ধর্ষক ধর্মগুরুর আচরণ জংলি জানোয়ারের মতো

46

যুগবার্তা ডেস্কঃ দুই শিষ্যাকে ধর্ষণের অপরাধে ভারতের বহুল আলোচিত ধর্মগুরু গুরমিত রাম রহিম সিংকে সোমবার ১০ বছর করে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। জরিমানা করেন ১৫ লাখ রুপি করে ৩০ লাখ রুপি। সেদিন সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (সিবিআই) বিশেষ বিচারক জগদীপ সিং কেবল এই সাজা শুনিয়েই ক্ষান্ত হননি। তিনি এমন সব মন্তব্য করেছেন যা এক রকম কাঁপিয়ে দিয়েছে একদা প্রবল পরাক্রান্ত ওই ধর্মগুরুকে। বিচারক বলেন, ‘গুরমিত রাম রহিম একটা জংলি জানোয়ারের মতো কাজ করেছেন। ’

গুরমিত রাম রহিম ২৫ বছর ধরে ধর্মীয় সংগঠন ডেরা সাচা সৌদার প্রধান। এত বছরে ভক্তদের কাছ থেকে ‘বাবা’ ছাড়া কোনো ডাকই শোনেননি প্রবল পরাক্রান্ত এই ধর্মগুরু। কিন্তু সাজা ঘোষণার পর তিনি একটি ‘সংখ্যায়’ পরিণত হয়ে গেলেন। কারাগারের খাতায় তাঁর কয়েদি নম্বর ১৯৯৭। ঝলমলে বিলাস-ব্যাসনে অভ্যস্ত জীবনের বদলে এখন রোহতকের সানোরিয়া কারাগারে আর দশজন সাধারণ কয়েদির মতোই তাঁকে দিন কাটাতে হচ্ছে। কারাগারের ভেতরে কর্মীদের আলোচনায়ও নাকি ‘বাবা’কে ‘সংখ্যা’ ধরেই ডাকা হচ্ছে।

সাজা ঘোষণার পর সোমবার সন্ধ্যা থেকেই সানোরিয়া কারাগারে রাম রহিমের সাজা ভোগ শুরু হয়েছে। সদ্য জামিনে কারাগার থেকে বের হয়ে আসা এক ব্যক্তির বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানায়, ওই কারাগারে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই ধর্মগুরু অনবরত কাঁদছেন। তা ছাড়া তিনি কোনো শক্ত খাবার খাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘তিনি (ধর্মগুরু) অল্প পরিমাণ পানি ও দুধ খাচ্ছেন, জেলের ভেতর কারো সঙ্গে কথাও বলছেন না। ’ তা ছাড়া প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ৫০ বছর বয়সী রাম রহিমকে যখন টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখনো তিনি ফুঁপিয়ে উঠে বলেন, ‘আমি নিষ্পাপ, আমাকে ক্ষমা করে দাও। ’

সোমবার বিচারক রায় ঘোষণার আগে গুরমিত রাম রহিমকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘দোষী ব্যক্তি (গুরমিত রাম রহিম) একটা জংলি জানোয়ারের মতো কাজ করেছেন। তিনি তাঁর দুই পবিত্র সাধিকাকেও ছাড়েননি। ’

সাজা শোনানোর সময় আদালত কক্ষেই বসে পড়ে কেঁদে ফেলেন রাম রহিম। বিচারকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনাও করতে থাকেন। কিন্তু তাতে প্রভাবিত হননি বিচারক। ডেরা প্রধানকে মাফ করার কোনো প্রশ্নই নেই বলে জানিয়ে বিচারক বলেন, ‘ওই দুই নির্যাতিতা গুরমিতকে ঈশ্বরের সম্মান দিতেন, কিন্তু গুরমিত তাঁদের সঙ্গে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ করেছেন। যে ব্যক্তির মানবিকতা বলে কিছু নেই, যার স্বভাবে দয়ামায়া বলে কিছু নেই, তাঁর প্রতি উদারতা দেখানো যায় না। ’ বিচারক রায়ে আরো বলেন, ‘একটা ধর্মীয় সংগঠনের প্রধান হিসেবে যে নিজেকে দাবি করেন, তাঁর এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে দেশের অন্যান্য পবিত্র, আধ্যাত্মিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক আর ধর্মীয় সংগঠনগুলোর ভাবমূর্তিতেও ধাক্কা লাগতে বাধ্য। ’ দণ্ডিত ব্যক্তির কর্মকাণ্ড প্রাচীন ভারতের ঐতিহ্যের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বলেও উল্লেখ করেন বিচারক।

সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন মামলার রায় থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বিচারক জানান, ধর্ষণ কেবল একটি শারীরিক নির্যাতন নয়, এটি নির্যাতিতার গোটা ব্যক্তিত্বের বিনাশ করে দেয়। সমাজের স্বার্থেই এ ধরনের অপরাধের যোগ্য শাস্তি হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন আদালত।

হরিয়ানার পাঁচকুলার বিশেষ আদালত রাম রহিমকে ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন গত শুক্রবার। এরপর রোহতক শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের সানোরিয়া কারাগারে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। রায়ের পরপরই ওই দিনই তাঁর ভক্তরা হরিয়ানা ও পাঞ্জাব রাজ্যে ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। সহিংসতায় ৩৮ ব্যক্তি নিহত ও অন্তত ২৫০ জন আহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজ্য দুটিতে সেনা মোতায়েন করা হয়। ভক্তদের তাণ্ডব রাজধানী দিল্লিতেও ছড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সোমবার ওই সানোরিয়া কারাগারেই অস্থায়ী আদালত পরিচালনা করা হয়। বিচারক জগদীপ সিংকে হেলিকপ্টারে করে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়।

তবে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর গুরমিত রাম রহিমকে যখন সবাই ধিক্কার দিচ্ছে, তখন হরিয়ানার সিরসায় তাঁর ভক্তদের অনেকেই আবার রাখছে তাঁর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও আস্থা। তারা মনে করছে, যে ‘বাবা’ তাদের ভালো শিক্ষা দিয়েছেন, সমাজের প্রতি নীতিনৈতিকতা শিখিয়েছেন, মানুষের কোন পথে চিন্তাভাবনা করা উচিত সেসব বলেছেন—তিনি এমন কাজ করতে পারেন না। তিনি চক্রান্তের শিকার হয়েছেন। তাদের বিশ্বাস, কিছুদিনের মধ্যেই নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বাইরে আসবেন তাদের ‘বাবা’ আর রাজনৈতিক দলগুলোর চক্রান্ত গোটা পৃথিবীর মানুষের সামনে তুলে ধরবেন।-কালেরকন্ঠ