নির্বাচকদের ভুলেই বলির পাঁঠা হচ্ছেন তরুণ ক্রিকেটাররা?

ডেস্ক রিপোর্ট: একের পর এক পরাজয়ে চরম বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। শুরুটা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে, যা বজায় আছে পাকিস্তানের বিপক্ষে চলমান টি-টোয়েন্টি সিরিজেও। এই পর্যন্ত টানা ৭ ম্যাচ হেরেছে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ বাহিনী। কিন্তু পরাজয়ের কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না খোদ অধিনায়কও।

তবে দেশের ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, টাইগারদের এমন অবস্থার পেছনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)-এর পাশাপাশি জাতীয় দলের নির্বাচক ও টিম ম্যানেজমেন্টেরও সমান দায় রয়েছে। কারণ ক্রিকেটার গড়ে তোলার মূল দায়িত্ব কিন্তু তাদেরই। পাইপলাইনে বর্তমানে পর্যাপ্ত পরিমাণে মোধাবী খেলোয়াড় নেই। যার প্রভাব পড়ছে দল নির্বাচনের ক্ষেত্রেও। ফলে ঘুরেফিরে সেই ফর্মে না থাকা ক্রিকেটারদেরই খেলাতে হচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে বলতে গেলে, সবার আগে চলে আসে লিটন দাস ও সৌম্য সরকারের নাম। প্রতিভাবান এই দুই তরুণ ক্রিকেটার এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ৫-৬ বছর খেলে ফেলেছেন। কিন্তু কখনোই নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। এক ম্যাচ ভালো খেলে ফর্মহীন থাকেন পরের টানা বেশ কয়েকটি ম্যাচ। যার প্রভাবে দলকেও বিপদে পরতে হয়। কারণ, তারা দুজনই ওপেনার ও টপ অর্ডার ব্যাটার। ফলে শুরুতেই উইকেট পড়লে এর প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই দলের ওপর পরবে।

চলতি বছর টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে লিটন দাসের ব্যাটিং গড় মাত্র ১০। সৌম্য সরকারেরও কাছাকাছি। তবুও, তাদের দুই জনকে দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবালের বিকল্প হিসেবে বিশ্বকাপে নিয়ে যায় নির্বাচকরা। কারণটা অবশ্যই তাদের থেকেও ভালো খেলোয়াড় বিসিবির পাইপলাইনে নেই! নয়তো দীর্ঘদিন ফর্মে না থাকা সত্ত্বেও কেনই বা স্কোয়াডে অটো চয়েজ হবেন তারা? এমনকি সারা বছর দুর্দান্ত খেলতে থাকা নাঈম শেখকে বিশ্রাম দিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সৌম্য-লিটনকে ওপেনিংয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়। ফল, শুরুতেই দুজনের উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসা, দল চাপে পড়া এবং শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের লজ্জাবরণ। এমতাবস্থায় পরের ম্যাচেই সৌম্যকে বাদ দিয়ে নাঈম শেখকে একাদশে ফেরানো হয়।

লিটন দাস বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ খেললেও নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। উল্টো সুপার টুয়েলভে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রায় জেতা ম্যাচ হারার পেছনেও তার দায় দেখছেন অনেকে। ওই ম্যাচ বাংলাদেশ যখন জয়ের দ্বারপ্রান্তে ঠিক তখনই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ ছেড়ে দেন লিটন। বাংলাদেশের পরাজয়ের পেছনে ওই দুটি ক্যাচ মিস টার্নিং পয়েন্ট ছিল। তখনই দাবি ওঠে, এই ওপেনারকে বিশ্রাম দেওয়া হোক। কিন্তু সমালোচনা সত্ত্বেও টিম ম্যানেজম্যান্ট তাকে প্রতিটি ম্যাচ খেলায়।

ক্রিকেট যতটা না শারীরিক খেলা, তার চেয়েও বেশি মনস্তাত্ত্বিক। একজন খেলোয়াড় যখন টানা অনেক ম্যাচ ফর্মহীন থাকে তখন এমনিতেই তার ওপর চাপ বাড়ে। আর সেটা যদি বিশ্বকাপের মতো মঞ্চ হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই চাপ আরও বেশি থাকবে। ফলে মানসিকভাবে অনেক শক্তিশালী না হলে এই অবস্থায় ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করা অসম্ভব। লিটন যে আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগছিলেন তা বিশ্বকাপ চলাকালীন তার চেহারায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল। তবুও তাকে প্রতিটি ম্যাচ খেলিয়ে যাওয়া টিম ম্যানেজম্যান্টের কতটুকু যৌক্তিক সিদ্ধান্ত ছিল সেটাই বড় প্রশ্ন! ফলস্বরুপ টি-টোয়েন্টি স্কোয়াড থেকে সৌম্য-লিটনকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাদ দেওয়া হয়েছে।

এবার আসি পাকিস্তান সিরিজে। বিশ্বকাপের ব্যর্থ মিশন শেষেই দেশের ক্রিকেট পাড়ায় রব উঠে পরিবর্তনের। বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার যে বাদ পড়তে যাচ্ছেন সেটা বিসিবির কর্তারা শুরু থেকেই বলে আসছিলেন। এবং শেষ পর্যন্ত হয়েছেও তাই। বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে ছয়জন ক্রিকেটারকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের বদলি আরও ছয় জন সুযোগ পেয়েছেন। এর মধ্যে বাদ পড়েছেন অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম, সৌম্য সরকার, লিটন দাস ও পেসার রুবেল হোসেন। আর চোটের কারণে ছিলেন না সাকিব আল হাসান ও সাইফউদ্দিন। তাদের বদলি হিসেবে দলে নেওয়া হয়েছে নাজমুল হোসেন শান্ত, সাইফ হাসান, ইয়াসির আলি রাব্বি, শহীদুল ইসলাম, আমিনুল ইসলাম বিপ্লব ও আকবর আলিকে। কিন্তু এই দল নির্বাচন নিয়েও অনেক প্রশ্ন উঠেছে।

কারণ, সাইফ হাসান মূলত টেস্ট খেলোয়াড়। ঘরোয়া কিংবা বয়সভিত্তিক ক্রিকেট বলুন, সব জায়গায় তার ব্যাটিং স্টাইল একজন পরিপূর্ণ টেস্ট খেলোয়াড় সুলভ। ফলে কখনোই টি-টোয়েন্টি খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে পরিচয় করাতে পারেননি। আর নাজমুল শান্তকে অফফর্মের কারণেই পূর্বে টি-টোয়েন্টি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। অবশ্য এই ফরম্যাটেও তিনি কার্যকরী ব্যাটার এবং সেটা ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলোতে প্রমাণও করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো- মাঝখানে এমন কী পারফরম্যান্স করেছেন যে তাকে দলে নেওয়া হলো? এরপর আসি রুবেল হোসেন প্রসঙ্গে। তার বাদ পড়ার কারণ হিসেবে খোদ নির্বাচকরাই কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। পাকিস্তান সিরিজের দলের সবচেয়ে বড় চমক অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক আকবর আলি। যারা দেশের ক্রিকেটের মোটামুটি খোঁজখবর রাখেন, তারা সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন যে, আকবর কোনোভাবেই টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের ক্রিকেটার নন। আর তাকে এত দ্রুত জাতীয় দলে ডাকারও কোনো কারণ (ঘরোয়া লিগে নজরকাড়া কোনো পারফরম্যান্স) নেই। যদিও প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদিন নান্নু ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, মূলত বিকল্প উইকেটকিপারের ভাবনায় তাকে দলে নেওয়া।

অথচ ক্রিকেট পাড়ায় ডাকঢোল পেটানো হয়েছিল যে, পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে প্রথমবারের মতো ডাক পেতে যাচ্ছেন অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী দলের দুই সদস্য ওপেনার পারভেজ হোসেন ইমন ও টপ অর্ডার ব্যাটার তৌহিদ হৃদয়। তারা দুজনই টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের জন্য নিজেদের যৌগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। কিন্তু দল ঘোষণায় তাদের নাম নেই। পরে জানা গেলো, মূলত ডানহাতি-বাঁহাতি কম্বিনেশনের জন্যই তাদের নেওয়া হয়নি! আর সাইফকে দলে নেওয়ার কারণ এটাই। সাইফ ডানহাতি, অপর ওপেনার নাঈম শেখ বাঁহাতি। অন্যদিকে, পারভেজ হোসেন ইমন বাঁহাতি ব্যাটার। অথচ শেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচের জন্য ঠিকই সাইফকে বাদ দিয়ে ইমনকে ডাকা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, ডানহাতি-বাঁহাতি কম্বিনেশনের এই খোঁড়া যুক্তি আর কতদিন? যদি এই যুক্তিতে ক্রিকেট চলতো তাহলে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক তারকা ওপেনিং জুটি ম্যাথু হেইডেন-অ্যাডাম গিলক্রিষ্ট, কিংবা আমাদের দেশের টেস্ট ক্রিকেটে তামিম ইকবাল-ইমরুল কায়েস এত রেকর্ড করতে পারতেন না। বিশ্ব ক্রিকেটে এমন আরও অসংখ্য বাঁহাতি ওপেনার জুটি রয়েছে, যারা প্রতিপক্ষের বোলারদের ওপর ত্রাস ছড়িয়েছেন।

টিম ম্যানেজম্যান্টের এমন ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এখন যদি সাইফ হাসান তার আত্ববিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন, এই দায় কার? আকবর আলি যে ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবেন না তা নিশ্চিতভাবেই বলাই যায়। আর যদি সুযোগও পান, সেক্ষেত্রে দলের প্রত্যাশা অনুযায়ী খেলতে না পারলে? আবার ইমনকে এক ম্যাচের জন্য হঠাৎ করেই ডাকা হয়েছে। সে যে ভালো খেলতে পারবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ, এক-দুই ম্যাচ দিয়ে কাউকে বিবেচনা করা যায় না। দেখা গেলো তামিম ফিরলে পরবর্তী সিরিজেই আবার তাকে বাদ দেওয়া হলো, তখন?

আরেকটা ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন জমাট বাঁধছে। প্রথম ম্যাচে লেগ স্পিনার আমিনুল ইসলাম বিপ্লবকে দলে নিয়েও তাকে দিয়ে কোনো বল করাননি অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। কারণ হিসেবে জানিয়েছেন, ব্যাটিংয়ে বাঁহাতি ব্যাটার থাকাতেই তাকে আক্রমণে আনা হয়নি। এর আগে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচে প্রথম দুই ওভার দুর্দান্ত বোলিং করা সাকিব আল হাসানকেও পরে আর বল দেওয়া হয়নি। যার কারণ হিসেবে তখন একই যুক্তি দেখিয়েছিলেন অধিনায়ক। তারও আগে বিপ্লবকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিয়ে গিয়েও বিশ্বকাপ শুরুর আগেই দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয় টিম ম্যানেজমেন্ট।-ইত্তেফাক