নব্য জেএমবির নতুন ‘ফাঁদ’ আনসার রাজশাহী

73

রাজশাহী অফিসঃ জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) জন্ম রাজশাহী অঞ্চলে। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের সেই জেএমবি এখন পুরনো জেএমবি হিসেবে পরিচিত। এই জেএমবির অনেক জঙ্গিই এখন নব্য জেএমবিতে যোগ দিয়েছে। নব্য জেএমবিতে রাজশাহী অঞ্চলের জঙ্গিদের অনেক বেশি গুরুত্ব। কিন্তু এ অঞ্চলে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সব সময় তৎপর।

এ জন্য নতুন করে নব্য জেএমবিতে যোগ দেয়ার প্রবণতা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়া অনেক যুবকও জেএমবি নাম শুনলে সরাসরি সংগঠনটির সদস্য হতে চায় না। এ জন্য সদস্য সংগ্রহের ‘ফাঁদ’ হিসেবে নিজেদের একটি শাখা সংগঠন খুলেছিল নব্য জেএমবি। সংগঠনটির নাম ‘আনসার রাজশাহী’। মূলত নব্য জেএমবিই এই সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা এবং নীতিনির্ধারক। যারা এতে যোগ দিত, তাদের এক সময় নব্য জেএমবিতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

রাজশাহী জেলা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন। গত বছরের ১৬ আগস্ট রাজশাহীর বাগমারার শ্রীপুর খামারপাড়া গ্রাম থেকে আমিনুল ইসলাম ওরফে রুমি (২৩) ও এনামুল হক ওরফে সবুজ (২২) নামে আনসার রাজশাহীর দুই সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ তদন্ত শেষে সংগঠনটির ব্যাপারে এসব তথ্য জানতে পেরেছে পুলিশ।

পুলিশের ওই সূত্র বলছে, গ্রেপ্তার রুমি এবং সবুজও প্রথমে বুঝতে পারেনি যে, আনসার রাজশাহীর মাধ্যমে তারা নব্য জেএমবির ফাঁদে পড়েছে। তবে তারা যখন বুঝতে পেরেছে, তখন তারা আর সে পথ থেকে ফিরতে পারেনি, বরং তারা আরও বেশি ‘জিহাদি’ হয়ে ওঠে। কেননা নব্য জেএমবির ক্যাডাররা প্রথম থেকেই তাদের ‘মগজ ধোলাই’ করে আসত।

সবুজ ও রুমিকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তারের পর তাদের বিরুদ্ধে বাগমারা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা হয়। এ মামলার তদন্তও প্রায় শেষ করে ফেলেছেন তদন্ত কর্মকর্তা জেলা ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) রুহুল আমিন। তিনি জানান, এখন তিনি রুমি ও সবুজের মোবাইলের ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছেন। সেটি পেলেই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।

তিনি জানান, মামলাটির মোট ৬ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার রুমি ও সবুজ এখনও কারাগারে। একজন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। একজনের পরিচয় উৎঘাটন করা সম্ভব হয়নি। আর বাকি দু’জন পলাতক।

জেলা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কারাবন্দী রুমি ও সবুজ সম্পর্কে খালাতো ভাই। তাদের মামাতো ভাই নব্য জেএমবির সদস্য শরিফুল ইসলাম। তাদের বাড়ি একই গ্রামে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম খুনের পর থেকে তার ছাত্র শরিফুল পলাতক। মূলত শরিফুল নব্য জেএমবিতে সদস্য সংগ্রহের জন্য এর শাখা সংগঠন হিসেবে ‘আনসার রাজশাহী’ গড়ে তুলেছিল।

এই জঙ্গি সংগঠনটির ব্যানারে চিকিৎসকসহ আরও মুক্তচিন্তার মানুষকে হত্যার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল। আনসার রাজশাহীতে যোগ দেওয়া সদস্যদের দিয়ে টার্গেট কিলিং মিশন চালানোরও পরিকল্পনা ছিল তার। এরপর আনসার রাজশাহীর নতুন জঙ্গিদের একপর্যায়ে নব্য জেএমবিতে নিয়ে যাওয়ারও পরিকল্পনা ছিল শরিফুলের। তবে এর আগেই আনসার রাজশাহীর দুই সদস্যকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, আনসার রাজশাহীর সব কার্যক্রম ছিল তথ্য-প্রযুক্তিতে। প্রযুক্তির সাহায্যে তারা যোগাযোগ করতো। এই সংগঠনের সদস্যরা ফেসবুকের পাশাপাশি ‘থ্রিমা’ নামে একটি অ্যাপস ব্যবহার করতো। গ্রেপ্তারের পর রুমি ও সবুজের স্মার্টফোনেই এই অ্যাপসটি ইনস্টল পাওয়া যায়। অ্যাপসটির মাধ্যমে অন্য সদস্যদের সঙ্গে তাদের যে কথোপকথন পাওয়া গেছে, তা প্রিন্ট করে ৫৮ পৃষ্ঠা হয়েছে। তবে বর্তমানে আনসার রাজশাহীর কোনো কার্যক্রম নেই বলে দাবি করেন তিনি।

মামলার এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ধর্ষ জঙ্গি শরিফুল ইসলাম ছাড়াও পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার পাড়ভাঙ্গুড়া গ্রামের রবিউল করিমের ছেলে রওশন আলী ওরফে আকাশ (২৪) এবং বুলবুল ওরফে আলামিন ওরফে বিল্লাল (২৬) আনসার রাজশাহীর নীতিনির্ধারক হিসেবে কাজ করত। এদের কারোরই কোনো সন্ধান পায়নি পুলিশ। তাই তারা এখনও এই সংগঠনটিকে সক্রিয় করতে কাজ করছে কী না তা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।