পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, প্রথম দিনেই আটক ১ হাজার

33

যুগবার্তা ডেস্কঃ জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের দমনে সারা দেশে পুলিশের ‘সাঁড়াশি অভিযানে’র প্রথম দিনে এক হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়েছে। এদের বেশির ভাগ বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের কর্মী, মাদক ব্যবসায়ী বা বিভিন্ন মামলার আসামি।

গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে এই অভিযান শুরুর পর সাতক্ষীরায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। পুলিশের দাবি, তিনি ‘চরমপন্থী’ দলের সদস্য।

দেশের বিভিন্ন জেলায় সন্দেহভাজন উগ্রপন্থীদের হাতে একের পর এক হত্যাকাণ্ড এবং বিশেষ করে ৫ জুন চট্টগ্রামে পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম খুনের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তরে মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হকের সভাপতিত্বে এক বৈঠকে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। এই অভিযান চলবে এক সপ্তাহ।

তবে অভিযানের প্রথম দিনে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের কোনো সদস্য ধরা পড়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেননি পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সদর দপ্তরের জনসংযোগ শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে আজ শনিবার।

সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের জন্য জঙ্গিদের সন্দেহ করা হচ্ছে। বেশির ভাগ খুনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) নামে দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।

বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে রাজধানী ঢাকাতেও তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার বা আটকের খবর পাওয়া গেছে ঢাকা এবং অন্য ১৮টি জেলা থেকে।

রাজনৈতিক কর্মী, বিভিন্ন মামলার আসামি ও মাদক ব্যবসায়ী আটক। জঙ্গি গ্রেপ্তারের তথ্য নেই
এদিকে পুলিশ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, বিশেষ অভিযানের প্রথম দিনেই সারা দেশ থেকে নয় শতাধিক মানুষকে আটক করা হয়েছে।

বন্দুকযুদ্ধে একজন নিহত: সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত মোজাফফর সানা (৪০) পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল জনযুদ্ধ) আঞ্চলিক নেতা বলে দাবি করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাত আড়াইটার দিকে উপজেলার মাগুরা ইউনিয়নের চারা বটতলায় এ ঘটনা ঘটে।

সাতক্ষীরা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৃহস্পতিবার রাত আড়াইটার দিকে মাগুরা বাজার থেকে জেঠুয়ার দিকে একটি মোটরসাইকেল আসতে দেখে থামার সংকেত দেয় পুলিশের একটি দল। এ সময় মোটরসাইকেলে থাকা তিনজন আরোহী পুলিশকে লক্ষ্য করে দুটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় ও গুলি ছোড়ে। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে।

এতে মোজাফফর আহত হন। দুজন সন্ত্রাসী মোটরসাইকেল ফেলে পালিয়ে যায়। তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মোজাফফরকে মৃত ঘোষণা করেন।

পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে সন্ত্রাসীদের ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল, একটি দেশীয় তৈরি শাটারগান, তিনটি গুলি ও বিস্ফোরিত বোমার অংশবিশেষ পাওয়া গেছে। মোজাফফরের বিরুদ্ধে সাতক্ষীরা ও নওগাঁ জেলার ১৮টি মামলা রয়েছে।

নিহত ব্যক্তির চাচা আবদুল জলিল বলেন, মোজাফফর একাধিকবার জেলও খেটেছে। তিন বছর ধরে বাড়ির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল না।

এক হাজার আটক ও গ্রেপ্তার: পুলিশের বিভিন্ন জেলার নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা সারা দেশে এক হাজারের বেশি আটকের খবর পাঠিয়েছেন:

ঢাকা: মহানগরীতে বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে ১৭৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) মাসুদুর রহমান।

চট্টগ্রাম: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে শুক্রবার পর্যন্ত বিভিন্ন মামলার ১৭৩ আসামিকে গ্রেপ্তার করেছেন। এদের একজন বাঁশখালীর নাশকতা মামলার আসামি।

পুলিশ সূত্র জানায়, বিশেষ অভিযানে জেলায় ১৩৫ জন এবং নগরীতে ১৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাঁশখালী উপজেলা থেকে জামায়াতের একজন কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, নগরীতে দাগি সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযান চলছে।

চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজাউল মাসুদ বলেন, ২০১৩ সালে বাঁশখালী উপজেলা ভবনে অগ্নিসংযোগের মামলার আসামি জামায়াতের কর্মী জাকেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেলা পুলিশ প্রতিদিন গড়ে ৬০-৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করে থাকে। এখন অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে।

ফেনী: জেলায় জামায়াতের তিনজন, বিএনপির একজন কর্মীসহ ৩১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেলা পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষ সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে দুজন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক এবং হত্যা, ডাকাতি, সন্ত্রাস চাঁদাবাজিসহ নিয়মিত মামলায় আসামি। কয়েকজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল।

রাজশাহী: মহানগর ও জেলায় ৩৪ জনকে আটক করা হয়েছে। রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও রাজপাড়া থানার জোনের সহকারী কমিশনার ইফতে খায়ের আলম বলেন, নগরে বিশেষ অভিযানে আটক হওয়া ৩১ জনের মধ্যে ১৫ জন নিয়মিত মামলার আসামি। অপর ১৬ জন মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবী। বিশেষ অভিযানের প্রথম দিনে জঙ্গি-সংশ্লিষ্ট কাউকে আটক করা যায়নি।

নাটোর: জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুনশী শাহাবুদ্দিন বলেন, র‌্যাব ও পুলিশের বিশেষ অভিযানে জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে মামলার পরোয়ানাভুক্ত আসামি, পলাতক আসামি, সন্দেহভাজনসহ ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে তল্লাশিচৌকি বসিয়ে মোটরসাইকেলের বৈধ কাগজপত্র না থাকায় ৪০টি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে।

দিনাজপুর: জেলায় পুলিশ ও র‌্যাবের যৌথ অভিযানে ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেলার পুলিশ সুপার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১৩ উপজেলায় এই অভিযানে গ্রেপ্তারকৃতরা বিভিন্ন মামলার পলাতক আসামি। এদের মধ্যে দুজন শিবির কর্মী।

রংপুর: জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল ফারুক জানান, বিশেষ ৯০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা বিভিন্ন মামলার আসামি।

সাতক্ষীরা: জেলায় বিশেষ অভিযানে দুজন জামায়াত কর্মীসহ ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ১২টা থেকে শুক্রবার ভোর ৫টার মধ্যে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

যশোর: আটটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় কমপক্ষে ৬৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা নাশকতাসহ বিভিন্ন মামলার আসামি। আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

নড়াইল: জেলার পুলিশ সুপার সরদার রকিবুল ইসলাম বলেন, বিশেষ অভিযানে নড়াইলে দুজন জামায়াত নেতাসহ ৪৭ জনকে আটক করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। এ সময় সদর উপজেলার ধোন্দা এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া: এই অভিযানে বিএনপি, জামায়াতের নেতা-কর্মীসহ, সাজাপ্রাপ্ত ও পরোয়ানাভুক্ত আসামি, ডাকাত ও মাদক ব্যবসায়ীসহ অন্তত ৩১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

নেত্রকোনা: আটটি উপজেলায় পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে জামায়াত-শিবিরের আটজন নেতা-কর্মীকে আটক করেছে। এদের মধ্যে তিনজন উপজেলা শাখার জামায়াতের আমির। পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী বলেন, আটককৃত ব্যক্তিদের নামে আগে মামলা এবং বর্তমানে নাশকতা সৃষ্টি পরিকল্পনা করার অভিযোগ রয়েছে।

জয়পুরহাট: জেলার বিভিন্ন গ্রামে অভিযান চালিয়ে পুলিশ ৩৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

এ ছাড়া পঞ্চগড়ে ২৬ জন, নাটোরে ২৭, সিরাজগঞ্জে ১৪, টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ৬ এবং কিশোরগঞ্জে দুজনকে আটক করা হয়েছে। নোয়াখালীতে আটক করা হয়েছে ৪৫ জনকে।

জামায়াতের ৬৫: পুলিশ বিশেষ অভিযানের নামে বিভিন্ন জেলা দলের ৬৫ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী। গতকাল এক বিবৃতিতে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এই অভিযোগ করেন।ইত্তেফাক