পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ বড় কারাগারে পরিণত হয়েছে–সন্তু লারমা

স্টাফ রিপোটার: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই যুগ পূর্তি আজ। এ উপলক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের যৌথআয়োজনে রাজধানী ঢাকার আগাওগাওঁস্থ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশআদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং এর সঞ্চালনায় আয়োজনের শুরুতে সংহতি বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়িছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নিপন ত্রিপুরা। এছাড়া স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্যমেইনথিন প্রমিলা। অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চুক্তি’র অন্যতম স্বাক্ষরকারী, পার্বত্যচট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)। এছাড়াঅনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, বাংলাদেশের ওয়াকার্স পার্টিরসভাপতি ও সাংসদ রাশেদ খান মেনন এমপি, পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের কো-চেয়ার এডভোকেট সুলতানা কামাল, ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকাহালিম, কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান, বিশিষ্ট আইনজীবি ব্যারিষ্টার সারা হোসেন ও বাংলাদেশ হিন্দু, বোৗদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজল দেবনাথ প্রমুখ।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক অবস্থা ভালো নয় জানিয়ে জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা বলেন, অনেক জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু আজ ২৪ বছর পর চুক্তি বাস্তবায়নের অবস্থা অনেক হতাশাব্যঞ্জক। গত ২৪ বছরে যেসরকারের আমলে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে সে সরকারই অধিকাংশ সময় ক্ষমতায় আছে আজ অবধি। কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াএকেবারেই থেমে আছে। পার্বত্য সমস্যা একটি রাজনৈতিক ও জাতীয় সমস্যা। যেহেতু এটি একটি রাজনৈতিক সমস্যা সেহেতু এটিরাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। তার জন্যই চুক্তি করা হয়েছিল।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য সমস্যাকে চিহ্নিত করা হয়ে থাকলেও চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় তা সমাধান হতে পারেনি। আজ প্রশ্নকরতে হচ্ছে, সরকার কেন চুক্তি করেছিল? পার্বত্য সমস্যাকে সমাধানের জন্য নাকি, জুম্ম জনগণের অস্তিত্বকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়াকেত্বরান্বিত করার জন্য? পার্বত্য জনগণ তাদের ভূমির অধিকার, জাতীয় ও জন্মভূমির অস্তিত্বকে সুরক্ষার জন্যই আন্দোলনে নামতে বাধ্যহয়েছিল। পাহাড়ের মানুষের জন্য কোনো অসৎ উদ্দেশ্য থাকতো তাহলে পাহাড়ের জুম্ম জনগণ সরকারের সাথে আলোচনায় আসতোনা বলেও দাবী করেন তিনি।

আজকে পার্বত্য অঞ্চলে জুম্ম জনগণকে যেভাবে শোষন, বঞ্চনা ও নিপীড়ন করা হচ্ছে তা বলার ভাষা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ বড় ধরনের কারাগারে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে আজ দু’টি পক্ষ। একটি পক্ষ যারা পাহাড়ের নিরীহ মানুষযারা চুক্তির বাস্তবায়ন চায়। আর আরেকটি পক্ষ সরকার এবং তার সাথে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষ। সেখানে সরকারের সামরিক, আধা-সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব ও দমন-পীড়ন তো আছেই। সেই কর্তৃত্ব ও দমন-পীড়ন বর্ণনাাতীত বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি আজ চুক্তির বাস্তবায়ন চায় দাবি করে তিনি আরো বলেন, জনসংহতি সমিতি চুক্তির আলোকে যেআইনগুলো প্রণীত হয়েছে সেগুলোর বাস্তবায়ন চায়। কিন্তু সরকার আজ জনসংহতি সমিতিকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহ্নিত করে বিভিন্নস্তরে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাকর্মীদের নানাভাবে দমন-পীড়ন করছে। অনেক নেতাকর্মীকে আজ মামলা দিয়ে, গ্রেফতার করে, হামলা চালিয়েনিপীড়ন চালানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। দমন-পীড়নের এসব খবর আজ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমে এসবখবর প্রচার করতে পারে না বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

বহিরাগত যে গরীব বাঙালিদেরকে জিয়াউর রহমান পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়ে বসতি প্রদান করেছিল তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এখনোচলমান। তারা আজ পাহাড়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাবেদার গোষ্ঠী সৃষ্টি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্তকরা হচ্ছে। ইউপিডিএফ, জেএসএস (এমএন লারমা) সংস্কারপন্থী, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), মগ পার্টিসহ পার্বত্য চুক্তি বিরোধী ওমৌলবাদী জঙ্গীগোষ্ঠীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে সংঘাত, হানাহানি, খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ইত্যাদি সন্ত্রাসী তৎপরতা চালিয়েপার্বত্য চট্টগ্রামে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে।