নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রীসভা

274

যুগবার্তা ডেস্কঃ সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা ও সর্বনিম্ন আট হাজার ২৫০ টাকা নির্ধারণ করে সামরিক ও বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সচিবালয়ে সোমবার মন্ত্রিসভা বৈঠকে ‘বেতন ও চাকরি কমিশন, ২০১৩’ ও ‘সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি, ২০১৩’ এবং এ সংক্রানমশ সচিব কমিটির সুপারিশের আলোকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন স্কেল ও ভাতাদি নির্ধারণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।
বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা নতুন বেতন কাঠামোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নববর্ষ ভাতা পাবেন, বাতিল করা হয়েছে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড। বাতিল করা হয়েছে শ্রেণী ব্যবস্থাও। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শ্রেণী নয় গ্রেড দিয়ে পরিচিত হবেন। তিনি আরও বলেন, ‘নতুন বেতন কাঠামোতে আগের মতো ২০টি গ্রেডই রাখা হয়েছে। গত ১ জুলাই থেকে পে-স্কেল কার্যকর হবে, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বকেয়াসহ বেতন পাবেন। তবে প্রথমে মূল বেতন ও ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ভাতা কার্যকর হবে। এর আগেও এভাবে পর্যায়ক্রমে বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছে। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ১ জুলাই সপ্তম বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছিল।’
জাতীয় বেতন ও চাকরি কমিশনের সুপারিশের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি সুপারিশ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নির্ধারণে প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে। এরপর এ কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে অর্থ মন্ত্রণালয়। তারা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদনের জন্য তা উপস্থাপন করে। নতুন বেতন কাঠামোতে বিশেষ ধাপে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবদের মূল বেতন ৮৬ হাজার টাকা। পর্যালোচনা কমিটি বিশেষ ধাপ হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবদের মূল বেতন ৯০ হাজার টাকা এবং বেতন কমিশন এক লাখ টাকা করার সুপারিশ করেছিল। বর্তমানে এ বেতন ৪৫ হাজার টাকা।
সিনিয়র সচিবদের মূল বেতন করা হয়েছে ৮২ হাজার টাকা। পর্যালোচনা কমিটি সিনিয়র সচিবদের মূল বেতন ৮৪ হাজার টাকা ও বেতন কমিশন ৯০ হাজার টাকা সুপারিশ করেছিল। বর্তমানে সিনিয়র সচিবেরা নির্ধারিত ৪২ হাজার টাকা মূল বেতন পান।
সরকারি চাকরির সর্বোচ্চ ধাপ হিসেবে বিবেচিত সচিবের মূল বেতন (গ্রেড-১) নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৮ হাজার টাকা। পর্যালোচনা কমিটি সচিবের মূল বেতন ৭৫ হাজার টাকা ও কমিশন ৮০ হাজার টাকা সুপারিশ করেছিল। সপ্তম বেতন কাঠামোতে এখন এই কর্মকর্তারা ৪০ হাজার টাকা পেতেন।
প্রথম শ্রেণীর সরকারি চাকরির শুরুতে মূল বেতন হয়েছে ২২ হাজার টাকা (নবম ধাপ)। পর্যালোচনা কমিটিও এ ক্ষেত্রে মূল বেতন ২২ হাজার টাকা ও বেতন কমিশন ২৫ হাজার টাকা সুপারিশ করেছিল। প্রথম শ্রেণীর চাকরির শুরুতে কর্মকর্তারা আগে ১১ হাজার টাকা পেতেন।
সর্বনি¤œ স্তরের (গ্রেড-২০) মূল বেতন হয়েছে আট হাজার ২৫০ টাকা। এ ক্ষেত্রে পর্যালোচনা কমিটিও আট হাজার ২৫০ টাকা সুপারিশ করেছিল। তবে বেতন কমিশন সুপারিশ করেছিল আট হাজার ২০০ টাকা। নতুন বেতন কাঠামোর ২০টি গ্রেডের দ্বিতীয় গ্রেডে ৩৩ হাজার ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৬৬ হাজার টাকা, তৃতীয় গ্রেডে ২৯ হাজার টাকার স্থলে ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা এবং চতুর্থ গ্রেডে ২৫ হাজার ৭৫০ টাকার পরিবর্তে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। পঞ্চম গ্রেডে ২২ হাজার ২৫০ টাকার স্থলে ৪৩ হাজার টাকা, ষষ্ঠ গ্রেডে ১৮ হাজার ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা, সপ্তম গ্রেডে ১৫ হাজার টাকার জায়গায় ২৯ হাজার টাকা, অষ্টম গ্রেডে ১২ হাজার স্থানে হয়েছে ২৩ হাজার টাকা করা হয়েছে। দশম গ্রেডে আট হাজারের পরিবর্তে ১৬ হাজার টাকা, ১১তম গ্রেডে ছয় হাজার ৪০০ টাকার পরিবর্তে ১২ হাজার ৫০০ টাকা, ১২তম গ্রেডে পাঁচ হাজার ৯০০ টাকার পরিবর্তে ১১ হাজার ৩০০ টাকা, ১৩তম গ্রেডে পাঁচ হাজার ৫০০ টাকার পরিবর্তে ১১ হাজার টাকা, ১৪তম গ্রেডে পাঁচ হাজার ২০০ টাকার পরিবর্তে ১০ হাজার ২০০ টাকা করা হয়েছে।
নতুন কাঠামোতে ১৫, ১৬ ও ১৭তম গ্রেডে মূল বেতন হয়েছে নয় হাজার ৭০০, নয় হাজার ৩০০ ও নয় হাজার টাকা। আগের স্কেলে এ বেতন ছিল চার হাজার ৯০০, চার হাজার ৭০০ ও চার হাজার ৫০০ টাকা। আগে ১৮তম গ্রেডের মূল বেতন চার হাজার ৪০০ ও ১৯তম গ্রেডের মূল বেতন চার হাজার ২৫০ টাকা ছিল, নতুন বেতন কাঠামোতে তা বেড়ে হয়েছে আট হাজার ৮০০ ও আট হাজার ৫০০ টাকা। ২০১৩ সালের ২৪ নভেম্বর দেশের ১৩ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর জন্য ১৭ সদস্যের ‘জাতীয় বেতন ও চাকরি কমিশন-২০১৩’ গঠন করে অর্থ মন্ত্রণালয়। ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া এ কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। কমিশনকে ছয় মাসের (২০১৪ সালের ১৭ জুন) মধ্যে সুপারিশসংবলিত একটি প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে কমিশনের মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানো হয়।
গত বছরের ২১ ডিসেম্বর সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের কাছে প্রতিবেদন তুলে দেন জাতীয় বেতন ও চাকরি কমিশনের চেয়ারম্যান। বেতন ও চাকরি কমিশন বর্তমান ২০টির পরিবর্তে ১৬টি ধাপে বেতন দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। কমিশনের সুপারিশ ছিল সর্বোচ্চ ধাপে ৮০ হাজার টাকা ও সর্বনিম্ন ধাপে আট হাজার ২০০ টাকা। পরে ৩১ ডিসেম্বর বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নির্ধারণে প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে সরকার। কমিটিকে ছয় সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছিল। কমিটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ সময় দুই দফা বাড়ানো হয়।
অপরদিকে, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য ‘সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি’ গত ১ জানুয়ারি অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো তুলে দেয়। এতে সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন চার তারকা জেনারেল মূল বেতন হিসাবে মাসে এক লাখ এবং সর্বনিম্ন গ্রেডে বেসামরিক দায়িত্বে থাকা একজন অফিস সহকারী আট হাজার ২০০ টাকা সুপারিশ করা হয়। পর্যালোচনা কমিটি এ বেতন কাঠামোও বিবেচনায় নেয়। ‘জাতীয় বেতন ও চাকরি কমিশন, ২০১৩’ গঠনের পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা ঘোষণা করে সরকার, যা ২০১৩ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করা হয়।
গত ১৩ মে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন ভূইঞার নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা কমিটি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।