না এমনি আপনাগো ট্যাকা আমি নিমু ক্যা

244

সুব্রত মণ্ডল:
বিকাল ৩ টার একটু বেশী হবে । জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছুটছে বাসার রুটে বাসে সিট রাখতে। আমিও যাচ্ছিলাম চন্দ্রমুখী বাসে সিট রাখতে। এমন সময় ছোট ভাই রিফাত রাজ আর শাহ আলম ব্যাপারীর সঙ্গে কথা বলতে ১০ টাকার বাদাম কিনলাম । বসলাম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ভাস্কর্য চত্ত্বরেরে উত্তর পূর্ব দিকে । তিন জনেই একটি একটি করে বাদাম খাচ্ছিলাম। এমন সময় ছোট্ট একটি শিশুর কণ্ঠেরে শব্দ ভেসে আসল, ‘এই চা’ ‘চা খাবেন মিয়া ভাইরা’। শিশুর কণ্ঠের আওয়াজটি পশ্চিম দিক থেকে আসছিল।
শাহ আলম আমাকে জিজ্ঞাসা করল ভাই চা খাবেন? আমি চা খেতে গেলে বাস মিস করব এই ভেবে না উত্তর দিলাম। আর আমি এমনিতেই চা কম পান করি। তখন শাহ আলম ওই শিশুটিকে ১০ টাকার একটি নোট দিয়ে বলল ভাই, তুই এ টাকা নিয়ে যা ভাই। তখন শিশুটি বলল, ‘আপনাদের টাকা আম ক্যান নিমু’। শাহা আলম বলল নে ভাই আমরা চা খাই না, তুই এমনি টাকা নিয়ে চলে যা। তখন ওই শিশুটি বলল, না এমনি আপনাগো ট্যাকা আমি নিমু ক্যা। তখন আমার নজর পুরোপুরি শিশুটির উপর। আমি বললাম কেন নিবে না? শিশুটি বলল আমি কাজ করে খাই, ‘‘আমি শুধু শুধু কেন আপনাগো ট্যাকা নিমু।’ তখন রাজ বলল দে আমাদের তিন কাপ চা দে । আমরা চা পান করলাম । শাহ আলম আর যাই হোক শিশুদের প্রতি ওর দরদ একটু বেশীই । তা এর আগেই দেখেছিলাম। এক শিশুকে আশ্রয় দিয়ে কি বিপদেই না পড়ে ছিল ২০১৪ সালে।
হ্যা এমন ঘটনা ঢাকা শহরে অহরহ না ঘটলেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় সোমবার তিনটা পনের মিনিটিরে দিকে এ ঘটনা ঘটেছে । রিয়াজ নামের একটি শিশু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে চা বিক্রির করার সময় এমন ঘটনাই ঘটেছে। এঘটনায় উপস্থিত সবাইকে হতবাক করেছে ।
পরে চা বিক্রেতা শিশুর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তার নাম রিয়াজ । গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণ বাড়িয়ায় । রিয়াজের দুই ভাই এক বোন । তারা সবাই পুরান ঢাকার লক্ষ্মী বাজারের ডাল পট্টি মোরে থাকেন । রিয়াজের মা শাহানার সঙ্গে বোনেরা মেস বাড়িতে রান্না করেন। আর রিয়াজেরর বাবাও চা বিক্রি করেন । রিয়াজ তার পরিবার পরিজন নিয়ে একটি ছোট্ট ঘরে থাকেন। গ্রামের বাড়িতে অভাব অনটন পরে রিয়াজের বাবা পাড়ি জমান ঢাকায়। এসময় রিয়াজের খালা রেহেনা কাছ থেকে রিয়াদের বাবা ১০ হাজার টাকা ধার নেন । রিয়াজের বাবা ধারের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় তাকে দিয়ে চা বিক্রি করাচ্ছেন তার খালা । রিয়াজের সঙ্গে আলাপকালে আরো জানা গেল, রিয়াজ প্রতিদিন সকাল সাড়ে দশটার দিকে চা নিয়ে বের হয় । বিক্রি করে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে । গড়ে টাকা কম আয় হলে রিয়াজের উপর চলে নির্যাতন। এ প্রতিবেদকের মোবাইল ফোন সেট দেখে রিয়াজ বলেন, ‘‘আঙ্কেল দেন একটু গেম খেলি। গেম খেলতে মজা লাগে ।’’ চার্জ নাই বললেও করুণ চাহনীর কারণে এ প্রতিবেদক তার মোবাইল রিয়াজকে দিতে বাধ্য হয় । মোবাইল খেলার সময় রিয়াজের নাম এ প্রতিবেদক লিখতে চাইলে বলে, ‘‘আঙ্কেল দেন আমি আমার নাম লিখে দেই । আমি ক্লাসে ১ম হয়েছিলাম ওয়ানে ভর্তি পরীক্ষায় । রিয়াজ তার নাম লিখে দেয় । রিয়াজের মনের ইচ্ছা কি জানতে চাইলে বলে, ‘‘আঙ্কেল আমার হকল (সব) সময় গেম খেলতে মন চায়।’’ পড়ালেখা করতে চায় কি না এমন প্রশ্নের জবাবে বলে ‘‘হ, কে ট্যাকা দিব পড়ার।আমি পড়লে খালার ট্যাক শোধ দিব কোন জন?’
এমন সময় চার বিল শাহ আলম ৫০ টাকার একটি নোট দিয়ে বলে তোর কত টাকা বিল হয়েছে? উত্তরে রিয়াজ কড় গুণে গুণে বলে ‘‘বিশ ট্যাকা।’’ শাহ আলম বলে ওই নোট বিশ টাকা বলে চালিয়ে দেয় । পাশের একজনকে নোট দেখিয়ে রিয়াজ জানতে পারে এটা পঞ্চাশ টাকা । এসময় বাকী ৩০ টাকা শাহ আলমকে ফিরত দিলে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ হয় ছোট্ট রিয়াজের আচারণে। এক প্রশ্নের জবাবে রাজ বলেন, আঙ্কেল আমার ট্যাকা অনেক দেয় না । আবার অনেকে ট্যাকা না দিয়ে চা খেয়ে কাপটি নিয়ে যায়। রিয়াজের ছয়টি কাপ ছিল, তিনটি কে যেন গতকাল চা খেয়ে বিল ও কাপ আর ফেরত দেয় নি। রিয়াজের এ আচারণে রিয়াজের এমন আচারণে আমিসহ রিফাত রাজ, রাকিবুল ইসলাম , শাহ আলম ও উপস্থিত ছাত্রজনতা হতবাক হয়ে যায় । লেখক: সুব্রত মন্ডল, সাংবাদকি