পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জনসমাবেশ

109

চট্রগ্রাম অফিসঃ শুক্রবার পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাংগামাটির জিমনেসিয়ামে ছাত্র জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে সংগঠনটি।
সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা। বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ মহিউদ্দীন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি উষাতন তালুকদার এমপি, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শিশির চাক্মা, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা ও রোয়াংছড়ি উপজেলার চেয়ারম্যান ক্যবামং মারমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য উদয়ন ত্রিপুরা, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি শিমুল কান্তি বৈষ্ণব, হিল উইমেন্স ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক রিমিতা চাক্মা। উক্ত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বাচ্চু চাকমা এবং পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক জুয়েল চাকমা।
সমাবেশে প্রধান অতিথি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা বলেন, শাসকগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি উপনিবেশ হিসেবে শাসন করছে। যারা উপনিবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছে তারাই আজ পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপনিবেশে পরিণত করেছে। নানা কায়দায় পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসন বলবৎ রাখা হয়েছে। বিশেষ পন্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসলামিক সম্প্রসারণবাদ প্রতিষ্ঠা করে চলেছে। আমলা বাহিনী, সেনাবাহিনী, সেটেলারবাহিনী তথা জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো এই ইসলামিক সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় রয়েছে। রোহিঙ্গা মুসলিমসহ সমতল জেলা থেকে ছিন্নমূল মানুষদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অনুপ্রবেশ করানো হচ্ছে। প্রগতিশীল রাজনৈতিকদল ছাড়া অন্য সকল রাজনৈতিক দল জুম্ম জনগণের বিরুদ্ধে দ-ায়মান। পাহাড়ী হোক বা বাঙালি হোক যারা আমলাতন্ত্রের সাথে যুক্ত, শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত, তারা সকলেই জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব ধ্বংসে সক্রিয় রয়েছে। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান-সদস্যরা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে নিরন্তর ষড়যন্ত্র করে চলেছে।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে এ এলাকার সত্যিকারের যারা বাসিন্দা তাদের অস্তিত্ব বিলুপ্তি দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। সরকার যদি মনে করে যে চুক্তি ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত করা হয়েছে তা বাস্তবায়ন না করলেও চলবে, তাহলে তারা ভুল করবে। তারা যদি ভাবে তাদের কাছে হাজারো মারণাস্ত্র আছে এ অস্ত্র দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের আন্দোলন বন্ধ করা হবে। চুক্তিকে বিলুপ্তি করা হবে তা ভাবলে ভুল হবে। পাহাড়ের মানুষ শাসকগোষ্ঠীর হাজারো মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ সরকার ও শাসকগোষ্ঠীর হাজার হাজার মারণাস্ত্র ভয় করে না। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন ও আত্মনিয়ন্ত্রাধিকার আদায়ে এসব মরণাস্ত্রকে উপেক্ষা করে লড়াই করবে পাহাড়ের মানুষ। পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে অনেকে মনে করতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের অচলাবস্থা দূরীভূত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেটা সঠিক নয়।
অতি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বান্দরবান জেলার ইউনিয়ন নির্বাচনের একটি নকল ব্যালট পেপার দেখিয়ে অভিযোগ করে বলেন “বান্দরবানে সেনাবাহিনী ও বীর বাহাদুরের প্রত্যক্ষ মদদে নকল ব্যালট পেপার ছাপিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জাল ভোট প্রদান করে যার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা জয়লাভ করে। বান্দরবানের প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা বাহিনীর যোগসাজসে বান্দরবানে আওয়ামীলীগ ভোট জোচ্ছুরি করে। তিনি আরো বলেন, ‘আগামী ৪ জুন রাঙ্গামাটিতে ৬ষ্ঠ ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। রাঙ্গামাটির ইউপি নির্বাচনকে নিয়েও শাসকগোষ্ঠী ষড়যন্ত্রে মেঠে উঠেছে। বিলাইছড়িতে জনসংহতি সমিতির থানা কমিটির সহসভাপতি রাহুল চাকমা তাঁর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করলে সেনাবাহিনী তাঁকে বিনা কারণে ১২ ঘন্টার অধিক আটকে রাখে। সেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাংগামাটিতে সফর করতে আসছেন। কিন্তু কেন আসছে আমরা জানিনা। আমরা শংকিত; তারা হয়ত আরো নতুন কৌশলে নির্বাচন কারচুপি করার ষড়যন্ত্র করতে পারে। তিনি বলেন, বান্দরবানের মতো ভোট জোচ্ছুরি, খাগড়াছড়ির বেলছড়ির মতো ৩,০০০ ভোটার স্থলে ৬,০০০ এর অধিক ভোট প্রদানের মাধ্যমে ভোট ডাকাতির নির্বাচন রাঙ্গামাটি পার্বত্যবাসী গ্রহণ করবে না।
সমাবেশে শ্রী লারমা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘শাসকগোষ্ঠীর শোষণের নানা হাতিয়ার থাকতে পারে কিন্তু জুম্ম জনগণ তাদের অধিকার রক্ষার জন্য সেসব বাধা উপেক্ষা করে আন্দোলন ঝাঁপিয়ে পড়বে।’ পরিশেষে তিনি জুম্ম ছাত্রদেরকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, ছাত্র-যুব সমাজকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা বুঝতে হবে। ছাত্র-সমাজ সমাজের সবকিছু থেকে এগিয়ে রয়েছে, তারাই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখবে। চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব সবচেয়ে ছাত্র সমাজের বেশী’ বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, যাদের দেশপ্রেম আছে যাদের বিপ্লবী চেতনা আছে তারা জীবনে একবার মরে। আর যারা ভীরু তারা দুই, তিন, পাঁচ বার মরে। তাই আত্মবলিদানে ভীত না হয়ে ছাত্র সমাজকে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
জনসংহতি সমিতির সহ সভাপতি উষাতন তালুকদার বলেন, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ হচ্ছে আন্দোলনের গৌরবোজ্জল অধ্যায়। জুম্ম ছাত্র সমাজকে বৈপ্লবিক চেতনায় এগিয়ে আসতে হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মইনউদ্দিন বলেন, পার্বত্য চুক্তিকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। এটি পাহাড়ের মানুষের সঙ্গে সরকার এক ধরণের প্রতারণা করছে। পাহাড়ের আদিবাসীদের উপজাতি, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী বলে পাহাড়ের মানুষদের অপমান করা হচ্ছে।
শিশির চাকমা বলেন, পিসিপি হচ্ছে জুম্মদের নেতৃত্বের সুতিকাগার। তাই জুম্মদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জুম্ম ছাত্রসমাজকে নেতৃত্বশীল ভূমিকা জোরদার করতে হবে।
জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য উদয়ন ত্রিপুরা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘাত সৃষ্টি করে দিয়ে পাহাড়ের আদিবাসীদের আন্দোলনকে বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অতীতের সব ভুল বুঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
সমাবেশে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক উবাসিং মারমা। তিনি বলেন, ‘সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা বাস্তবায়ন করেছে বলে দেশে বিদেশে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন না করে নিরাপত্তার নামে অস্থায়ী সেনাক্যাম্প সম্প্রসারন করে নিপিড়ন চালিয়ে যাচ্ছে; বিজ্ঞান ও প্রাযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের নামে ভূমি বেদখল করছে।’
সমাবেশ শেষে এক বর্ণাঢ্য র‌্যালী শহরের বনরূপা পেট্রোল পাম্প প্রদক্ষিণ করে আবার জিমনেসিয়াম প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আজ শনিবার সংগঠনের কাউন্সিল চলছে।