পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ করা মমতার স্ট্যান্টবাজি

যুগবার্তা ডেস্কঃ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নাম পরিবর্তন করে বাংলা করার যে সিদ্ধান্ত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভা নিয়েছে তার সমালোচনা করে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকর্মীদের মঞ্চ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগের বিরোধিতা করে তারা একটি কমিটি গঠন করছেন।
সেই কমিটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি প্রতিবাদলিপি পাঠাবে। নাম বদলের এই সিদ্ধান্তকে ‘অদূরদর্শী’ আখ্যা দিয়ে একে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতার ‘রাজনৈতিক স্টান্টবাজি’ বলছেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক নেতা-কর্মীরা।
পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রিসভার রাজ্যের নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তের প্রতি মঙ্গলবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে সভা করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট।
মমতা সরকারের এই ‘বিবেচনাহীন সিদ্ধান্ত’ বাঙালি জাতীয়তাবোধ, বাংলা ভাষা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে নানাভাবে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ করবে বলে মন্তব্য করেন সাংস্কৃতিক জোট নেতারা।
জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, “খোদ পশ্চিমবঙ্গেই বাংলা ভাষা ও বাঙালিরা বিপর্যস্ত, সেখানে বাংলা সংস্কৃতি বিকাশে কোনো উদ্যোগ নাই। আগে তো নিজের রাজ্যে বাংলা সংস্কৃতিকে লালন ও বিকাশ করতে হবে। তার আগে নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তকে বলব- একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।”
মমতা সরকারের প্রতি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য আহ্বান জানিয়ে নাট্যব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, “বঙ্গবন্ধুর ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিটি আমাদের রাজনৈতিক জীবনের নিয়ামক শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে, স্বাধিকার আন্দোলনে মুক্তির স্বপ্ন দেখায়। এই বাংলা শব্দটির সঙ্গে আমাদের গৌরবগাঁথা ও মৃত্যুর মিছিল জড়িত। পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন হলে এই বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য নিয়ে কোনো ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে বলে আমরা উদ্বিগ্ন। পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি তাই পুনর্বিবেচনা করা উচিত।”
জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মুহাম্মদ সামাদ ‘বাংলাদেশ ও জয় বাংলা: পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলে অদূরদর্শীতা’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। পশ্চিমবঙ্গের নাম পশ্চিমবাংলা হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সেই রণধ্বনি জয় বাংলার মর্মার্থ কী হবে? পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকারের অদূরর্শিতার কারণে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সম্মান ও মর্যাদা কোথায় দাঁড়াবে?,” প্রশ্ন রাখেন তিনি।
দুই দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আলোচনা করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখার স্বার্থে ‘রণধ্বনি জয় বাংলা’ অক্ষুণ্ন ও অখণ্ডিত রাখার উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক।
পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ-সংস্কৃতিকর্মী ও সমাজকর্মীদের আরও আগেই প্রতিবাদ করা উচিত ছিল বলে মনে করেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।
সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক হারুন হাবীব বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই অদ্ভূত বিবেচনাহীন কাজটি করবে বলে মনে হয় না।”
এশিয়াটিক সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক একেএম গোলাম রব্বানী বলেন, “পৃথিবীর সব রাষ্ট্রই জাতি রাষ্ট্র নয়। এই দেশ কারো কর্তৃত্বে সৃষ্টি হয়নি। জয় বাংলা স্লোগানে উজ্জীবিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং পশ্চিমবঙ্গের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে নিন্দা প্রস্তাব আনা উচিত।’
প্রসঙ্গত, সাতচল্লিশে দেশভাগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষী জনগোষ্ঠীর একাংশের ঠিকানা হয় ভারত, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে। অন্যদিকে পাকিস্তান অংশে থাকা পূর্ববঙ্গের মানুষ বাঙালি জাতীয়তাবাদে উজ্জীবিত হয়ে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পায় বাংলাদেশ।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের একটি প্রস্তাব মমতা নেতৃত্বাধীন রাজ্য মন্ত্রিসভায় পাস হয়। রাজ্য সরকার নতুন নাম হিসেবে বাংলা ভাষায় ‘বাংলা’ বা ‘বঙ্গ’ এবং ইংরেজিতে ‘বেঙ্গল’ চাইছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে- ভারতের আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের বৈঠকে ইংরেজি বর্ণমালার ক্রমানুযায়ী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের বক্তব্যের জন্য ডাকা হয়। ফলে পশ্চিমবঙ্গের নেতাদের ডাক আসে একদম শেষে। আর এতে করে দাবি-দাওয়া উত্থাপনে পশ্চিমবঙ্গ পিছিয়ে থাকছে বলে নাম পরিবর্তনের এই উদ্যোগ বলে গণমাধ্যমের খবর।
পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব রাজ্যের বিধান সভায় পাসের পর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সম্মতির প্রয়োজন রয়েছে। মমতার আগে ক্ষমতাসীন সিপিএম সরকারও রাজ্যের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব এনেছিল, তবে তা নাকচ করে দেয় কেন্দ্রীয় সরকার।