নারীর সম্ভ্রম যোনিতে নয়

219

ইত্তিলা ইতুঃ
আমাদের সমাজে নারীকে দমিয়ে রাখার প্রধান অস্ত্রটি হলো নারীর ‘চরিত্র’। পুরুষ নাকি চাইলেই পারে নারীর চরিত্র ‘নষ্ট’ করতে। সীমার বাইরে গেলেই নারীকে ‘সম্ভ্রম’ হারানোর ভয় দেখানো হয়। নারীর সম্ভ্রমের অবস্থানটা ঠিক কোথায়? যোনির ভেতরে নাকি?
একমাত্র এই ভয়ের কাছে পরাজিত হয়েই নারী আজও বন্দী পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কাছে। এই ভয়ই নারীকে বাধ্য করছে পুরুষের আধিপত্য মেনে নিতে। ঘরে বাইরে সব জায়গায় যৌনসন্ত্রাসীরা ওঁত পেতে থাকে, নারীর চরিত্র নষ্ট(?) করতে। আর যৌনসন্ত্রাসীদের চরিত্র নষ্ট হয় কিসে শুনি?
‘বেশ্যা’ শব্দটাকে আমরা সাধারণত গালি হিসেবে ব্যবহার করি। আমার ধারণা বেশ্যারা খুব সাহসী হয়। বেশ্যাদের তো এসব ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। বেশ্যারা তথাকথিত ‘সম্ভ্রম’ এর তোয়াক্কা করে না। তাই তারা অন্য যেকোনো নারীর চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন ও সাহসী। বেশ্যাদেরকে পুরুষের সৃষ্ট কথিত চরিত্র রক্ষা করতে হয় না বলে, তারা তাদের জীবনে পুরুষের আধিপত্য মেনে নিতেও বাধ্য নয়।
আর নির্লজ্জ পুরুষজাতটার কথা আর কি বলবো। দিনে যাদের বেশ্যা বলে থুতু ছিটায়, রাতে তাদের খদ্দের হয়ে থুতু চাটতে যায়। বেহায়া হলে কি আর এতোটা বেহায়া হতে হয়!
পুরুষের প্রয়োজনেই নারী বেশ্যা হয়। কিন্তু বেশ্যা হওয়ার পর বেশ্যা নারীর কাছে ওসব চরিত্র-টরিত্র কোনো পাত্তা পায় না। চরিত্রকে তোয়াক্কা না করার নারীর এই সাহসটাকেই পুরুষ ভয় পায়, ঘৃণা করে। তবে ওই সাহসের অংশটুকু বাদ দিলে, বেশ্যা ব্যাপারটা বেশ মজাদার হয়ে ওঠে!
বেশ্যা মানে যদি বহুগামী নারী হয় বহুগামী পুরুষকে তবে কি বলা যায়? পুরুষ নারীকে মাতৃত্ব, সতীত্বের গুণ শোনায়। অথচ সমাজের অধিকাংশ পুরুষই বহুগামী। পুরুষের ক্ষেত্রে বহুগামিতা আবার একটা বিশেষ গুণ। এটা নাকি পুরুষের সক্ষমতাকে বোঝায়! আর নারী বহুগামী হলেই নাকি বেশ্যা!
কিছুদিন আগে কয়েকটি অনলাইন পত্রিকায় নিউজ দেখলাম, ঢাকায় নাকি ধনী ঘরের মেয়েরা বয়ফ্রেন্ড ভাড়া করছে। ধনী মেয়েরা ছেলেদের ভাড়া করছে নিজেদের যৌন চাহিদা মেটাতে। এই খবর কতোটা সত্যি জানি না। হয়তো সত্যি, হয়তো মিথ্যা। এই খবরের শিরোনাম করা হয়েছে ‘কোথায় যাচ্ছে এই সমাজ’। আপনারা আমাকে বলুন তো, ‘কোথায় ছিলো এই সমাজ?’ বেশ্যালয়গুলোর খদ্দের হয় কারা? কারা টিকিয়ে রাখছে পতিতাবৃত্তি? বেশ্যালয় বন্ধের কথা বললে, সমাজে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার অজুহাত দেখানো হয়, ইনিয়ে বিনিয়ে বেশ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। তখন কোথায় যায় এই সমাজ—প্রশ্ন তুলেছেন কি? তখন এই শিরোনাম দানকারীরা কোথায় থাকে?
নাস্তিক হত্যার দায় নেবেন না বলাতে শেখ হাসিনা চারদিকে সমালোচিত হচ্ছেন । আমরা বলছি, তিনি হত্যাকারীদের উৎসাহিত করছেন। কেউ একবার ভেবে দেখছেন, যুগ যুগ ধরে পুরুষ নারীর উপর আধিপত্য বিস্তার করতে নারীকে অত্যাচার করেছে, ধর্ষণ করেছে, এর দায় যে শুধুই পুরুষের, এটা আমরা কয়জন মানি? উল্টো পুরুষকেই বানিয়েছি নারীর রক্ষাকর্তা! পুরুষ নারীর রক্ষক হলে, ভক্ষকটা তবে কে?
আসলে রক্ষক-ভক্ষক সব একইসূত্রে গাঁথা। রক্ষক পুরুষ চায় না নারী স্বাধীনভাবে চলুক, নিজের কথা নিজে বলুক, নিজের দায়িত্ব নিজে নিক। রক্ষক চায় নারী ভয় পাক, ভয়ে গুটিয়ে থাকুক, নিজেকে দুর্বল ভেবে তার কাছে ছুটে যাক নিরাপত্তার জন্য, তার আধিপত্য মেনে নিক। আর রক্ষকের এই চাওয়াগুলো বাস্তবে টিকিয়ে রাখতে কাজ করে যাচ্ছে ভক্ষক পুরুষ।
পুরুষতন্ত্র রক্ষার স্বার্থেই কেউ রক্ষক, কেউবা ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছে। যেদিন নারীর আর রক্ষকের প্রয়োজন হবে না, সেদিন থেকে আর নারীকে পুরুষের আধিপত্য মেনে নিতে হবে না।
নারী জানুক যে, তার নিরাপত্তার জন্য কোনো পুরুষের প্রয়োজন নেই। নারী নিজেই নিজের রক্ষক হয়ে উঠুক। নারী জানুক তার সম্ভ্রম তার যোনিতে নয়, নারীর সম্ভ্রম নারীর কর্মে, জ্ঞানে।
-লেখকঃ ইত্তিলা ইতু: প্রবাসী, ব্লগার