পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খায় বিমান

যুগবার্তা ডেস্কঃ দুই বছর ধরে লাভ করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস! এ মুনাফা ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩২৪ কোটি এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২৭৬ কোটি টাকা। রাষ্ট্রীয় যে সংস্থাটি ঋণগ্রস্ত, বকেয়া পরিশোধের জন্য যাদের পিছু পিছু ঘুরছে পাওনাদাররা, তাদের এমন দাবি! তাই রীতিমতো নড়েচড়ে বসেছিলেন বিমান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তার পরই ধরা পড়ে বিমানের দাবির অসারতা। আসলে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ‘অপারেশনাল প্রফিট’কে সামনে এনে তারা প্রাতিষ্ঠানিক আয় হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেছে। উদ্দেশ্য ছিল সরকারকে জিম্মাদার বানিয়ে আবারও ঋণে বিমান ক্রয়। বিমানের বড় পাওনাদারদের মধ্যে আছে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক, পদ্মা অয়েল ও সিএএবি (সাবেক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ)।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিনটি ডিসি-১০ কেনার জন্য আটটি বিদেশি ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের লন্ডন শাখা বিমানকে প্রায় ৬৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেয় ১৯৮৪ সালে। ঋণের গ্যারান্টার হয় বাংলাদেশ সরকার। বিমান ১৯৮৭ সালের জুলাই পর্যন্ত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করলেও ওই বছরের আগস্ট মাস থেকে আর কিস্তি দেয়নি। ১৫ কিস্তির মধ্যে ১২টিই বিমান শোধ করেনি আর্থিক সংকটের অজুহাত দেখিয়ে। বিদেশি ব্যাংকের ঋণ। তাই বাংলাদেশ সরকার অনুরোধ করে বাংলাদেশ ব্যাংককে, তারা সরকারের হয়ে ঋণের অবশিষ্ট টাকা পরিশোধ করে। বিমান এই অর্থ অদ্যাবধি শোধ করেনি। বিমানের সুবিধার্থে সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা করেই রি-পেমেন্ট শিডিউল তৈরি করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিমানের মুনাফার টাকা থেকে তা আদায় করার কঠিন শর্ত জুড়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্বিকার বিমান। বিষয়টি প্রতি আর্থিক বছরেই নিরীক্ষিত হচ্ছে এবং বিমানের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে সরকারি ঋণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

গত মার্চ মাসে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এ এম মোসাদ্দিক আহমেদ ডিসি-১০ কেনার ঋণ হিসেবে সরকারের পাওনা বাবদ ৪১২ কোটি টাকা ইকুইটি খাতে স্থানান্তরের অনুরোধ করেন। ইকুইটি খাতে স্থানান্তরের অর্থ হচ্ছে এর দায় সরকার কাঁধে নিল। ইকুইটি খাতে স্থানান্তর করতে পারলেই এটা আর বিমানের কোনো দায় নয়।

১৯৮৭ সালের এ ঘটনা সম্প্রতি কিভাবে আলোচনায় এসেছে জানতে চাইলে বিমানের একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, বিমান আরো চারটি বোয়িং বিমান কেনার জন্য কিছুদিন ধরে গ্যারান্টার খুঁজছে। অন্যান্যবারের মতো এবারও তারা সরকারকে জিম্মাদার হতে বলেছে। যে চিঠিতে সরকারকে জিম্মাদার হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেখানেই বিমান বলেছে, অতীতে তারা কোনো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি। এ চিঠি পাওয়ার পরই অর্থ মন্ত্রণালয়ের সন্দেহ হয় এবং অতীতের সব ফাইল পর্যালোচনা করে। এরই একপর্যায়ে তারা দেখতে পায় ঋণ পরিশোধে বিমানের ব্যর্থতার দীর্ঘ কাহিনি।

২০০৭ সালে বিমানকে করপোরেশন থেকে কম্পানি করার সময় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার দায় সরকার কাঁধে নিয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা অয়েল কম্পানির টাকার সঙ্গে বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিএএবি) পাওনাও রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ টাকার দায় সরকার কাঁধে নিয়েছিল বিমানকে ঋণমুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নতুন করে যাত্রা শুরু করানোর জন্য। ২০০৭ সালে কম্পানি হিসেবে বিমান নতুন করে যাত্র শুরু করলেও ১০ বছর পর তাদের সেই সমস্যার অবর্তেই দেখা যাচ্ছে।

বিমানকর্মীদের স্বেচ্ছা অবসরে পাঠানোর জন্য ২০০৭ সালে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ২৯০ কোটি টাকা ঋণ নেয়। এক হাজার ৮৭৭ জন কর্মীকে স্বেচ্ছা অবসরে পাঠিয়ে তাঁদের পেনশন ও গ্র্যাচুইটির টাকা পরিশোধের জন্য এ ঋণ নেওয়া হয়েছিল। ঋণের ২৯০ কোটা টাকা বেড়ে ৪১৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত আট বছরে ঋণের অর্ধেক টাকা পরিশোধ করার কথা থাকলেও কানাকড়িও পরিশোধ করা হয়নি। এই টাকা পরিশোধের অক্ষমতার কথা জানিয়ে সরকারি ইকুইটি খাতে স্থানান্তরের আবদার করেছে বিমান।

বিমানের একজন কর্মকর্তা জানান, পেনশন বা গ্র্যাচুইটির জন্য নেওয়া ঋণের টাকা সরকারের কাঁধে চাপানোর বিমানের চেষ্টার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। বিমানের প্রশাসনিক এই মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়ে বলেছে, ১২ দফা শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয় এ ঋণের টাকা ছাড় করেছিল। এর মধ্যে একটি অন্যতম শর্ত ছিল স্বেচ্ছা অবসরে যাঁদের পাঠানো হবে তাদের পদ বিলুপ্ত করে সাংগঠনিক কাঠামো সংশোধন করতে হবে। এই কাঠামো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পেতে হবে। বিমান এ শর্ত মানেনি। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের স্বাক্ষরে পরিবর্তিত একটি সাংগঠনিক কাঠামো বিমান থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও তা সংস্থাটির পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক অনুমোদিত ছিল না। পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামো পাঠানোর জন্য মন্ত্রণালয় বিমানকে আট দফা তাগাদা দিয়েছে। বিমান বিষয়টি আমলে নেয়নি, জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়া তো দূরের কথা। বিমানকে কম্পানি করার সময় এক হাজার ৮৭৭ জন কর্মীকে ভলান্টারি রিটায়ারমেন্ট স্কিমের (ভিআরএস) আওতায় স্বেচ্ছা অবসরে পাঠানো হয়। স্বেচ্ছা অবসর নাম হলেও কার্যত তা ছিল বাধ্যতামূলক অবসর।

এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছেই বিশাল অঙ্কের দেনা রয়েছে বিমানের। ফ্লাইট অপারেশন বাবদ বিমানের কাছে বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএবি) প্রায় এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা পাবে। জ্বালানি খরচ বাবদ পদ্মা অয়েল কম্পানির কাছে দেনা রয়েছে এক হাজার ৯০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ট্যাক্স, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানি এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বিল বাবদ সরকারের কাছে বিমানের দেনা প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বেশি। এ ছাড়া সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কম্পানি থেকে নতুন নতুন এয়ারক্রাফট এনে দিচ্ছে। এখানেও সরকারের কাছে বিশাল অঙ্কের দেনা রয়েছে বিমান। সব দেনা-পাওনা পরিশোধ করলে বড় ধরনের লোকসানে পড়বে বিমান। সব দেনা-পাওনা পরিশোধ করেই লাভের অঙ্ক নির্ধারণ করা উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বিমানের লাভ করা নিয়ে সম্প্রতি সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, বিমান কিভাবে লাভ করছে? জবাবে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিমান অপারেশনাল প্রফিট করছে। সামগ্রিকভাবে লোকসানেই আছে বিমান। সেটা ভিন্ন হিসাব। ’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, একটি ফ্লাইট পরিচালনা খরচের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশই হলো জ্বালানি খরচ। এর বাইরে ফ্লাইট অপারেশন ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংসহ অন্যান্য খরচ মিলে মোট ৫০ শতাংশ খরচ হয়ে যায়। আমার জানা মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিভিল এভিয়েশনের এক হাজার ৪০০ কোটি, পদ্মা অয়েলের জ্বালানি বাবদ এক হাজার কোটি এবং অন্যান্য খাত মিলে বিমানের কয়েক হাজার কোটি টাকার বেশি দেনা রয়েছে। এই দেনা রেখে লাভের ঘোষণা দেয় কিভাবে বিমান? শুধু অপারেশনাল প্রফিট কোনো প্রফিট নয়। টোটাল প্রফিটের কথা না বলে শুধু অপারেশনাল প্রফিটের দোহাই দিয়ে বিমান লাভ করছে—এ ঘোষণা দেওয়া ঠিক নয়। ’-কালেরকন্ঠ