পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ মানবে না

যুগবার্তা ডেস্কঃ রোববার সকালে পুরানা পল্টনস্থ মুক্তিভবনের মৈত্রী মিলনায়তনে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য সংগঠনের উপদেষ্টা সেকেন্দার হায়াৎ বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে ঢাকা শহরের ফুটপাতের হকারদের উপর চলছে এক নির্মম ও নিষ্টুর অভিযান। উচ্ছেদের নামে প্রতিদিন সিটি কর্পোরেশনের সাথে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী নিয়ে ব্যাপক ভাংচুর, মালামাল নষ্ট, লুটপাট চালাচ্ছে। হাজার হাজার স্বল্প পুঁজির হকার মালামাল হারিয়ে, রুটি রুজির জায়গা থেকে বিতাড়িত হয়েছে। এই মানুষগুলো সর্বশান্ত অবস্থায় পরিবার, পরিজন নিয়ে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। এই দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষগুলো নিরুপায় হয়ে প্রতিরোধ সংগ্রামে নেমেছে। বহু প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে চলছে হকারদের দশ দফা দাবির আন্দোলন। ম্যাজিষ্ট্রেট ও বুলডোজারের সামনে সহায় সম্বল রক্ষার আকুতি নিয়ে দাঁড়ানো এবং ফলাফল হিসেবে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে প্রতিদিনই। নিরীহ হকারদের বিরুদ্ধে সিটি কর্পোরেশন ও প্রশাসনের এই নিষ্টুর বলপ্রয়োগ অবিলম্বে বন্ধ করা এবং পূনর্বাসনের যথাযথ ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত ফুটপাতের চার ভাগের এক ভাগ জায়গায় হকার বসতে দেয়ার দাবিতে আমাদের আজকের সংবাদ সম্মেলন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বিগত কয়েকদিন ধরে বলে যাচ্ছেন, তিনি জগনের ফুটপাত জনগণকে ফিরিয়ে দেবেন। কথাটা শুনতে বেশ, কিন্তু এই নগরীর কয়েক লক্ষ্য হকার এবং তাদের ষাট থেকে সত্তর লক্ষ ক্রেতা, তারা কি জনগণের হিসাবের মধ্যে পড়ে না? এই প্রশ্নের উত্তর মেয়র সাহেব বরাবরই এড়িয়ে যাচ্ছেন। নগরীর পঁচানব্বই ভাগ মানুষ কেনাকাটার জন্য কমবেশী ফুটপাতের ওপর নির্ভরশীল। তাদের বিপুল অধিকাংশই বিত্ত্বহীন শ্রমজীবি জনতা, যাদের ফুটপাথ ভিন্ন অন্য কোথাও কেনাকাটা করতে যাওয়ার উপায় নেই। মেয়রসহ অন্যান্য যারা হকার প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে ফুটপাথ একেবারে ফাঁকা করতে চাচ্ছেন, তারা জনগণ বলতে সম্ভবত শুধু ঐ বাকি পাঁচ ভাগ উচ্চ বিত্ত নগরবাসীকেই বোঝেন।
গত ১৮ জানুয়ারী ২০১৭ আমরা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ৯দিনের কর্মসূচী ঘোষণা করেছিলাম। সে অনুযায়ী আমাদের প্রতিটি কর্মসূচি পালন হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বিশেষ করে ওয়ার্ড কাউন্সিলর, তাদের সাথে আলোচনা করে আমরা যেটা জানতে পেরেছি সেটা হলো এই- যে মাননীয় মেয়র মহোদয় স্থানীয় কাউন্সিলরদের সাথে আলোচনা, বৈঠক কোনটাই করেননি। তিনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটি উনার একক সিদ্ধান্ত। এবং এই সিদ্ধান্তে স্থানীয় কাউন্সিলররা মর্মাহত। তাঁরা হকারদের উচ্ছেদ কোনভাবে মেনে নিতে পারছে না। মেয়র মহোদয় বলেছিলেন, হকার সংগঠনগুলোর সাথে তিনি বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাহলে সেই সমস্ত হকার সংগঠনগুলো কেন রাজপথে মিছিল সমাবেশ করছে?
গত ২১ জানুয়ারী হকার সমস্যা সমাধানে করণীয় শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক থেকে যে সুপারিশগুলো উঠে আসে, সেগুলো হলো- হকার পুনর্বাসনের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদী মহা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ফুটপাতের হকারদের পূণর্বাসনের জন্য স্বল্প মেয়াদে এবং দীর্ঘ মেয়াদে দুই ধাপে অগ্রসর হতে হবে। তবে তারো আগে প্রকৃত হকারদের তালিকাভুক্ত করে তাদের পরিচয়পত্র প্রদান করতে হবে। তালিকা প্রণয়নের জন্য সিটি কর্পোরেশন প্রতিনিধি, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর, হকার সংগঠন প্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং মসজিদের ইমামের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে সঠিক তালিকা প্রণয়ণ করতে হবে। এটাই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই কাজের সফলতার উপর নির্ভর করবে গোটা পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার সফলতা। পথ বিক্রেতা সুরক্ষা আইন করে তালিকাভুক্ত হকারদের কাছ থেকে মাসিক ভিত্তিতে অর্থ নিয়ে সেটার সাথে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি যুক্ত করে স্থায়ীভাবে তাদের জন্য ব্যবস্থা করা যায়। ভারতে হকারদের জন্য করা ২০১৪ সালের আইন আমরা বিবেচনায় নিতে পারি। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী স্বল্প মেয়াদে স্থান নির্দিষ্ট করে তাদের ধীরে ধীরে ফুটপাত থেকে স্থানান্তর করা যেতে পারে। কিন্তু এই পথে সিটি কর্পোরেশন হাটতে চাচ্ছে না। হকারদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং সে আন্দোলনে সমাজের অন্যান্য অংশের সংহতি হতে পারে প্রকৃত অর্থে সুন্দর, বাসযোগ্য এবং সকলের জন্য ঢাকা।
বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন দীর্ঘ বছর যাবত তাদের ১০ দফা বাস্তবায়নের জন্য নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করছে। আজও এই প্রতিকুল পরিস্থিতির মধ্যেও আমরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করছি এবং দাবী আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথে থাকবো। সংবাদ সম্মেলন থেকে যেসব কর্মসূচি ঘোষণা করেন ২৩-২৮ জানুয়ারি স্থানীয় সাংসদ, রাজনৈতিক দল, আইনজীবীদের সাথে মতবিনিয়, ২৯ জানুয়ারি বিক্ষোভ মিছিল, ৩০ জানুয়ারি এফবিসিসিআই এর সামনে অবস্থান,০২ ফেব্রুয়ারি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি,০৯ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি, ১৪ ফেব্রুয়ারি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি, ১৯ ফেব্রুয়ারি কী অপ্রতীনশন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে প্রতীকি অনশন, ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি ও প্রতিদিন সকাল ১১টায় রাজপথে মিছিল।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সংগঠনের আহ্বায়ক আব্দুল হাশেম কবির, শফিকুর রহমান বাবুল, আলী আহম্মদ, হযরত আলী, আজিজুল ইসলাম, দুলাল মিয়া, মঞ্জুর মঈন, শহীদ গোলাপ, আনোয়ার হোসেন প্রমুখ।