Home সারাদেশ দৌলতপুরে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শফিউল আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ

দৌলতপুরে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শফিউল আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ

17

প্রশিক্ষাণ বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ, ঘুষ আদায়, শিক্ষাকদের সাথে অসাদাচরণ

দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি : কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) শফিউল আলমের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। নতুন কারিকুলামের শিক্ষাকদের প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দের অধিকাংশ টাকা আত্মসাৎ, ক্ষামতার অপব্যবহার করে শিক্ষকদের নিকট থেকে ঘুষ আদায়, টাকা না দিলে অশোভন আচরণ, সরকারী বই বিতরণে অর্থ আদায়, সহকর্মীদের চাকরী খাওয়ার হুমকি-ধামকি সহ বিস্তর অভিযোগ উঠেছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তার এমন কর্মকান্ডে দৌলতপুরের শিক্ষক সমাজের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

দৌলতপুর দেশের অন্যতম সীমান্তবর্তী একটি বৃহৎ উপজেলা। এ উপজেলায় প্রায় একশ নিন্ম মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেখভাল করে থাকেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং কর্মচারী নিয়োগ বোর্ডে সদস্য থেকে শুরু করে নতুন শিক্ষক-কর্মচারী এমপিও, উচ্চতর স্কেল, বিএড স্কেলের কাগজপত্র উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে উর্দ্ধতন কর্মকর্তার নিকট প্রেরণ করা হয়ে থাকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় নির্দেশনা ও সে মোতাবেক প্রয়োজনীয় তথ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে প্রেরণ করা হয়। যার কারণে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অথবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাঠানো প্রতিনিধি বা শিক্ষক-কর্মচারীরা শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ রক্ষা করেন। এ উপজেলায় বিপুল সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও উপজেলা সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের পদটি দীর্ঘদিন ধরে শুন্য রয়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে সরদার আবু সালেক অবসরে গেলে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের পদটিও শুন্য হয়। এই সুবাদে গত ৭ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার পদবীর কর্মকর্তা শফিউল আলম উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে দৌলতপুরে যোগ দেন। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা না হয়েও শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ায় ৬ মাস যেতে না যেতেই তিনি ধরাকে সরা জ্ঞান করে নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকার একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষাকরা অভিযোগ করে বলেন, গত জানুয়ারীতে নতুন কারিকুলামের প্রশিক্ষণে শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দের অধিকাংশ অর্থই আত্মসাৎ করেছেন ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা শফিউল আলম। প্রশিক্ষণে উপজেলার ১১২৬ জনের (শিক্ষক-১০৮৪, প্রশিক্ষক-৪২) জন্য নাস্তা বাবদ ৮০ টাকা করে সরকারী ভাবে বরাদ্দ দেয়া হলেও ৩০-৩৫ টাকার মধ্যে নাস্তা দিয়ে বরাদ্দের অর্ধেকের বেশি টাকা আত্মসাৎ করেছেন এই কর্মকর্তা। শিক্ষা অফিসের কর্মচারীরা থাকলেও তাদেরকে নাস্তার ক্রয়ে কাজে নিয়োজিত না করে টাকা আত্মসাতের জন্য ব্যক্তিগত লোক দিয়ে নিন্মমানের ও কম মূল্যের নাস্তা সরবারহ করেন ওই শিক্ষা কর্মকর্তা। অধিকাংশ শিক্ষক ভয়ে কিছু না বললেও প্রশিক্ষন নেয়া অনেকেই নিন্মমানের নাস্তার বিষয়ে আপত্তি জানান। কিন্তু শিক্ষা কর্মকর্তা শফিউল আলম আপত্তি আমলে না নিয়ে উল্টো ওই শিক্ষকদের সাথে অশালিন আচরন করেন। প্রশিক্ষক অনেকের অভিযোগ, প্রতিটি কক্ষের জন্য উপকরণ বাবদ ১৫শ করে টাকা বরাদ্দ থাকলেও নাম মাত্র উপকরণ সরবারহ করে প্রায় পুরো টাকাই নিজের পকেটে পুরেছেন শিক্ষা কর্মকর্তা শফিউল আলম। বরাদ্দের অধিকাংশ টাকায় আত্মসাৎ করায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ ও ব্যহত হয়েছে বলেও শিক্ষকদের দাবী।

উপজেলার একাধিক নিন্ম মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক শিক্ষা কর্মকর্তা শফিউল আলমের উপর অসন্তোষ প্রকাশ করে স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) শফিউল আলম প্রতিষ্ঠান প্রধানসহ শিক্ষকদের সাথে অশোভন আচরণ করেন। তাই শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত কোন কাজে তাকে ফোন করলে অধিকাংশ সময়ই তিনি ফোন রিসিভ করেন না। কোন কোন সময় ফোন রিসিভ করলেও ফোনে খারাপ আচরণ করেন এবং হয়রানীসহ আর্থিক সুবিধা নেয়ার জন্য অফিসে এসে তার সাথে দেখা করতে বলেন। একই আচরণ করেন তার অফিসের অন্যন্যা ষ্টাফদের সাথেও। সব সময় তিনি নিজেকে হামবড়া ভাব দেখান এবং অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে কোন সময় চাকরী খেয়ে নিতে পারেন বলে মাঝে মাঝে হুমকি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

শিক্ষকদের অভিযোগ, উচ্চতর স্কেল, বিএড স্কেল, নতুন এমপিও (মান্থলি পে স্কেল) এর কাগজপত্র ফরোয়ার্ডের জন্য তিনি মোটা অংকের টাকা দাবি করে থাকেন। টাকা না দিলে কাগজপত্রের ভুলভ্রান্তির অভিযোগ তুলে শিক্ষকদের হয়রানীসহ দুর্ব্যবহার করেন। সাম্প্রতি একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে তিনি ১ লক্ষ টাকা দাবী করেছেন বলে জানা গেছে। সরকারী বই বিনা মুল্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দেয়ার কথা থাকলেও প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে বকশিশের নামে টাকা আদায় করেছেন। মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) শফিউল আলম উপজেলার প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে ক্রীড়া ও স্কাউট ফিস বাবদ মোটা অংকের টাকা উত্তোলন করেন। উত্তোলন হওয়া টাকাও নয়ছয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব টাকা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে ব্যবহার করার বিধান থাকলেও দায়সারা করে খেলাধুলা ও স্কাউটের কার্যক্রম শেষ করা হয়। খেলাধুলার জন্য ভেন্যু পরিচালনা বাবদ খরচ পরিশোধ না করার অভিযোগ করেছেন অনেক ক্রীড়া শিক্ষক। খরচের টাকার চাওয়ায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সাথেও দুর্ব্যবহার করেন ওই কর্মকর্তা।

উপজেলার ভারত সীমান্ত সংলগ্ন একটি ঐতিহ্যবাহী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, শিক্ষ কর্মকর্তার শফিউল আলম প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষকদের শিক্ষা অফিসে ডেকে তাদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করেন। তার সাথে যোগাযোগ না করার জন্য ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিÿকদের বেতন বন্ধের হুমকিও দেন। পরে শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিদ্যালয়ে নিয়ে গিয়ে রাজকীয় ভুরিভোজ ও উপঢৌকন দিয়ে কিছুটা নিস্তার পান ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

শুধু শিক্ষকরাই নয় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শফিউল আলমের কর্মকান্ডে অন্যান্য দপ্তরের কর্মকর্তারাও অখুশি রয়েছেন। উপজেলা পরিষদের কয়েকটি দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদবী হওয়ার পরও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব পেয়ে নিজেকে বড় মাপের কর্মকর্তা মনে করেন শফিউল আলম। তার আচরণে নাখোশ অধিকাংশ দপ্তরের কর্মকর্তা।

প্রধান শিক্ষকরা জানান, উনি (শফিউল আলম) একজন সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। একজন প্রধান শিক্ষক বেতন স্কেল ও পদ মর্যাদায় তার থেকে কোন ভাবেই নিচে নয় বরং উপরে। তাই নিজের অবস্থান জেনে শিক্ষকদের সাথে সম্মানজনক আচরণ করা উচিত। শিক্ষা কর্মকর্তার শিক্ষকদের সাথে অসৌজন্যমুলক আচরণ ও নানা বিতর্কিত কার্যক্রমে শিক্ষকরা তার উপর ক্ষুব্ধ।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দৌলতপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) শফিকুল আলম বলেন, কারিকুলাম প্রশিক্ষণের অনারিয়ামের হার্ড কপি, সফ্টকপি উপরে পাঠানো নিয়ে কিছুটা ঝামেলা ছিল। তবে তা সুরাহা হয়ে গেছে। শিÿকদের সাথে আচরণগত সমস্যা কিছু থাকতে পারে বলে স্বীকার করেন এবং আগামীতে এ ব্যাপারে আরো সচেতন হবেন বলেও তিনি জানান।

শিক্ষকরা জাতি গঠনের কারিগর। আর শিক্ষক সমাজকে যে দপ্তর পরিচালনা করবে সে দপ্তরের কর্মকর্তার আচরণ ও কর্মকান্ড যদি অসৌজন্যমূলক হয় সেক্ষেত্রে শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটবে এটাই স্বাভাবিক বলে সচেতন মহল মনে করেন।