প্রাচ্যের ভ্যানিশ ও নদী মাতৃক বরিশালে কীর্তনখোলা, নদীর জেগে ওঠা চর গিলে খাচ্ছে প্রভাবশালী ভূমি খেকোরা. প্রতিবাদ করলে ভাগ্যে জোটে হামলা না হয় মামলা।

104

কল্যাণ কুমার চন্দ,কীর্তনখোলার চরাঞ্চল ঘুরে এসে..
“নগরীর একতলার লঞ্চঘাট থেকে দুই টাকায় খেয়া পার হয়ে ওপাড়ে নেমেই হতবাক। কীর্তনখোলার বুকে এত বড় দালান! একটি নয়, দুটি নয়, বেশ কয়েকটি। ‘শুনেছি চরে ঠাঁই হয়েছে ভূমিহীন দুঃস্থদের। তারা এতো অর্থশালী হলো কি করে?’ প্রশ্ন শুনে রীতিমতো অবাক হাবিব মিয়া। ‘কয়েন কি মিয়াভাই। গরিব মানুষের খেমতা আছে দালান তোলার? বড়ওলারা সব দহল করে নেছে। হ্যারাই দালান উডাইতাছে।’ কথা বলতে দেখে এগিয়ে আসেন চরের আরেক বাসিন্দা ছকিনা বেগম। বলেন, ‘গাঙের মইধ্যেও গরিবের শান্তি নাই। বড়ওলাগো চোউখ এইহ্যানেও পড়ছে। আমাগো বাড়ি নাই, ঘর নাই, গাঙে সব ভাইঙা লইয়্যা গ্যাছে, উঠছি চরে। কিন্তু এইহ্যানে আইয়্যাও ভিডি কেনতে হইছে। বাড়ি বাড়ি খয়রাত কইরা ট্যাহা দিছি। আল্লার বিচার নাই বাবো (বাবা)।’ বলতে বলতে আঁচলে চোখ মোছেন ষাটোর্ধ্ব ছকিনা বেগম।
ইতিহাস মোতাবেক প্রাচ্যের ভ্যনিশ খ্যাত বরিশাল নগরী কীর্তনখোলা নদীর তীরে। এই নদীর বুকে জেগে ওঠা চরগুলোর একটি রসুলপুর। সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮০ সালে কীর্তনখোলার বুকে জেগে ওঠে রসুলপুর চর। এখানে অনেক খাসজমি রয়েছে। চরবদনা জেএল ৬২ নম্বর মৌজার অধীনে এসব জমি। ২০০১ সাল থেকে বরিশাল শহরের প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা চরের জমি দখল নিতে শুরু করে। কেউ কেউ চরের পাশে নদীতে বাঁধ দিয়ে বালু ভরাট করে প্লট বানিয়েছে। এসব প্লট বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তারা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দখলদারদের প্রায় সবারই কমবেশি রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি দুই সরকারের সময়েই চরের জমি দখলের মহোৎসব হয়েছে। চরের বাসিন্দা পারভেজ রহমানের ভাষায়, ‘আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে রাজনৈতিক কারণে বিরোধ থাকলেও চরের জমি দখলে তারা সবাই একাট্টা। রাজনীতির মাঠে দ্বন্ধ সংঘাত থাকলেও নদী পেরিয়ে চর দখলে তারা সবাই ভাই ভাই। কি আওয়ামী লীগ, কি বিএনপি, রাজনৈতিক বড় দলগুলোর নেতা-কর্মীরাই রয়েছে দখলবাজদের তালিকায়।’ চর দখলের প্রতিকার চেয়ে আইনের আশ্রয়ও নিয়েছিল ভূমিহীনরা। মামলা হলেও ফল পায়নি প্রকৃত দুঃস্থরা। ভূমিহীনদের পক্ষে কয়েক যুগ ধরে কাজ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন নামের একটি সংগঠন। ওই সংগঠনের একাধিক নেতৃবৃন্দরা বলেন, চর দখলদারদের নিয়া আজীবন সংগ্রাম কইরা যামু। কারণ আমরাও ভূমিহীন মানুষ। রসুলপুর চরে আমাদের ঘর ছিলো কিন্তু বড়ওয়ালারা নামাইয়্যা দিছে। শুধু তাই নয়, গরিব মানুষের পক্ষে কথা বলি দেইখ্যা অনেক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে হইছে। আমাদের একাধিকবার মাইরা ফেলাইতেও চাইছে।
*দখলদারদের তালিকায় আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতারা*
রসুলপুর চরে ভূমিদস্যুতার অভিযোগ রয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের লোকজনের বিরুদ্ধেই। যখন যারাই ক্ষমতায় থাকুক না কেন মিলেমিশেই দখলদারিত্বের রাজত্ব কায়েম করেছে এখানকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। ওয়ান ইলেভেনের সময় সরকারি একটি সংস্থার অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে দখলদারদের নাম। সরেজমিনে দেখা গেছে, ৮৭নং চকবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় লাগোয়া তিনতলা একটি ভবন। বাড়ির দেয়ালে একটি সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে এই সম্পত্তি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক বরিশাল শাখার কাছে দায়বদ্ধ। স্থানীয়দের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, এই ভবনের মালিকের নাম বজলুর রহমান। যিনি ভূমি অফিসে (এসিল্যান্ড) হিসেবে চাকরি করতেন। চরের বেশির ভাগ জমি তার হাত দিয়েই মাপঝোপ হয়েছে। তাই লোকে তাকে বজলু সার্ভেয়ার নামেই ডাকেন। এ বাড়ির দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছেন জনৈক হারুন মোল্লা। কথা হয় হারুনের স্ত্রীর সাথে। বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাড়ি ভাড়া নিতে হলে তার স্বামীর সাথে কথা বলতে হবে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চর এলাকায় ৭০ থেকে ৮০টি প্লট তৈরি করে বিক্রি করেছেন বজলুর রহমান। এক থেকে দেড় শতক আয়তনের প্রতিটি প্লট বিক্রি করেছেন এক থেকে দেড় লাখ টাকায়। সরকারি খাস জমিতে দালান তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে বজলুর রহমান বলেন, ‘রসুলপুর চরে আমার একটা ঘর আছে।’ কিন্তু পরবর্তীতে স্বীকার করেন তিনতলা বিশিষ্ট ওই ভবনটির মালিক তিনি। বজুলর রহমান বলেন, ‘ওই জায়গা সরকারি খাস জমি, স্থায়ী স্থাপনা করা যায় না, সবই ঠিক আছে। কিন্তু আমারও কাগজপত্র আছে।’ পাশেই একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে একটি সাইনবোর্ডও লাগানো আছে। যাতে লেখা এই জমির মালিক গনি মিয়া, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রউফ (সেনাবাহিনী অবঃ), উম্মে তাইয়েবা এবং কবির বিশ্বাস। চরবদনা জেএল নম্বর ৬২। খতিয়ান নম্বর ৩৫১। দাগ নম্বর ১৭২২, ১৭২৩, ১৭২৪, ১৭২৫, ১৭২৬, ১৭২৬, ১৭২৮, ১৭২৯। জমির পরিমাণ ২০ শতক। এই জমির উত্তরে চকবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ রাস্তা। দক্ষিণে মজিদ মিয়া ও হারুন মোল্লার সম্পত্তি। সূত্র মতে, সিটি করপোরেশনের ৯নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হারুন-অর রশিদ রসুলপুর চরের দেড় একরের বেশি জমি দখলে নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এরমধ্যে এক থেকে দেড় শতক আয়তনের ৪১টি ভিটি বিক্রি করেছেন তিনি। এ থেকে কোটি টাকার ওপরে আয় করেছেন তিনি। এছাড়া ৬০ শতক মাছের ঘের করে জমি জবরদখল করে নিয়েছেন। হারুন-অর রশিদ এলাকায় বিহারী হারুন নামে পরিচিত। তিনি বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। বরিশাল চকবাজারের কাপড় ব্যবসায়ী ইমরাজ মিয়াও রয়েছেন দখলদারদের তালিকায়। চরে তার দখল করা জমিতে ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছেন। ১ একর ২০ শতক জমি জবরদখল করেছেন এ ব্যবসায়ী। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত এই ব্যক্তি চকবাজারে ১২ থেকে ১৪টি দোকানের মালিক বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, বরিশাল সিটির ২৭নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নুরুল ইসলাম একসময় রুটি বিক্রেতা ছিলেন। এখন তিনি কয়েক কোটি টাকার মালিক। রসুলপুর চরে জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কীর্তনখোলা নদীতে প্রায় ২ একর জমিতে পাঁচ ফুট উঁচু বাঁধ দিয়ে বালু ভরাট করে প্লট তৈরি করে বিক্রি করেছেন। এছাড়া ১০টির মতো ভিটি তৈরি করে ভূমিহীনদের কাছে বিক্রি করে হাতিয়ে নিয়েছেন বিপুল অঙ্কের টাকা। এর বাইরেও আরও জমিদখলের অভিযোগ রয়েছে নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। আইন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরাও পিছপা হননি চরের জমি দখল থেকে। সহিদ উকিল তাদের একজন। তিনিও রসুলপুর চরের ৪৮ শতক খাস জমিতে মাছের ঘের ও ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছেন। চরবাসীর কাছে মূর্তিমান আতঙ্কের নাম কবির ঢালী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা বলেন, ‘চরের দখলদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর সর্দার কবির ঢালী। চরের সালিশদার হিসেবেও লোকে তাকে চেনেন। আওয়ামী লীগের লোক হওয়ায় পুলিশ ও প্রশাসনের লোকও তার কিছুই করতে পারছেন না।
সরকারি অনুসন্ধান প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, এই চরের জমিতে ২৩টি ভিটি তুলে তা দুঃস্থদের কাছে বিক্রি করেছেন তিনি। যার একেকটির আয়তন তিন থেকে চার শতক। এছাড়া ঘর তুলেও ভাড়া দিয়েছেন কবির ঢালী। এর বাইরে ৩৫ শতক জমি জবরদখল করে রেখেছেন তিনি। তবে স্থানীয়রা বলেছেন, দেড়’শর মতো ভিটি বিক্রি করেছেন। এছাড়া ২০ শতক করে চারটি প্লট তৈরি করে প্রতিটি প্রায় দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ নেতা পরিমল চন্দ্র চরের জায়গা দখল করে ১৫০ থেকে ২০০টি ভিটি তৈরি করে বিক্রি করেছেন। এছাড়া আরেক আওয়ামী লীগ নেতা খান হাবিব পোর্ট রোডে বাজারের সামনে পাঁচ তলা ভবন তুলেছেন। এটিও চরের জায়গা বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। জমিজমা মাপঝোপের কাজ করেন কালা হারুন। রসুলপুর চরের জমি দখল করে অর্ধশত প্লট বানিয়ে তিনি বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া চরে হোটেলও দিয়েছেন হারুন।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শেখ রহিম নামের এক ব্যক্তি চরের ৮০ শতক জমি দখল করে সেখানে মাটি ভরাট করে বিক্রি করেছেন। তিনি বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। একই দলের রাজনীতির সাথে জড়িত বশির আহমেদ চরের জায়গায় ১০০টি ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছেন। বিএনপির আরেক নেতা হাজী আকবর আলীও চরের জমিতে ১৩৭টি ভিটি তৈরি করে বিক্রি করেছেন। ২০ শতক জায়গায় প্লট বানিয়েও দখল করে নিয়েছেন। তবে হাজী আকবর আলী এখন বেঁচে নেই। ওয়ান ইলেভেনের সময়কারের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আব্দুর রহিম নামের এক ব্যক্তি এই চরের ৮০ শতক খাসজমি দখল করেছেন। জাহাঙ্গীর তালুকদার ১০টি ভিটি তৈরি করে বিক্রি করেছেন। ভাড়া দিয়েছেন পাঁচটি। এর বাইরেও একশ শতক জমিতে সীমানা প্রাচীর তুলে দখল করেছেন। জনৈক মোশাররফ হোসেন ৮০ শতক জমি জবরদখল করেছেন। ৪৮ শতক জমিতে রয়েছে মুরগির খামার এবং মাছের ঘের। শুক্কুর আলী চরের জমিতে ১০টি ভিটি বিক্রি করেছেন। ভাড়া দিয়েছেন ২০টি। এছাড়া ২০ শতক জমিও দখলে নিয়েছেন। শাজাহান (মাস্তান) ৩১টি ভিটি বিক্রি করেছেন। পাঁচটি ভাড়া এবং ১০ শতক জমি নিজে দখলে রেখেছেন। সুলতানী বিড়ি শ্রমিক নেতা রহিম মিয়াও চরের জমিতে ২১টি ভিটি তৈরি করে বিক্রি করেছেন। নিজের দখলে রেখেছেন নয়টি। চাঁন বুড়ি নামের এক নারী ১৭টি ভিটি বিক্রি করেছেন। ভাড়া দিয়েছেন ১০টি। এছাড়া নিজের দখলে রয়েছে পাঁচটি ভিটি। কামরুল দর্জি ১০টি ভিটি বিক্রি করেছেন, ভাড়া দিয়েছেন পাঁচটি। দখলে নিয়েছেন ১০ শতক জমি। আব্দুস সাত্তার নামের এক ব্যক্তি চরে পাঁচটি ভিটি বিক্রি করেছেন এবং ১২ শতক জমি দখল করেছেন। শাজাহান সরদার এবং জয়নাল সরদার দু’জনে মিলে ১৫০টি ভিটি বিক্রি করেছেন। একই সাথে ৬০ শতক জমিও দখলে নিয়েছেন। এছাড়া ইউনুস মিয়া নামের এক ব্যক্তি কীর্তনখোলা নদীতে বাঁধ দিয়ে বালু ভরাট করে প্লট তৈরি করেছেন।
মাদ্রাসার নামে সীমানা প্রাচীর ॥ রসুলপুর চরের শেষ দিকটায় চোখে পড়ল নদীর তীর ঘেঁষা একটি সীমানা প্রাচীর। প্রাচীর দেয়ালে লেখা ‘হাজী আমির হোসেন হাফেজী নূরানী কওমী মাদ্রাসা।’ কিন্তু প্রাচীরের ভেতরে কোনো স্থাপনা নেই। এক কোণায় একটি ডেরা তোলা। ইউনুস আলী ও তার পরিবার এই ডেরায় থাকেন। জানতে চাইলে ইউনুস আলী বলেন, ‘এই জায়গায় মাদ্রাসা করার কথা ছিল। বিদেশ থেকে লোক আসছিল। কিন্তু এখানে তারা মাদ্রাসা নির্মাণে কোনো টাকা দেবে না বলেছে।’ ইউনুস আলী জানান, তিনি জায়গাটিতে ঘর তুলে আছেন। তবে জায়গার মালিক আমির হাজী। একটু এগোতেই ছুটে আসেন জসিম উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি। তিনি এখানে আসার ব্যাপারে তুষ্ট না হয়ে অসদ আচারন করেন। জানতে চাইলে ইউনুস আলী একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে বলেন, ‘আগে এইখানে প্রায়ই সাংবাদিকরা আইতো। হেরা নদী ভরাটের ছবি তুলতো। মানুষের সাথে কথা বলতো। এরপর থাইক্যা এইহানে ঘর তুইল্যা পাহারা বসাইছে বড়ওয়ালারা। জসিম তাদের লোক।’ নদীর কূল ঘেঁষে সিমেন্টের (আরসিসি) পিলার, বালুর বস্তা ফেলে শক্ত বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও চাটাই, বাঁশ দিয়েও বাঁধ দেওয়া হয়েছে। আর এভাবেই চলছে বাঁধ দিয়ে কীর্তনখোলা নদী ভরাটের কাজ। আর ভরাট করে সেখানে প্লট তৈরি করে বিক্রি করে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে কোটি কোটি টাকা। অথচ ভূমিহীনরা এর প্রতিবাদ করেও কোনো ফল পায়নি।
বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের জেলা সভাপতি হারুন ভান্ডারী বলেন, ‘বরিশালের প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা কীর্তনখোলা নদী ভরাট করে প্লট বানিয়ে বিক্রি করছে। আমরা এই চরের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।’ কীর্তনখোলা নদীতে এ পর্যন্ত জেগে উঠেছে পাঁচটি চর। জমির পরিমাণ প্রায় সাড়ে তিন’শ একর। এরমধ্যে প্রায় ২৫ একর জমি সম্প্রতি ভরাট ও প্লট তৈরি করা হয়েছে।
দখলে কীর্তনখোলা ॥ একের পর এক বিস্তীর্ণ এলাকায় নদী ভরাট করার কারণে নৌপথ সরু হয়ে এসেছে। এতে সমস্যা হচ্ছে ঢাকা-বরিশাল রুটের লঞ্চ চলাচলে। নৌযান মালিক সমিতির সদস্য সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘কীর্তনখোলা নদীতে এমনভাবে চর জেগেছে যে লঞ্চ চলতে অসুবিধা হচ্ছে। তার ওপর এই চরের আশপাশে ভরাট করে নদীকে মেরে ফেলা হচ্ছে। যে কারণে অনেক লঞ্চ মালিক তাদের লঞ্চ ব্যবসা গুটিয়ে ফেলছেন।
ভয়ে মুখ খুলতে চান না তাঁরা ॥ রসুলপুর চরে যারা বাস করেন তাদের প্রায় সবারই মুখবন্ধ। বাইরের কোনো লোকের সাথে কথা বলতে বারণ তাদের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক দোকানী বলেন, ‘ভাই এখানকার মানুষ এক ধরনের জিম্মিদশায় রয়েছে। কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। কিন্তু সবাই জানে কারা গরিব মানুষের চর দখল করে অট্টালিকা বানাচ্ছে। এর আগে যারা মুখ খুলেছে তাদের সবাইকে মার খেতে হয়েছে। চর ছাড়া হতে হয়েছে। তাই খেটে খাওয়া মানুষগুলো নিজের খেয়ে এখন আর ঝামেলায় জড়াতে চায়না’।
প্রতিকার পাননি ভূমিহীনরা ॥ ভূমিহীন কৃষক ফেডারেশন বরিশাল শাখা সূত্রে জানা গেছে, অবৈধভাবে সরকারি জমি দখলের বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে ২০১১ সালের ১৯ জুলাই তারা স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে আবেদন করা হয়েছিলো। এছাড়া এ সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি ও জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি।
প্রশাসন যা বলেছেন ॥ বরিশালের জেলা প্রশাসক ডাঃ গাজী সাইফুজ্জামান বলেন, ‘সরকারি জমি নিয়ে ব্যবসা করার জন্য কাউকে বরাদ্দ দেয়া হয়নি। অতীতে যদি কেউ বন্দোবস্ত নিয়ে থাকেন সে ব্যাপারে আদালতের কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।