প্রসঙ্গ দেশীয় গার্মেন্টস শিল্প

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন:

জীবনের ভালমন্দ বোঝার বয়স তখনও হয়নি আমার। সবে পাশ করেছি। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পরপরই আগপিছ না ভেবে, বিসিএস এর ভাবনায় না ডুবে কাজে নেমে পড়েছিলাম। কাজ মানে কাজ। সেটা যেমনই হোক। এবং এই কাজ দিয়েই আমার ক্যারিয়ারের শুরু। ক্যারিয়ারের শুরুতে গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। তবে ঠিক গার্মেন্টস শিল্প নয়; গার্মেন্টস শিল্পের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং এর ইন্টেরিয়র নিয়ে।
বলছিলাম নব্বইয়ের দশকের একেবারে শুরুর দিককার কথা। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ তখনো ব্র্যান্ড হয়ে ওঠেনি। দেশীয় গার্মেন্টস ইন্ডাষ্ট্রিগুলো সবেমাত্র শক্তভাবে দাঁড়াবার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। এবং বিদেশী ম্যানুফ্যাকচারাররাও দেশে আসা শুরু করেছে। সস্তাশ্রমের এই দেশে গার্মেন্টস শিল্পের অপার সম্ভাবনা ছিল বলেই তারা এদেশে বিনিয়োগে উৎসাহী ছিলেন। হংকং চায়নার বিনিয়োগকারীগণ ফিলিপাইন থেকে এক্সপার্ট গার্মেন্টসকর্মী নিয়ে আসতেন। বিশ্বে তখন চায়না ফিলিপাইনের কর্মীদের জয়জয়কার।
জয়জয়কার জুকি মেশিনেরও। গার্মেন্টস শিল্পের সেরা সেলাই মেশিন। দেশীয় গার্মেন্টস শিল্পের ৯০ ভাগ দখলে নিয়ে রেখেছে জুকি। যেখানেই যাই, কেবল জুকি আর জুকি। মতিঝিলের জাকারিয়া এন্টারপ্রাইজের অফিসে শুধু ভীড় আর ভীড়। জুকি মেশিন কেনার ভীড়। জাকারিয়া এন্টারপ্রাইজ জুকির একমাত্র সোল এজেন্ট বাংলাদেশে। একচেটিয়া ব্যবসা করে যাচ্ছে। কাষ্টমারে অফিস গিজগিজ করে সারাদিন। দিনভর অর্ডার নেয়া আর এলসি করায় ব্যস্ত এন্টারপ্রাইজের লোকজন।
আমাদের মত ছোটখাট সাপ্লাইয়ার কিংবা কন্ট্রাকটরদেরকে সময় দেবার মত ফুসরত এইসব লোকজনের কারোরই নেই। কোনভাবে কাউকে পাওয়া গেলেও তারা দেখিয়ে দিতেন মালিকদের। মালিক আবার একজন নয়। একাধিক। বেশি ক্ষমতা এমডি সাহেবের। বাকীদেরও কমবেশী থাকতো। কিন্তু পাওনা বিলের জন্যে তাদের সবারই পিছে পিছে ঘোরা লাগতো। কাউকে সকালে পাই তো কাউকে বিকেলে। কাছে গেলেই দেখতাম, পাওনাদারকে সময় দেবার মত সামান্য সময়ও তাদের নেই। তাদের সময় পুরোটাই বরাদ্দ বায়ারদের জন্যে। সময় যাই দিতেন, কথা তেমন বলতেন না। শুধু শুনতেন। আর বলতেন কেবল এক লাইন; “কাল আসেন।” আমি ফিরে আসতাম। কিন্তু সেই ‘কাল’ আর কোনকালেই আসতো না। আমার আজো দিব্বি মনে আছে; অন্তত তিনটি প্রতিষ্ঠান আমাকে পুরো বিলের টাকা শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করেনি। দিনের পর দিন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ত্যক্ত বিরক্ত করে ছেড়েছে। তবুও পাওনা পরিশোধ করেনি আজো। এদের মাঝের একজন তো হঠাৎ করে একদিন সরকারের প্রতিমন্ত্রী হয়ে গেলেন। এবার আরো জটিল হলো পাওনা পেতে। আগে দেখলে ‘আপনি’ করে বলতেন। এবার ‘তুমি’তে নামলেন।
তবুও ইজ্জত আমার নামাতে পারেননি। ইজ্জতহীনের আবার ইজ্জত কি! ঘুরতেই থাকলাম তার পিছে। একদিন সাত সকালে মন্ত্রীর বাসা, তো অন্যদিন দুপুরে সচিবালয়। কিন্তু সচিবালয় কি এতই সোজা! এখানে ঢুকতে লাগে পাস। ঘন্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও পাস পাইনি অনেকদিন। এবং আজো পাইনি সেই পুরনো পাওনা। মাঝে ২৮ বছর কেটে গেছে এবং আশাও ছেড়ে দিয়েছি বহু আগে। আশা যেমনি ছেড়ে দিয়েছি, তেমনি দাবীও। দাবী রেখেই বা লাভ কি! চাইলেই কি তাদের পাওয়া যাবে! তাদের ঠিকানা শেরাটন আর রেডিসন। তারা গার্মেন্টস মালিক; সব ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তাদের ভাবসাবই আলাদা। প্রবাসীরা নয়, যেন কেবল তারাই রেমিটেন্স আনেন। বাংলাদেশের সব পদ পদবী তাদের। তারাই সিআইপি, তারাই ভিআইপি।
জাতীয় সংসদ তথা জাতীয় রাজনীতিতে তারা। তারা পার্লামেন্ট চালায়, শহরও চালায়। কেবল ভাল করে চালাতে পারে না নিজের ফ্যাক্টরী। করোনায় দশ দিন লকডাউন থাকলে তারা খেটে খাওয়া শ্রমিকদের ৩০ দিনের বেতন আটকে দেয়। বছরের পর বছর যারা কোটি কোটি ডলার আয় করে ভাব দেখায়, সেই তারাই মাত্র একটি মাস শ্রমিকদের বসিয়ে বেতন দিতে পারে না। বেতন দেবার জন্যে সরকারকে জনগণের রাজস্ব ভান্ডার নিয়ে এগিয়ে আসতে হয়। দিতে হয় প্রণোদনা।
না দিলে সব যায়। ব্যবসা যায়, বাণিজ্য যায়। যায় দেশও। আর আসে কেবল হুমকি। বহির্বিশ্বে দেশীয় মার্কেট হাতছাড়া হবার কড়া হুমকি। কথায় কথায় হুমকি। সকালে হুমকি, বিকেলে হুমকি। তবে হুমকি ধামকি সরকারকে যাই দেয়, বেশি দেয় শ্রমিকদেরকে। প্রথমে বেতনের হুমকি; পরে ফ্যাক্টরী লেঅফ এর। ফ্যাক্টরী লেঅফ মানে, চাকুরি শেষ। হুমকিতে কাজ হয়। সরকার তড়িঘড়ি প্রণোদনা দেয় আর রাস্তায় গাড়িঘোড়া না থাকলেও মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে ফ্যাক্টরীতে ফিরে আসে শ্রমিকের দল।
জাষ্ট পেটের মায়ায় শ্রমিকগণ এমন করতে বাধ্য হয়। কিন্তু দেশের মায়ায় তথাকথিত এই দেশ দরদীরা নিজেদের পকেট থেকে দেশকে কিছু দিতে বাধ্য হয়েছে, এমন নজির নেই। থাকলেও সেটা গবেষণা করে বের করার বিষয়। তবে চোখ বন্ধ করে বলা যায়, দেশ তাদের সব দিয়েছে। যেমনি অর্থ দিয়েছে, তেমনি ইজ্জতও দিয়েছে। কিন্তু সেই দেশের মানুষ, মানে গার্মেন্টস এ কর্মরত শ্রমিক কর্মচারীদের তারা কিছুই দেয়নি। গার্মেন্টস শ্রমিক শ্রেণী আজো শ্রমিকই রয়ে গেছে। যদিও মালিক পক্ষ কিংবা তাদের পরিবারবর্গ ধনী থেকে আরো ধনী হয়েছে।
দুঃখ লাগে কেবল এই জায়গায় যে, এতো বছরের গার্মেন্টস শিল্প আজ পর্যন্ত শতভাগ শ্রমিকবান্ধব হতে পারেনি। শ্রমিকরা বস্তির মত ঘরে থাকে। কারখানায় তাদের আসা যাওয়ার ব্যবস্থাও নিরাপদ নয়। প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি দানের মতো গার্মেন্টস শ্রমিকদের কর্মস্থলের কাছাকাছি জায়গায় বাড়ি দেওয়া যেতো। সরকারের কাছে তারা কত কিছু চায়। নিজেদের ভবনের জন্য জমি চায়। কথায় কথায় ঋণ চায় এবং পায়। কিন্তু শ্রমিকদের আবাসিক ব্যবস্থার জন্য কোনোদিন জমিও চায়নি। ঋণও চায়নি।
মাত্র ১ লাখ ৭০ হাজার টাকায় প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি তৈরি হচ্ছে। টাকার অংকে এটা বড় কিছু কি? এই টাকা গার্মেন্টস শ্রমিকরা সহজেই কিস্তিতে পরিশোধ করতে পারতো। অথচ মালিকরা এভাবে কোনোদিনও ভাবেননি। ভাবার ক্ষমতা নেই বলবো না। বলবো, ভাবার ইচ্ছেই নেই। তাদের ভাবনা ছকেআঁকা গোলক ধাঁধাঁয় দোল খায়। তারা ভাবেন, বছরে একবার গার্মেন্টসের আঙিনায় সেলিব্রেটি নাচ দেখিয়ে কিংবা কনসার্ট করে অথবা শ্রমিকদের নিয়ে কাছাকাছি কোন বনে যেয়ে বনভোজন করাই হচ্ছে সবচেয়ে শ্রমিক বান্ধব কাজ!
করোনার এই কঠিন দিনে করোনার অজুহাতে সেটুকুও তাদের করা লাগেনি। দেশের সকল সেক্টর সরকারের কাছে তাদের লোকজনের জন্য ভ্যাকসিন চেয়েছে। শিক্ষাখাত থেকে শুরু করে কৃষিখাত পর্যন্ত। কিন্তু গার্মেন্টস মালিকরা তাদের শ্রমিকদের জন্যে জোরগলায় ভ্যাকসিন চেয়েছেন এমন দৃষ্টান্ত নেই। তাদের চাইবার দরকার ছিল না। বিদেশি বায়ারদের সঙ্গে যোগযোগ-দেনদরবার করে নিজেরাই ভ্যাকসিন আনতে পারতেন। বিদেশি বায়াররা নিজেদের ব্যবসার স্বার্থেই ভ্যাকসিন এনে দিত। এতে তাদের ব্যবসারই বরং উপকার হতো। পাশাপাশি দেশের উপকার হতো। দেশবাসীর কষ্ট লাঘব হতো। কিন্তু তারা এমনটা চাননি এবং আনেনওনি।
তারা চেয়েছেন কেবলই প্রণোদনা। করোনার একেকটা ঢেউ এসেছে। আর হুরমুর করে এসেছে লকডাউন। এতে দেশবাসীর কণ্ঠ ডাউন হলেও উচ্চকণ্ঠ হয়েছে গার্মেন্টস মালিকদের। প্রণোদনা চাওয়ার নামে হাউমাউ চেঁচামেচি করে উচ্চকণ্ঠে একটা বার্তাই দেশবাসীকে দিতে পেরেছে তারা। আর তা হলো, শ্রমিকদের চেয়ে গার্মেন্টস মালিকরা ঢের গরিব। সরকার তাদের জন্য যা কিছুই করুক, কোন লাভ নেই। এতে শুধু সরকারী ভান্ডারের অর্থই যাবে। কিন্তু মালিকদের গরীবানা যাবে না কোনকালেও।