পাকিস্তানে হামলা চালাতে মোদীর ওপর চাপ বাড়ছে

যুগবার্তা ডেস্কঃ ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের উরি সেনা ঘাঁটিতে জঙ্গি হামলার পর পাকিস্তানে হামলা চালাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ওপর চাপ বাড়ছে। ভারত কিভাবে হামলার সমুচিত জবাব দেবে তা ঠিক করার জন্য দিল্লিতে সিনিয়র মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। ভারত তার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, পাকিস্তান ভিত্তিক জয়েশ-এ-মুহম্মদ নামে একটি জঙ্গি গ্রুপ এই হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তাদের দেশে কোন ধরনের হামলা হলে তার সমুচিত জবাব দেওয়া হবে। বিবিসিসহ ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন গণমাধ্যম এসব তথ্য জানিয়েছে।

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং তার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানকেও একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বলে আখ্যায়িত করেন – যদিও পাকিস্তান এ ঘটনায় জড়িত থাকার কথা জোরালো ভাবে অস্বীকার করেছে। ভারত ধরেই নিচ্ছে উরিতে রবিবারের হামলার পেছনে পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিলো। পাকিস্তানকে একটা সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য ভারতের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও ভারত সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী মোদীর সবচেয়ে কড়া মন্তব্যটি এরকম – ভারতীয়দের আমি আশ্বস্ত করছি, এই ঘৃণ্য হামলার জন্য দায়ীদের শাস্তি পেতে হবে। আমাদের নয়াদিল্লি প্রতিনিধি জানান, রবিবারের হামলার সম্ভাব্য জবাব কি হতে পারে – তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী গতকাল সোমবার তার মন্ত্রীসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, সেনাপ্রধান এবং তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, সব আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার লক্ষ্যে সর্বশক্তি প্রয়োগ করুক ভারত।

গত দু’মাসেরও বেশি সময় ধরে উত্তপ্ত কাশ্মির। উপত্যকায় অশান্তি ছড়ানোর নেপথ্যে পাকিস্তানের হাত রয়েছে বলে অনেকদিন ধরেই দাবি করছে ভারত সরকার। তা নিয়ে দু’দেশের বাগ্?যুদ্ধও বার বার চরমে পৌঁছেছে। কিন্তু রবিবার ভোরে উরি সেনা ছাউনিতে জঙ্গি হানার পর সন্ত্রাস এবং তার মদতদাতাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে আর বাগ্?যুদ্ধে সীমাবদ্ধ রাখতে রাজি নয় নয়াদিল্লি। বড় ধরনের পদক্ষেপের কথা ভাবতে শুরু করেছে ভারত সরকার। সেই লক্ষ্যে সোমবার সকাল থেকেই নর্থ ব্লক, সাউথ ব্লক ছিল সরগরম। সকাল ১০টায় উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক ডাকেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মনোহর পারিকর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, আইবি’র নির্দেশক, গোয়েন্দা সংস্থা র-এর প্রধান, স্বরাষ্ট্র সচিব, প্রতিরক্ষা সচিব, বিএসএফের ডিজি, সিআরপিএফের ডিজি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আরো বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্র সচিবকে শ্রীনগর যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেখানে গিয়ে নিরাপত্তার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখবেন স্বরাষ্ট্র সচিব।

রাজনাথের বৈঠকের পর শুরু হয় প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক। রবিবারই উপত্যকার পরিস্থিতি দেখে আসা প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর এবং সেনাপ্রধান দলবির সিংহ সুহাগ সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ এবং অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিও। পারিকর ও সুহাগ প্রধানমন্ত্রীকে কাশ্মিরের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন। তারপর পরিস্থিতির মোকাবিলার কৌশল নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হয়। সাউথ ব্লক সূত্রের খবর, পাকিস্তানের সঙ্গে প্রায় সব সহযোগিতা বন্ধ করে দেওয়ার নীতিতে সম্মতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘসহ সবকয়টি আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরো জোর দিয়ে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরা হোক, এমনই নির্দেশ দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী মোদী গতকালের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নীতিতে সম্মতি দিলেও তার আগে থেকেই কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই লক্ষ্যে কাজ করতে শুরু করেছে। ভেনিজুয়েলার মার্গারিটা আইল্যান্ডসে ন্যাম-এর সম্মেলন আয়োজিত হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর জানিয়েছেন, ন্যাম-এর মঞ্চে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র হিসেবেই তুলে ধরছে ভারত। আকবর বলেছেন, ‘পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের যে জঘন্য ব্যবহার করছে, আমরা লিখিতভাবে কঠোরতম ভাষায় তার প্রতিবাদ করছি।’ শুধু ন্যাম নয়, জাতিসংঘের সাধারণ সভায়ও বিষয়টি তুলতে চলেছে ভারত। পাকিস্তান কাশ্মিরে অশান্তির প্রসঙ্গ টেনে সেখানে গণভোটের দাবি নিয়ে জাতিসংঘ সরব হবে বলে স্থির করেছিল। কিন্তু তার মধ্যেই উরিতে জঘন্য হামলা পাকিস্তানের অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে। এই হামলার নেপথ্যে পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে বলে ভারত ইতিমধ্যেই দাবি করেছে। সেই দাবির সপক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ তুলে ধরে জাতিসংঘেও পাকিস্তানকে আরও একবার সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করে দেওয়া হবে, বলছে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়। জাতিসংঘের সাধারণ সভায় পাকিস্তানের তীব্র নিন্দা করে ভারত তাদের একঘরে করার ডাক দিতে চলেছে বলেও জানা গেছে।

বিবিসির নিরাপত্তা বিশ্লেষক রাহুল বেদি লিখছেন, ভারতের নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে জড়িতদের একটি অংশ বিশ্বাস করেন, পাকিস্তানকে একটি শিক্ষা দেওয়া, বার্তা দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। তারা মনে করেন, পাকিস্তানের হাতে পারমাণবিক বোমা থাকলেও স্বল্প মাত্রার ঝটিকা একটি সামরিক অভিযান সম্ভব। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা লে জে বিজয় কাপুর বলেছেন, পাকিস্তানকে এখনই দেখাতে হবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্ষমতা কতোটা। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালও এই মতবাদের পক্ষে। কিন্তু রাহুল বেদি বলছেন, সেরকম অভিযানের পেছনে ঝুঁকি যে কতো মারাত্মক হতে পারে, তা নিয়ে হয়তো এই তত্বের সমর্থকরা অতোটা ভাবেন না। তাছাড়াও, রবিবারের হামলার পর ২৪ ঘণ্টারও বেশি পার হয়ে গেছে। ফলে সে ধরনের ঝটিকা সামরিক অভিযানের সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে গেছে। তবে সরকারের ঘনিষ্ট শিব সেনাও হামলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদীর শাসনামলকে নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি। তারা বলছে, এর চেয়ে তো কংগ্রেস আমলই অনেক ভাল ছিল।

আমেরিকা এবং অন্যান্য বিশ্ব শক্তি ইতিমধ্যেই এবিষয়ে কথা বলতে শুরু করে দিয়েছে। বিশ্লেষক রাহুল বেদি বলছেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর বর্তমান কম্যান্ডের একাংশ মনে করেন, সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে পাকিস্তানের ভেতরে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আস্তানায় স্পেশাল ফোর্স দিয়ে হামলা করা সম্ভব। সমপ্রতি মিয়ানমারের ভেতরে নাগা বিদ্রোহীদের দুটো আস্তানায় সেরকম অভিযান চালানো হয়েছে। পাকিস্তানকে রোববারের হামলার জন্য দোষারোপ করে তাদের শিক্ষা দেওয়ার উপায় নিয়ে যখন ভারতীয়রা যখন ব্যতিব্যস্ত, পাকিস্তান তখন ক্রমাগত বলছে রবিবারের হামলার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কই নেই। পাকিস্তানের একজন সরকারি মুখপাত্র বলেছেন, কিছু হলেই প্রথা মাফিক দোষারোপ না করে ভারতের উচিত্ হামলার তদন্ত করা।

হুঁশিয়ারি পাকিস্তানের

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফ হুঁশিয়ারি করেছেন, পাকিস্তান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যে কোনো ধরনের হুমকি কিংবা হামলার মোকাবিলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। গতকাল করপস কমান্ডারদের বৈঠকে তিনি এই কথা বলেন বলে ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেসনস (আইএসপিআর) এর বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী এই অঞ্চলে সামগ্রিক পরিস্থিতি কঠোরভাবে নজরদারি করছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য তা হুমকি কিনা তাও পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি সেনাবাহিনীর সামগ্রিক প্রস্তুতিতে সন্তুষ্ট বলেও জানিয়েছেন। – ইত্তেফাক