প্রান্তজনের জেল জীবনঃ একাদশ কিস্তি

9

সাইফুল ইসলাম শিশির:
থানায় নিয়ে শিমুকে অফিস রুমে বসিয়ে রাখে। খবর পেয়ে তার মা ছুটে আসে। মাকে দেখে সিমু মুখ ঘুরিয়ে বসে। একবারের জন্যও সে মুখ তুলে তাকায়নি, কথা বলেনি। তার মা ওসি সাহেবের রুম থেকে বেরিয়ে এসে সুমিকে নিয়ে থানার গেটের দিকে আসে। রিকশায় উঠে সুমিকে উঠতে বলে। সুমি অস্বীকৃতি জানায়। অন্য একটি রিকশা নিয়ে সে সটান কলেজ হোস্টেলের দিকে চলে যায়।

জুয়েলকে পরদিন আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠিয়ে দেয়। কোর্ট হাজতে দেখা করে সিমু। পেস্ট- ব্রাশ, সাবান, গেঞ্জি, লুঙ্গি কিনে দেয়। ভরসা দেয় উকিল ধরে জামিনের ব্যবস্থা করবে। চিন্তা করবে না। গারদের শিক ধরে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে বলে সুমি- “অসীম আস্থা নিয়ে দেখবে তুমি আমাকে।” শুধু কথার কথা নয়, যেন অমিয় সুধা।
সেই থেকে অদ্যাবধি জুয়েল কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক আছে। জামিন করাবে কে? মামলারই বা কী হবে? এসব নিয়ে জুয়েলের খুব একটা মাথা ব্যথা নেই। যেটুকু ভাবনা তা ঐ সুমিকে ঘিরে।

করোনার কারণে লকডাউন চলছে। কোর্ট- কাচারি সব বন্ধ। জামিন পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কষ্টসাধ্য করে সিমু যতসামান্য টাকা- পয়সা পাঠায়। টাকা পেয়ে জুয়েলের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। মন ডুকরে উঠে – “কত দুঃখ আছে, কত অশ্রুজল—প্রেম বলে তবু থাকিয়ো অটল। তাঁহারি ইচ্ছা হউক সফল বিপদে সম্পদে শোকে উৎসবে।” সুমির ইস্পাত দৃঢ়তা জুয়েল কে নির্ভার করে, সাহস যোগায়।

কাচারিপাড়ায় দু’একবার মায়ের সাথে সুমির দেখা হয়েছে বটে তবে কথা হয়নি। দু’জন হাঁটে দু’পথে। কবি গুরুর ভাষায় “ওষুধে ডাক্তারে ব্যাধির চেয়ে আধি হল বড়ো।”
পুলিশ মামলায় ভিক্টিম হিসেবে সুমির জবানবন্দি নিতে চায়। কিন্তু সুমি অনড়। বরং সে তার জন্ম নিবন্ধন সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র সমেত আদালতে ২২ ধারা মতে জবানবন্দি দেয়। বয়স ২৩ বছর, সে একজন সাবালিকা। এখানে অপহরণের প্রশ্ন অবান্তর। কেউ তাকে অপহরণ করে নাই। সেচ্ছায় সে জুয়েলের সাথে গেছে। ফকির হুমায়ুন সাধু সেদিন আদালত চত্বরে উপস্থিত ছিলেন। আদালত জবানবন্দি নেয়। ধার্য্য তারিখে আদেশ দানের জন্য রাখে।

ইতোমধ্যে সুবার্তা পৌঁছে গেছে কারাগারে। জুয়েলের কারামুক্তি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। মননচর্চাকেন্দ্রের সদস্যদের কাছে এ সংবাদটা যেন হরিষে-বিষাদ সম। মননচর্চাকেন্দ্রের প্রাণবায়ু যেন টুটে গেছে। কারোর মধ্যে উচ্ছ্বাস নেই, বাতাসটা ভারী- হয়ে আছে।

গারদের মধ্যে রাতটা জুয়েলের দারুণ উৎকণ্ঠায় কেটেছে। বারবার ভেসে উঠেছে প্রিয় জনের মুখ। সুকান্ত ভট্টাচার্য্য যেন তার জন্যই লিখেছেন এই অমর কবিতাখানাঃ
“তবু লিখছি তোমাকে আজঃ লিখছি আত্মম্ভর আশায়
ঘরে ফেরার সময় এসে গেছে
জানি আমার জন্য কেউ প্রতিক্ষা করে নেই
মালায় আর পতাকায় প্রদীপ আর মঙ্গলঘটে
জানি সম্বর্ধনা রটবেনা লোক মুখে
মিলিত খুশিতে মিলবেনা বীরত্বের পুরষ্কার
তবু, একটি হৃদয় নেচে উঠবে আমার আবির্ভাবে
সে তোমার হৃদয়।”

বিদায় বেলায় সবাইকে সঙ্গে নিয়ে হল রুমে প্রবেশ করে জুয়েল। বিডিআর বিদ্রোহে সাজাপ্রাপ্ত দিনাজপুরের ছেলে অজয়। মাত্র ১৯ বছর বয়সে সে কারাগারে এসেছে। ইনোসেন্ট ফুটফুটে চেহারা। মিষ্টি হেসে বলে “জেলখানায় এসেই আমার জ্ঞান বুদ্ধি গজালো”। সে খুব সুন্দর বাদ্যযন্ত্র বাজায়। সেই সাথে ভালো রবীন্দ্র সংগীতও গায়। জুয়েলের সাথে তার হরিহরআত্মা সম্পর্ক। জুয়েলের অনুপস্থিতি তাকে ভীষণ পীড়া দেবে। মনপ্রাণ উজাড় করে সে গাইল, “আঁধার থাকুক দিকে দিকে আকাশ অন্ধকরা/ তোমার পরশ থাকুক আমার হৃদয় ভরা”।

জুয়েলের আজ আনন্দে আত্মহারা হবার কথা। অথচ মনটা তার বিষাদে ভরা, চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু জল। গীটার হাতে উঠে দাঁড়ালো সতীর্থ- ভক্তবৃন্দের সামনে। শাহ আবদুল করিমের কালজয়ী মরমী সংগীত “বন্দে মায়া লাগাইছে-পিরিতি শেখায়ছে- ও দেওয়ানা বানাইছে- কী যাদু করিয়া বন্দে মায়া লাগাইছে”- মুগ্ধ দর্শক শ্রোতা। গীটারের ঝংকারে যেন মননচর্চাকেন্দ্র ঝংকৃত হয়ে ওঠে।

সেই সকাল থেকে কারা গেটে ফুল হাতে অধীর প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে ফাতেমা আক্তার সিমু। অতপর ধীরে ধীরে কারা গেট দিয়ে বেরিয়ে এলো জুয়েল। পিঠে ঝুলানো সেই চিরচেনা গীটার। দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় সুমি। ফুল হাতে দিয়েই দুজন দুজনকে আলিঙ্গন করে। সম্বিৎ ফিরেই দ্রুত সিএনজি নেয়।ছুটে চলে কমলাপুরের উদ্দেশ্যে। ট্রেন ধরে আজ রাতেই যেতে হবে, ফকির হুমায়ুন সাধুর আখড়া, খানাবাড়ি, নরসিংদী।

চলবে—


৯ জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
থানা রোড, সিরাজগঞ্জ

*মতামত বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখাই লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মতামত।