নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ, আত্মরক্ষা ও আত্মনির্ভরতার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে স্কুলের মেয়েরা

90

যুগবার্তা ডেস্কঃ রাজধানীর টিকাটুলিতে শহীদ নবী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছোট্ট মাঠ। মাঠের মধ্যে স্পোর্টিং স্যুট পরা একদল শিক্ষার্থী সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ১৩-১৪ বছরের এক কিশোরী দৌঁড়ে গিয়ে সবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মেয়েটির চৌকস চোখ-মুখই বলে দিচ্ছে ওর আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ়তার কথা। একই আত্মবিশ্বাস দেখতে পেলাম মাঠে দাঁড়ানো প্রতিটি কিশোরীর মুখচ্ছবিতে।

হ্যাঁ, বলতে দ্বিধা নেই, আজ যদি কবি কামিনী রায় এদের দেখতেন তাহলে ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ কবিতার স্থলে লিখতেন নতুন এক কবিতা। ওরা শিখছে আত্মরক্ষার কৌশল (মার্শাল আর্ট/ কারাতে)। বুঝতে শিখেছে ওদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপরাধ-নির্যাতন-যৌন হয়রানি। এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এখন পিছপা হয় না তারা।

স্কুল মাঠেই কথা হয়, তারান্না, সুফিয়া, লিজা, তানিয়াদের সঙ্গে। খুবই স্বতঃস্ফূর্ত আর সাবলীল তাদের প্রকাশভঙ্গি। স্কুল, কোচিংয়ে যাতায়াত, কিংবা নিজেদের ছোটখাট প্রয়োজন অন্যের সাহায্য ছাড়া নির্বিঘ্নেই মেটাতে পারে তারা। কথা হচ্ছিল একই স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসবিহা আলম পৃথিবীর সঙ্গে। জানালো, ইভটিজিংয়ের শিকার বান্ধবীর সহযোগিতায় যখন আশপাশের কেউ এগিয়ে আসেনি, তখন নীরব থাকেনি সে। রুখে দাঁড়িয়েছে বখাটেদের বিরুদ্ধে। এ সময় স্কুলের ক্রীড়া ও শরীরচর্চাবিষয়ক শিক্ষক গোলাম ফারুক পাশ থেকে এগিয়ে এসে বললেন, “পৃথিবী আমাদের ‘অল-রাউন্ডার’ মেয়ে। লেখাপড়া, সংগীত, খেলাধুলা সব বিষয়ে সে সবার সেরা, এমনকি মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের কমান্ডারও এই পৃথিবী।”

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেবল শহীদ নবী উচ্চ বিদ্যালয় নয়, রাজধানীর শহীদ নবী উচ্চ বিদ্যালয়, খিলগাঁও গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়সহ রাজধানী ২০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ‘নিরাপদ স্কুল নিরাপদ সমাজ’ প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলছে। ইউএন ট্রাস্ট ফান্ডের সহযোগিতায় চট্টগ্রাম, নেত্রকোণা ও কুষ্টিয়া জেলাতেও প্রকল্পটি পরিচালনা করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস)। নারীর প্রতি সংহিসতা প্রতিরোধে আত্মরক্ষা ও আত্মনির্ভরতার এ ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের মনিটরিং কর্মকর্তা সাঈদা পারভীন কালের কণ্ঠকে জানান, প্রতিটি স্কুলে ২০ জন মেয়ে শিক্ষার্থীকে কাউন্সিল ও মার্শাল আর্ট/কারাতে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরো জানান, এই প্রকল্পের অধীনে প্রতিবছর একটি সৃজনশীল দিবস পালন করা হয়। সেখানে মেয়েদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করার একটি প্লাটফরম তৈরি করে দেওয়া হয়। সেখানে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, অপহরণ প্রতিরোধে মেয়েদের আত্মবিশ্বাসী হতে সহযোগিতা করা হয়। এখানে তারা নিজেদের নানান সমস্যা সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা বিনিময় করে।

পপুলেশন কাউন্সিলের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৭২ শতাংশ কিশোরী স্বগৃহে অভিভাবক দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। মানসিক নির্যাতনের পরিমাণ যোগ করলে এই সংখ্যা আরো বেড়ে যাবে। প্রায় ৫০ ভাগের বেশি কিশোরীর ১৯ বছর বয়সের আগেই বিয়ে দেওয়ার ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং শিশু ও মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের বাইরে যৌন নিপীড়নের স্বীকার হয় ৭৬ ভাগ কিশোরী। আর নিজের অধিকারের কথা, অপমান, অসম্মান, সাধারণ মারধর এমনকি যৌন নির্যাতনের কথাও মুখ বুজে সহ্য করাকে আজও ভবিতব্য মনে করে এদেশের নারীদের একটি বৃহত্তম অংশ।

দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ২১ শতাংশ কিশোর-কিশোরীর বেশির ভাগই এ সংক্রান্ত আইন ও নীতিমালা সম্পর্কিত তথ্য জানে না। এদের মধ্যে এক কোটি ৩৭ লাখ কিশোরীকে নিজেদের অধিকার, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতা, তাদের ধারণা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ ইত্যাদি সম্পর্কে একেবারেই অন্ধকারে রয়েছে। এসব বিষয়ে কিশোরীদের মধ্যে সচেতনতার আলো ছড়িয়ে নির্যাতন সহিংসতামুক্ত পরিবেশ গড়তে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কমিউনিটির লোকজনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে শহীদ নবী উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক গোলাম ফারুক বলেন, “বর্তমানে জিপিএ ৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বিষয় থেকে শিক্ষার্থীরা নিজেদের গুটিয়ে রাখছে। এতে শিক্ষার্থীদের চলার পথ কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় শিক্ষার পাশাপাশি নিজের আত্মরক্ষার জন্য মার্শাল আর্ট শিখছে শিক্ষার্থীরা। এতে প্রথমে বাধা ছিল। তবে সব বাধা ও ভয়কে জয় করে এখন ওরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে।

স্কুলের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, “কার্যক্রমটি স্কুলের শিক্ষার্থী অভিভাবকসহ সমাজে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। তবে এই প্রকল্পের আওতায় মাত্র ২০ জন শিক্ষার্থী আত্মরক্ষার জন্য মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করতে পেরেছে। সরকারিভাবে প্রতিটি বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর আত্মরক্ষার জন্য মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করলে ভালো হয় বলে মনে করেন তিনি।

বিষয়টি নিয়ে সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলে আলোচনা চলছে বলে জানালেন নারী প্রগতি সংঘের উপপরিচালক শাহানাজ সুমী। তিনি বলেন, “জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে এ ধরনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। যাতে নারীর সমঅধিকারের মূল্যবোধ তৈরির মাধ্যমে নারীর যোগ্যতা, দক্ষতা ও সক্ষমতা বিকাশের উপযোগী একটি নারীবান্ধব সমাজ তৈরি করা যায়। যা পুরো সমাজের অগ্রযাত্রার পথকে আরো সুগম করবে।

এ বিষয়ে কথা হয় খিলগাঁও গভর্নমেন্ট কলোনি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান রিজন ও তাওহিদুল ইসলামের সঙ্গে। তারা জানায়, বাবা-মা কিংবা শিক্ষকরা অনেক কিছুই খোলামেলাভাবে তাদের কাছে বলতে চাইতেন না। এখন সে জড়তা কেটেছে। মেয়েদের দেখলে একটা সময় দুষ্টামি করলেও সেই বদভ্যাস ছাড়তে সক্ষম হয়েছে ওরা। মেয়েদের সম্মান দিতে শিখেছে। ওরা বুঝেছে সম্মান দিয়েই সম্মান অর্জন করা যায়।

রাজধানীর খিলগাঁও গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা জানায়, এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের জীবন সম্পর্কে সচেতন করতে কাউন্সিলর নিয়োগ করা হয়েছে। সেখানে পাঠদানে মেয়ে শিক্ষার্থীদের সামাজিক, পারিবারিক ও না বলা কথাগুলো একে অন্যের মধ্যে শেয়ার করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। এই কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে তারা এখন সচেতন।

ওই কলেজের অধ্যক্ষ রঞ্জন কুমার রায় বলেন, “এ প্রকল্পের মধ্য দিয়ে আমরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি ও তাদেরকে আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলতে পেরেছি। অবিভাবকরাও এখন সচেতন হচ্ছে। এটা অনেক বড় অর্জন।” ভবিষ্যতে কিশোর-কিশোরীদের জন্য একটি সুস্থ সুন্দর সমাজ গঠনে জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা উপসচিব মো. সানাউল হক (আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা) বলেন, “এই প্রকল্পটি কিশোরীদের সচেতন করছে ঠিকই। তবে এটি কেবলমাত্র মেয়েদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ছেয়ে-মেয়ে উভয়কেই সচেতন করতে উদ্যোগ নেওয়া উচিত।” কালেরকন্ঠ