্ট করেন। মাটির ক্যারেক্টর চেঞ্জ করান।
পুকুরে মাছের পোনা ছাড়া হয়েছে। পানির নাব্যতা ঠিক রাখার জন্য পাড়ে ডিপটিউবওয়েল বসানো হয়েছে। সপ্তাহে দু’একবার পুকুরে পানি দেয়। বাকী সময় পাশের জমিতে, বাগানে সেচ দেয়ার ব্যবস্থা করা আছে।
জেল অভ্যন্তরে বিস্তীর্ন এলাকা পতিত পড়ে ছিল। সেগুলোকে গ্রিন প্রজেক্টের আওতায় এনে ছোট ছোট প্লট করে আবাদযোগ্য করা হয়েছে। এখন সেখানে দৃষ্টি নন্দন সব্জির বাগান- অবারিত ফসলের মাঠ, সবুজের সমারোহ। সে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য।
কামাল সাহেবের মনের ভিতর স্বপ্নেরা এসে ভীড় জমায়, খেলা করে। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা মাথায় আছে। ১৫ হাজার বন্দিদের প্রতিদিন বিষমুক্ত- অর্গানিক শাক-সবজি খাওয়ানো সম্ভব বলে তিনি বিশ্বাস করেন। কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিলে আরও একটা পুকুর খনন করার ইচ্ছে আছে তাঁর। মাছ চাষ করবেন।
তাঁর সাথে লেগে থেকে গ্রিন প্রজেক্টের কর্মযজ্ঞ খুব কাছ থেকে দেখেছি। ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়ের কথার প্রতিধ্বনি শুনেছি তাঁর মুখে- “স্বপ্ন আমি কখনও দেখিনা, আশা আমার অনেক।”
ইতোমধ্যে তাঁর সাথে আমার অনেক কথা হয়েছে। সবই ‘গ্রিন প্রজেক্টকে’ ঘিরে। ব্যক্তিগত জীবন, GQ গ্রুপ অব কোম্পানিজ, মামলা- মোকদ্দমার কথা একবারও তিনি মুখে আনেননি। অসম্ভব দৃঢ়চেতা মানুষ। আত্মাবিশ্বাস হিমালয় পর্বত সম।
সাধারণত মানুষ নানা অপরাধ করে জেলখানায় আসে। এই শ্রেণির মানুষ এমনিতেই একটু ফেরোশাস হয়। নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা করতে চায়না। হতাশার ঘোরের মধ্যে থাকে। তাদের নিয়ে কাজ করার চিন্তাটা কী করে মাথায় এলো?
আমি সারাজীবন মানুষ নিয়ে কাজ করেছি। আগে বিবেচনা করি তারা মানুষ, বাকীটা জানার খুব বেশি দরকার আছে কী?
বন্দিদের মোটিভেট করে সৃষ্টিশীল কাজে লাগানো সত্যি একটা কঠিন কাজ। কী করে সেটা সম্ভব হলো? যা বললেন, তা মহৎ প্রাণ- কর্মবীরদের সবার কথা প্রায় একই।
সেলুলয়েডের পর্দার মতো চোখের সামনে ভেসে উঠলো একখণ্ড সোনালী অতীত। ‘৯৮ সাল। ঐ সময়টা আমি ইউরোপে ছিলাম। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস নগরীতে বিশ্বমানের বিদ্যাপীঠ “ইউনিভার্সিটি লিভার ডি ব্রাসেলস।”
বাংলাদেশের খ্যাতিমান পুরুষ প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনূস এখানে “দারিদ্র্য বিমোচন ও ক্ষুদ্রঋণ” শীর্ষক এক সেমিনারে কথা রাখবেন। বেলজিয়াম প্রবাসী বাংলাদেশি- নোয়াখালীর ছেলে এনামের সাথে সেখানে গিয়ে হাজির হলাম। যতটুকু না বক্তৃতা শুনতে তার চেয়ে বেশি আগ্রহী তাঁর দর্শনকে নিয়ে বেলজিয়দের চিন্তা- ভাবনা, প্রতিক্রিয়া জানতে। হলরুম কাণায় কাণায় ভর্তি,৷ তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বেলজিয়ামের রাণী এবং প্রফেসর ইউনূস সমভিব্যাহারে গ্রান্ড হলে প্রবেশ করলেন। দাঁড়িয়ে সবাই তাঁদের অভিবাদন জানালেন। সোনার হাতে সোনার কাঁকন কে কার অলংকার!
প্রফেসর ইউনূস তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, “আমি নতুন কিছু করিনি। মানুষ বিশেষ করে গরীব ও মহিলারা প্রতিনিয়ত যেভাবে তাদের জীবন- জীবিকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, আমি শুধুমাত্র তার ধরনটা বদলিয়ে দিয়েছি, পালটিয়ে দিয়েছি।” জীবন থেকে উদাহরণ দিলেন, একটা ডিমকে লম্বালম্ভিভাবে হাজারো চাপ দিলে ডিম ভাঙে না। কিন্তু একটু চ্যাপ্টা করে চাপ দিলেই ডিম ভেঙে যায়। আমি শুধু তাঁদের জীবন- সংগ্রামকে একটু ঘুরিয়ে দিয়েছি মাত্র।
কাজী সালিমুল হক কামাল কারা বন্দিদের জীবনকে একটু ঘুরিয়ে দিয়েছেন- পালটে দিয়েছেন। আধুনিক জ্যোতিবিদ্যা ও পদার্থবিদ্যার জনক গ্যালিলিও বলেছেন আমি যদি একটি পা পৃথিবীর বাইরে ফেলতে পারতাম তবে আমি পৃথিবীটাকেই ঘুরিয়ে দিতে পারতাম।

চলবে —–

২ জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
থানা রোড, সিরাজগঞ্জ সদর
সিরাজগঞ্জ – ৬৭০০

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।