প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন দরকার!

214

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ
আমার শোনিমের শিক্ষা জীবনের শুরুটা জাপানে। প্লেগ্রুপ এবং নার্সারী পড়েছে জাপানীজ কিন্ডার গার্টেনে। প্রতিদিন ভোরবেলা স্কুল ড্রেস পরে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যাওয়া, ঠিক দুটোয় বাসায় ফিরে আসা। মাইনাস ৫ ডিগ্রী তাপমাত্রায়ও কাক ডাকা ভোরে বরফের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যেতে আপত্তি করতো না। কোন কারনে কোন একদিন আমরা নিজেরা স্কুল বন্ধ দিতে চাইলে শোনিম মন খারাপ করতো। শরীর সামান্য খারাপ থাকলেও স্কুলে যেতে দিতেই হতো। স্কুল ছিল ওর স্বপ্ন পূরণের, আনন্দ বিনোদনের জায়গা।
প্রতিদিন সকাল আটটায় ওকে স্কুল গেটে দিয়ে আসতাম। ক্লাশ টিচার নিজ হাতে রিসিভ করতেন। অত্যন্ত পরিপাটি সাজগোজে সুনয়না সুশ্রী তরুনী স্কুলমিস সদাহাস্য বদনে আমাদের কাছ থেকে শোনিমকে বুঝে নিতেন। ঠিক দুটোয় ছুটির সময় শোনিমকে আনতে যেয়ে দেখতাম অপরূপা সেই তরুনীকে আর তেমন করে চেনা যায় না। ময়লা ধূলোয় তার সব সাজগোজ এলোমেলো একাকার। ৬টি ঘন্টায় এত সব বাচ্চাকে সামাল দিতে যেয়ে শিক্ষকেরা ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। এরপরেও গেটের পাশে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে একেকটি বাচ্চাকে অভিভাবকের হাতে তুলে দিচ্ছেন।
সব শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে যাবার পরে শুরু হবে শিক্ষকদের ২য় পর্বের কাজ। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত থেকে সমস্ত স্কুল আঙিনা, ভেতর বাহির পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে সাজিয়ে যাবে পরের দিনের জন্যে। এই কিন্ডারগার্টেনে এত ছোট ছোট বাচ্চাদের আসলে পড়াশুনা বলতে তেমন কিছুই করানো হয় না। কিন্তু যা করানো হয় তা অবিশ্বাস্য। প্রথমত সব কাজের মাধ্যমে এই ধারনাটুকুই দেয়া হয় যে স্কুল একটি মজা করার জায়গা; আনন্দ বিনোদনের জায়গা। পড়াশুনার নামে এমন কিছু চাপিয়ে দেয়া হয় না যা দেখে কেউ ভয় পাবে বা শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে অনুৎসাহিত হবে। বাসার চেয়েও স্কুলকে আকর্ষনীয় করে উপস্থাপন করা হয়।
বাচ্চারা কখনো মজাহীন কোন কিছু নিয়ে থাকতে চায় না। বাচ্চারা খেলতে চায়, গাইতে চায়, লাফাতেচায়, আঁকতে চায়। তাই স্কুলে গেলেই বইপুস্তক ধরিয়ে বলা হয় না যে পড়; অ, আ, ই, ঈ। এসব কখনোই শিশু বয়সে মজাদার কোন বিষয় হতে পারে না। তাই জাপানীজ স্কুলের প্রথম তিন ক্লাশে পড়াশুনার বালাই নেই। কিন্তু আছে পরোক্ষ আর্মি ট্রেনিং; কঠিন সে ট্রেনিং। তবে শিশুরা এসব বুঝতে পারে না; মনে করে খেলা। খেলায় খেলায় সব শিশুকে প্রকৃত সামাজিক জীব হিসেবে যোগ্য করে তোলার চমৎকার ট্রেনিং; সবাইকে এক মন, এক দিলের করে তৈরী করার অপরূপ ট্রেনিং।
কিভাবে খেতে হয়, কিভাবে বাথরুম করতে হয়, বা দাঁত মাজতে হয়; কিংবা কিভাবে কাপড় পড়তে হয় বা বদলাতে হয়; অথবা কিভাবে বসতে হয়, হাঁটতে হয় এসব হাতে কলমে শিখানো হয়। রাস্তায় সিগনাল দেখে কিভাবে রাস্তা পাড়ি দিতে হয়, এখানে সেখানে ময়লা না ফেলে কিভাবে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলতে হয়, কিভাবে সত্য কথা বলতে হয়, বাবা মা বা গুরুজনদের সাথে কিভাবে আদবের সাথে কথা বলতে হয়। কিভাবে কথা বললে অন্যের বিরক্তের কারন হয় না এসব শিখানো হয়। কিভাবে নিজে পরিস্কার থাকবে, বাড়ী এবং এর আঙিনা পরিস্কার রাখবে সে সব ধরে ধরে শেখানো হয়।
শেখানো হয় কিভাবে বাবা মাকে ছাড়াও একা একা স্কুলে আসা যায়, কিভাবে শপিং করতে হয়, কিভাবে অন্যের বিপদে সাহায্য করতে হয়। কিভাবে স্যরি বলতে হয়, কিভাবে ক্ষমা চাইতে হয়; খুব সুন্দর করে শেখানো হয় কিভাবে শুধু নিজের দোষই নয়, অন্যের দোষও নিজের ঘাড়ে নিতে হয়, শেখানো হয় কখন আস্তে কথা বলা দরকার, কখন কথা না বলে চুপ করে থাকা দরকার। শেখানো হয় আরো অনেক অনেক কিছু। ঠিক ছয় বছর বয়সে জাপানী শিক্ষার্থীরা ক্লাশ ওয়ানে ভর্তি হতে নতুন স্কুলে আসে। শুরু হয়তাদের সাধারন পড়াশুনার পাঠদান। ততদিনে তারা সাচ্চা জাপানীজ হয়ে উঠে।
ঐ দেশে ছাত্রছাত্রীরা যত না পড়ে শিক্ষকেরা পড়ে তার চেয়ে ঢের বেশী। শিক্ষকদের কাজই হলো নিত্যদিন পড়াশুনা করে নতুন নতুন তথ্য জানা এবং শিক্ষার্থীদের তা জানানো। জ্ঞান একটি বিশাল আধার। এটাকে জানতে হলে পড়তে হয়; বেশী বেশী পড়তে হয়। না হলে ভুল জিনিস শিখতে হয়। আমরা শিক্ষকদের সংজ্ঞাটাও তো ভুল জানি। আমরা জানি, যিনি শেখান তিনি শিক্ষক। আসলে শেখানো নয়, যিনি তার ছাত্রের সুপ্ত প্রতিভা মূল্যায়ন করে বিকশিত করেন তিনিই হলেন শিক্ষক।
আমাদের দেশে শিক্ষার্থীরা পড়ে; রাতদিন পড়ে। শিক্ষকেরা পড়ে না; পড়া ধরে। মাঝে মাঝে কানেও ধরে। আগের দিনে আরো কিছু ধরতো; পিঠের মধ্যে মোটা বেতের তপাশ তপাশ বারি পড়তো। এখন এসব কমে গেছে; এটা ভাল লক্ষন। শারীরিক নির্যাতন করে আর যাই হোক কাউকে যে মানুষ করা যায় না এটা সর্বজন স্বীকৃত।
তবে বাংলাদেশেও গর্ব করার মত অনেক ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু পড়ানোর ধরনটা এখনো সেকেলে। এখনো পুঁথিগত পড়ানো নিয়েই সবাই ব্যস্ত। জীবনমুখী বিদ্যাশিক্ষার ব্যবস্থা এখনো চালু হয়নি। এসব নিয়ে ভাবার কেউ নেই; এটা যে কতটা জরুরী তা অনুধাবন করতেও কাউকে তেমন দেখি না। সবাই ব্যস্ত। পড়াশুনা করানো নিয়ে ব্যস্ত শিক্ষকের সংখ্যাও যেমনি কম নয়, তেমনি অন্য কাজে ব্যস্ত শিক্ষকের সংখ্যাও নেহাত মন্দ নয়। এদের কেউ ব্যস্ত বেতনভাতা বাড়ানো নিয়ে, কেউবা ব্যস্ত পদপদবী নিয়ে, কেউ ব্যস্ত বিশেষ ধান্দায়।
এদেশে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে যার প্রধান ব্যক্তিটির একমাত্র লক্ষ্যই থাকে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি।এসব কারনে পূরো ম্যানেজমেন্ট নিয়ন্ত্রনহীন হয়ে পড়ে এবং দিনে দিনে প্রতিষ্ঠানটি সুনাম হারায়। পরিচালনা পরিষদ নামে জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি যতই থাকুক না কেন, একটি প্রতিষ্ঠানের মূল চাবিটিই থাকে প্রধান শিক্ষকের কাছে। নীতিহীন এসব প্রধান শিক্ষকেরা নিজের র্স্বার্থ হাসিলের জন্যে প্রতিষ্ঠানকে ইচ্ছেমত ব্যবহার করে। প্রথমে নিজের মত করে প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেট সাজিয়ে নেয়। আর সব সময় কোন না কোন ক্রাইসিস জিইয়ে রাখে যেন পারিষদগন চাইলেও কড়াকড়ি আরোপ করে কোন ভাল সিদ্ধান্ত নিতে না পারে। এক কথায় জনপ্রতিনিধিরাও প্রধান শিক্ষকের চতুরতার হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে।
ভয়াবহ লজ্জাস্কর ব্যাপার হলো এই জাতীয় প্রধান শিক্ষকেরা প্রথমত অবসরে যাবার সময় হলেও অবসরে যান না। খোদ ঢাকা শহরের ৬০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমন অরাজক অবস্থা সম্প্রতি জাতীয় পত্রিকায় খবর হয়েছে। খবরে প্রকাশ, যেমন করেই হোক, কোন না কোন ছুঁতোয় কিংবা অজুহাতে এই প্রতিষ্ঠান সমুহের প্রধানগন ক্ষমতার চেয়ারটি ধরে রাখতে চাচ্ছেন আজীবন। কাজটা করার নিমিত্তে বড়ই কৌশলী আচরন করেন তারা। তাদের ক্ষমতার প্রথম দিন থেকেই সতর্ক থাকেন যেন সেকেন্ডম্যান তৈরী না হয়; যেন সব সময় একক নেতৃত্ব থাকে এবং তাদের অনুপস্থিতিতে নেতৃত্বের শুণ্যতা তৈরী হয়। বিদায়ের সময় দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবার মত সক্ষম কাউকে যেন পাওয়া না যায়। শেষে বাধ্য হয়ে পরিচালনা পরিষদ তাদেরকেই রেখে দেবার ব্যবস্থা করে। জানা যায়, এভাবেই কিছুদিন কিছুকাল থেকে যান তারা; কিন্তু চিরকাল পারেন না। কোন না কোন সময়, কোন না কোন কারণে তাদেরকে একদিন বিদায় নিতেই হয়। কিন্তু সে বিদায়টা মধুর হয় না; হয় তিক্ততার। তারা থাকতে পারেন না দীর্ঘকাল; কিন্তু মানুষের মুখে মুখে তাদের সমালোচনা ফেরে অনন্তকাল!!- লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা