Home মতামত প্রান্তজনের জেল জীবনঃ পঞ্চদশ কিস্তি

প্রান্তজনের জেল জীবনঃ পঞ্চদশ কিস্তি

65

সাইফুল ইসলাম শিশির:
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা । মধুমতি বিল্ডিংয়ের নিচে বসে চা-পুরি খাওয়ার নেশাটা যেন আমাকে দারুণ ভাবে পেয়ে বসে। সকাল ১০টা বাজলেই মন টানে মধুমতির দিকে। “বেলা বয়ে যায় মধুমতি গাঁয়/ ওরে মন ছুটে চল চেনা ঠিকানায়।” কর্ণফুলী থেকে করোতোয়া, মণিহার হয়ে রূপসার পাশ দিয়ে মধুমতি বিল্ডিংয়ের নিচে এসে দাঁড়াই। একটু হাঁটাও হলো পাশাপাশি গায়ে রোদ মেখে ভিটামিন- ডি গ্রহণের একটা সহজ উপায়ও কাজে লাগলো।

ইতোমধ্যেই কিছু চাখোর- আড্ডাবাজদের সাথে আমার সখ্যতা গড়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে টাংগাইলের আবদুল মালেক একজন। একটি মিথ্যা মামলায় সে জেলে এসেছে। শক্তসমর্থ ছোটখাটো মানুষ, দারুণ তেজীয়ান। একসময় ছাত্ররাজনীতি করতো। একটি ছাত্র সংগঠনের সে সভাপতি ছিল। সজ্জন ভালো মানুষ। জুনিয়র বঙ্গবীর বললে সে মিষ্টি করে হাসে- নির্মল হাসি।

চা খেতে খেতে হঠাৎ ডান দিকে তাকাতেই চোখ আটকে গেল। দেয়ালের গায়ে লেখা “এভার গ্রীণ – সবুজ প্রজেক্ট”। ঔৎসুক্য নিয়ে এগিয়ে গেলাম। জেন্টস পার্লার এর পাশে বেশ বড় একটি রুম নিয়ে গ্রীণ প্রজেক্ট। দেয়ালের গায়ে দু’চারটি উদ্ভুদ্ধ করণ শ্লোগান চোখে পড়লো। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, বৃক্ষরোপণ, সবুজায়ন প্রসঙ্গে সবই নীতি কথা।

এক ভদ্রলোক টেবিলের দিকে ঝুকে কী যেন লিখছেন। সালাম দিতেই মাথা তুলে ইংগিতে বসতে বলেন। সেবক চা নিয়ে এলো। একটু পরেই আলাপচারিতায় জানলাম, ভদ্রলোকের নাম জাহাঙ্গীর আলম। তিনি একজন বিচারাধীন আসামি। গ্রীণ প্রজেক্ট একটি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী জনহিতকর প্রতিষ্ঠান। ২৪২ জন স্বেচ্ছাসেবক এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সাথে জড়িয়ে আছেন।

মাথায় টুপি, কালো প্যান্ট, সাদা শার্ট, বুকে লাল-সবুজের ‘ক্রসবেল্ট’ পরা এক ঝাঁক স্বেচ্ছাসেবক নিরালস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এরা গ্রীণ প্রজেক্টের প্রাণ। এদের কাজ অন্তপ্রাণ মোটিভেশান দেখে অবাক হতে হয়। কামাল সাহেব এদের কানে কী মন্ত্র দিয়েছেন যে এরা ভীমরুলের গতিতে ছুটে বেড়াচ্ছে। পোশা এদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করেনি, কাজের প্রতি নিষ্ঠা- একাগ্রতা তাদেরকে আলাদা মর্যাদা এনে দিয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবকরা প্রতিদিন বাগান পরিচর্যা করে। গাছে পানি দেয়, সার- নিড়ানি দেয়। কম্পোস্ট সার তৈরী করে। পলিথিন, বাদামের খোসা, কাগজের ছেড়া টুকরো, সিগারেট- বিড়ির প্যাকেট যত্রতত্র ফেলা নিষেধ। নির্দিষ্ট স্থানে- ডাস্টবিনে ফেলতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে তার নামে রিপোর্ট হবে। রিপোর্ট হওয়া মানে জেলের ভিতর আর এক জেল। পরিণতি জানা থাকলে সহজে কেউ ওপথ মাড়ায় না। এসব তদারকি করার জন্য তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা তৎপর। তারপরও কেউ যদি কিছু ফেলে তা টোকানোর জন্য লোক আছে।

প্রতিটি বিল্ডিংয়ে আছে ৪৮টি ওয়ার্ড। প্রতিটি ওয়ার্ডে দু’টো করে প্লাস্টিকের ডাস্টবিন রাখা আছে। একটাতে শুকনো বর্জ, অন্যটাতে ফলমূলের খোসা ভিজে বর্জ ফেলতে হবে। ভোর না হতেই পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা এসে নিয়ে যায়। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যানগাড়ি এক নিমিষেই তা সরিয়ে ফেলে। কাজের নিপুণতা, তড়িৎ গতি না দেখলে তা বুঝানো যাবে না।

লাউগাছ লকলক করে বেড়ে ওঠে। দেখে মনে হয় গাছটি বেঁচে আছে তার আঁকড়াশি দ্বারা। প্রকৃত পক্ষে গাছটি বেঁচে আছে তার শিকড় দ্বারা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এখন ঝকঝকে তকতকে সবুজ মনোরম পরিবেশ। মনে হতে পারে এটি কারা কর্তৃপক্ষের অবদান, মোটেই না। এর প্রধান উদ্যোক্তা, প্রধান কারিগর জনাব সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকোনো কামাল।

ইকোনো বলপেনের কথা মনে হলে GQ কোম্পানির বিজ্ঞানের কথাটা মনে পড়ে, ” এক কলমে মাইল পার।” ‘৮৮ সালে GQ কোম্পানি বাজারে নিয়ে আসে প্লাস্টিকের তৈরী বল পেন, দাম মাত্র ৩ টাকা। ভাজা মচমচা দামে সস্তা। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়, শহর বন্দর গ্রামে, অফিস আদালতে সর্বত্র ইকোনো কলমের জয় জয়কার। ৫ বছরে ইকোনো কোম্পানির রেভিনিউ রিডাবল হয়ে দাঁড়ায় ২৫ কোটি টাকা। পরের বছর ‘৯২ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ৪০ কোটি টাকা। অভূতপূর্ব এক সাফল্যের কাহিনী। GQ গ্রুপ অব কোম্পানিজ এশিয়ার ১০টি ব্যবসা সফল বড় কোম্পানির তালিকায় চলে আসে। কোম্পানির চেয়ারম্যান কাজী সালিমুল হক কামাল হয়ে ওঠেন এদেশে ব্যবসায়ীদের আইকন।

পঞ্চম জাতীয় সংসদ উপনির্বাচনে মাগুরা – ২ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে নির্বাচন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তা নিয়ে নদীর জল বহুদূর পর্যন্ত গড়ায়। পরবর্তীতে তিনি ঐ একই আসন থেকে ষষ্ঠ ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হন। তিনি তাঁর এলাকায় একজন দানশীল, শিক্ষানুরাগী এবং অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ব্যক্তি।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালে ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ২কোটি ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা করে ৫নং বিশেষ জজ আদালত। রায়ের বিরুদ্ধে তিনি উচ্চ আদালতে রিট করেন। সে রিট খারিজ হয়ে যায়। সেই থেকে তিনি সূর্য মুখি ভিয়াইপি সেলে বন্দি হিসেবে অবস্থান করছেন। জেল অভ্যন্তরে গড়ে তুলেছেন এক মুক্ত বাতায়ন “গ্রীণ প্রজেক্ট।” সত্যি এক অনন্য উদাহরণ।

এই মহাযজ্ঞের প্রাণ পুরুষ কাজী সালিমুল হক কামালের সাথে পরিচয় হওয়ার ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে ওঠে। মনের ভিতর আলাদা একটা তাগিদ অনুভুত হয়।

চলবে —–


২৭ জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
থানা রোড, সিরাজগঞ্জ সদর
সিরাজগঞ্জ — ৬৭০০

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।