পনেরই আগস্ট:ওঁতপাতা শত্রু থেকে সাবধান

।। এম এইচ নাহিদ ।।

“তুমি আজ যে ভাষণ দিলে, এখন থেকে সাবধান থেকো। আজ থেকে তোমাকে হত্যার জন্য একটি বুলেট তোমার পিছু নিয়েছে।”-১৯৭৩-এ জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে কিউবান বিপ্লবের মহানায়ক কমরেড ফিদেল ক্যাস্ত্রো তাঁর সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছিলেন, ঠিক দু’বছরের মাথায় তাই সত্য হয়। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটে নিভে যায় স্বাধীন বাংলা’র স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন প্রদীপ।

আজ সেই ভয়াল পনেরই আগস্ট। বাঙালির জীবনে এক শোকাবহ দিন। ইতিহাসের এই করুন দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান সহ হত্যা করা হয় তার পরিবারের সদস্যদেরও। বিদেশে থাকার কারণে প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনা। ইতিহাসের এই মহানায়ককে পাকিস্তানিরা শত ষড়যন্ত্র করেও হত্যা করতে পারে নি। অতচ সেই মানুষকে মরতে হলো স্বাধীন বাংলাদেশে বুলেটের আঘাতে। তাও আবার তার সবচেয়ে প্রিয় বাঙালির হাতে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি হিসেবে বিশ্ব দরবারে এ জাতি যেমন গৌরব অর্জন করেছে, তেমনি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি করেছে এক কলঙ্কিত অধ্যায়। মূলত এই হত্যাকাণ্ডের খলনায়কেরা জন্মগতভাবে বাঙালি হলেও চিন্তা-মননে ছিলো পাকিস্তানি। তাই মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত হলেও অন্তরে তারা পাকিস্তানি প্রেমই পোষণ করতো। যেকোনো মূল্যে দেশকে আবার পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নিতে তারা ষড়যন্ত্রের যে জাল বুনতে ছিল, সে পথে এগিয়ে যায় ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট।

প্রশ্ন হলো টার্গেট কেন বঙ্গবন্ধু! তার অপরাধ কি! বঙ্গবন্ধুর অপরাধ, তিনি ছিলেন উদারনৈতিক নেতা। বাঙালির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সীমাহীন আস্থায় তিনি বিশ্বাস করতেন কেউ তাকে মারতে পারে না। তাই তো রাষ্ট্র প্রধান হয়েও তিনি সরকারি বাসভবনে না থেকে থাকতেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের সাধারণ বাড়িতেই। এই দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগায় ’৭৫-এর খুনিরা। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখতেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ হবে অসাম্প্রদায়িক-অর্থনৈতিক বৈষম্যহীন সাম্য ও সমাজতন্ত্রের বাংলাদেশ, আত্মপরিচয় হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ হিসেবে। সে লক্ষ্যেই লড়াই শুরু করেছিলেন। ’৭৩-এ আলজিয়ার্সের জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে স্পষ্ট বলেছিলেন, “পৃথিবী আজ দু’ভাগে বিভক্ত। একভাগে শোষক আর আরেক ভাগে শোষিত শ্রেণি। আমি শোষিতের দলে।” তিনি ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশেরও স্বপ্ন দেখতেন। এসব কারণে পাকিস্তানি ভাবধারায় বিশ্বাসী বেঈমানের দল বঙ্গবন্ধুকে টার্গেট করেছিল। প্রকৃতপক্ষে এ টার্গেট কেবল বঙ্গবন্ধু নয়, খুনিদের টার্গেট ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। ফলে ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের উল্টোযাত্রা।

’৪৭-এ ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হলেও পূর্ববাংলার মানুষ ধর্মের ভিত্তিতে নয়, নিজেদেরকে তুলে ধরেছেন বাঙালি পরিচয়ে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে’ই ’৫২, ’৫৪, ’৬২, ’৬৬ ও ’৬৯ পেরিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের স্বাধীনতা এনেছে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ছিলো বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক মুক্তি, অসাম্প্রদায়িকতা ও সমাজতান্ত্রিক সাম্যের বাংলাদেশ। তার ভিত্তিতেই স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম। সেই রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ’৭২-এর সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র-চার মূলনীতি সন্নিবেশ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়তে বাঙালির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আস্থায় বঙ্গবন্ধু এগিয়ে যেতে থাকেন সবাইকে আপন ভেবে। কিন্তু সেই ভালোবাসার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাঁর কাছের মানুষই। যে মানুষটি বঙ্গবন্ধুর বাবার মৃত্যুর পর তাকে কবরে নামিয়ে ছিল, বঙ্গবন্ধুর মাতার মৃত্যুতে মাটিতে গড়াগড়ি করে কেঁদে ছিল, শেখ কামালের বিয়ের উকিলপিতা ছিল এবং যে মানুষটি ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নিজ হাতে হাঁস রান্না করে খাইয়েছিল-সেই বেঈমান খন্দকার মোশতাক ছিল পনেরই আগস্ট ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের মূল খলনায়ক। তার সাথে ছিল সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্য। তবে এটা নিছক হঠকারিতা নয়, সূদুরপ্রসারী পরিকল্পনা। বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নিয়ে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী রাজনীতির উত্থান ঘটাতেই খুনিরা পথের কাঁটা বঙ্গবন্ধুকে সরাতে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ব্রিটিশ মহাফেজখানা থেকে উদ্ধারকৃত এক গোপন নথি বঙ্গবন্ধুর খুনি সৈয়দ ফারুখ রহমান তার এক চিঠিতে লিখেছে,“ ইসলামী প্রজাতন্ত্র না করে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার কারণেই শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে।”

এই ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল বিদেশি শক্তিও। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পনেরই আগস্টের ভোরের আকাশে উদিত হয় রক্তে রাঙা লাল সূর্য। শুরু হয় ইতিহাসের উল্টোযাত্রা। রাজনীতি ও প্রশাসনে পাকিস্তানি ভাবধারায় বিশ্বাসীদের জয়জয়কার শুরু হয়। হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘন্টার মধ্যে বাংলাদেশ বেতারের নাম পাল্টে হয়ে যায় রেডিও বাংলাদেশ। মেজর ডালিম রেডিওতে ঘোষণা করে ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ। পাকিস্তান সেই রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানকে ধন্যবাদ জানায়। স্বাধীনতার পরে যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় নি, ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর সেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় সৌদি আরব। মুক্তিযুদ্ধের উল্টোযাত্রায় ক্ষমতায় বসে বেইমান মোশতাকের সরকার। মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগান-‘জয় বাংলা’ বাদ দিয়ে পাকিস্তানি সুরে নতুন শ্লোগান আসে ‘ বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত-হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের অপরাধে ১১ হাজার যুদ্ধাপরাধী জেল থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে। আর কারগারে ঢুকতে থাকেন মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রগতিশীল মানুষ। টুপি-সাপারি পড়ে মোশতাক নিজেকে মুজিব কোর্টধারীদের থেকে আলাদা প্রমাণ করার চেষ্টা করে। ধর্মপ্রাণ মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য বঙ্গবন্ধুর ‘ভায়েরা আমার’ বাদ দিয়ে আয়ুবী কায়দায় ‘বিসমিল্লাহ’ বলে বক্তব্য শুরু করেন। কেবল তাই নয়, এই বেইমান ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করে।

মোশতাকের পর সামরিক ছাউনি থেকে আসা দু’জন মেজর জেনারেল তাকেই অনুসরণ আরো এক ধাপ এগিয়ে যায়। ‘বিসমিল্লা’কে সংবিধানে যুক্ত করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালুর জন্য সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নিষেধাজ্ঞা বাদ দেয়।’৭২-এর সংবিধানে ছুরি চালিয়ে মোশতাকের কালো আইনের সাংবিধানিক রক্ষাকবচ করার পাশাপাশি সমাজতন্ত্রকে বাদ দিয়ে ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ হিসেবে সজ্ঞায়িত হয়। ফিরিয়ে আনে যুদ্ধাপরাধী রাজাকার শিরোমণি গোলাম আজমকে। মন্ত্রীসভায় স্থান দেয় রাজাকারদের। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে পাশ করা হয় রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বিল। তার ৯ বছরের লড়াই-সংগ্রামে গণতন্ত্র পুরুদ্ধার করে ক্ষমতায় আসে গণতান্ত্রিক সরকার। কিন্তু তারাও রাজাকারদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেন। ’৯৬-তে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সেই কালো আইন বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার কাজ শুরু করে। কিন্তু সে বিচার শেষ করতে পারে না। আবারো ক্ষমতার পট পরিবর্তন হয়। যুদ্ধাপরাধী স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে ক্ষমতার অংশীদার করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলতে থাকে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদী সন্ত্রাস। শুরু হয় জঙ্গিদের ত্রাসের রাজত্ব। বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্যদিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি ইতিহাসের যে উল্টোযাত্রা শুরু করেছিলো তা চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। একের পর এক হত্যা করা হয় অসাম্প্রদায়িক-প্রগতিশীল ব্যক্তিকে। হামলা করা হয় বিভিন্ন সভা-সমাবেশে। পুরো বাংলাদেশ জুড়ে ওদের দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকে। একুশে আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা, তার আগে ১৭ আগস্ট দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলায় মানুষ আতঙ্কিত হয়ে উঠে। মূলত বঙ্গবন্ধু হত্যা,২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিউনিয়ে গ্রেনেড হামলা-সবই এক সূত্রে গাঁথা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমূলে উৎখাত করে পাকিস্তানি ভাবধারার সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তির উত্থান ঘটানো।

কিন্তু লড়াইয়ে বার বার গর্জে উঠা বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে যেতে আবারো গর্জে ওঠে সংগ্রামের মাধ্যমে ওই অপশক্তিকে পরাজিত করে ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি। এই সময়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারে অনেকের রায় কার্যকর হয়েছে। কেউ কেউ বিদেশে পালিয়ে থাকলেও তাদের সামনের দিনে সেসব দেশে বেঁচে থাকতে হবে মাথা নিচু করে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। ইতোমধ্যে শীর্ষ রাজাকারদের রায় কার্যকর হয়েছে। জঙ্গিবাদ অনেকটাই পরাস্ত। তবে তারা নির্মূল হয় নি। স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি এখনো ওঁত পেতে আছে। সুযোগ পেলেই আবার ছোবল মারবে। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর উল্টোগতিতে চলা বাংলাদেশের যাত্রা বাঙালি ফিরিয়ে এনেছে। এখন তা ধরে রাখার দায়িত্ব ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু যে বৈষম্যহীন সমতাভিত্তিক অর্থনীতির স্বপ্ন দেখতেন সেটাকেও প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব ক্ষমতাসীনদের। উন্নয়নে বাংলাদেশ এগিয়ে, তবে সমতায় অনেক পিছিয়ে। হু হু করে বাড়ছে ধনী-গরিবের বৈষম্য। এখান থেকে ফিরে আসাটা জরুরি। যদি তা মুখ থুবড়ে পড়ে, তবে তার পরিণতি হবে চরম ভয়াবহ। আবার বাড়বে জঙ্গিবাদ ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির তাণ্ডব! তাই সময় থাকতে সাধু সাবধান।

লেখকঃ সাবেক ছাত্রনেতা।