দেশের মসজিদগুলোর জুমার খুৎবা নির্ধারণ

84

যুগবার্তা ডেস্কঃ শুক্রবারের জুমা নামাজের খুৎবা নির্ধারণ করেছে সরকার। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তৈরি করা নির্ধারিত এ খুৎবাটি দেশের সব মসজিদে অনুকরণ ও অনুসরণ করতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর কোথাও জুমার খুতবায় উগ্রবাদের প্রচার হয় কি না, তা নজরে রাখার কথা জানানোর পর এবার জাতীয় মসজিদে পাঠের জন্য খুতবা ঠিক করে দিয়ে এই অনুরোধ জানিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। ইসলামের নামে বিভ্রান্তিমূলক প্রচার চালিয়ে জঙ্গিবাদীরা হত্যাকাণ্ডে প্ররোচনা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিভ্রান্তিকর প্রচারে তরুণ-যুবকরা প্ররোচিত হচ্ছে বলে সাম্প্রতিক দুটি ঘটনায় উঠে এসেছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন কর্তৃক গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় বলা হয়, আজ শুক্রবার বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদের জুমার খুৎবা এতদসাথে সংযুক্ত করা হলো। সংযুক্ত খুতবাটি দেশের সকল মসজিদে অনুকরণ ও অনুসরণ করার জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হিসেব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় তিন লক্ষ মসজিদ আছে। সব মসজিদের খতিব এবং ইমামদের চিন্তা এবং দৃষ্টিভঙ্গি একরকম নয়। ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, কোন কোন মসজিদে জুম্মার নামাজের খুতবার সময় বাংলা বক্তব্যে এমন অনেক রাজনৈতিক বিষয়ের অবতারণা করা হয় যা পরোক্ষভাবে জঙ্গি কার্যক্রমকে উস্কে দিতে পারে। এর আগে গত ১০ জুলাই দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে আইন-শৃংখলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির বৈঠকে জুমার নামাজের খুৎবা নজরদারির সিদ্ধান্ত হয় বলে বৈঠকে শেষে কমিটির সভাপতি ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু সংবাদ ব্রিফংয়ে এ তথ্য জানান। এ সময় তিনি বলেন, প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের বয়ান নজরদারি করা হবে। আর যারা খুৎবা পড়াবেন, তারা যেন প্রকৃত ধর্মীয় অনুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন, সে বিষয়টিও দেখা হবে। বাংলাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক শামীম মো: আফজাল মনে করেন জুম্মার নামাজের সময় দেশের মসজিদগুলোতে ভিন্ন-ভিন্ন খুৎবা না পড়ে যদি জাতীয়ভাবে একটি খুৎবা রচনা করা হয় তাহলে বিষয়টি ইতিবাচক হবে। আফজাল বলেন, “ পৃথিবীর বহু দেশে খুৎবা সাধারণত রাষ্ট্র কর্তৃক রচনা করে দেয়া হয় এবং সেটা সকল মসজিদে পড়া হয়। আমাদের দেশে– বিশেষ করে পাক-ভারত উপমহাদেশে–বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানে এ সিস্টেমটা সেভাবে চালু হয় নাই।” ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মনে করেন, কোরআন ও হাদিসের আলোকে এবং দেশের সংস্কৃতির সাথে মিল রেখে যদি জাতীয়ভাবে খুৎবা রচনা করা যেতে পারে। দেশের বিজ্ঞ আলেমরা এই খুৎবা রচনায় সহায়তা করতে পারেন বলে আফজাল উল্লেখ করেন। এক প্রশ্নের জবাবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক বলেন, “এখন থেকে একশ বছর আগে যত ওলামা ছিলেন তারা কোরআন এবং সুন্নাহকে আরবিতে পড়তেন, বুঝতেন এবং জ্ঞান অর্জন করতেন। বর্তমানে মাদ্রাসাগুলো থেকে দ্বিনী শিক্ষার কিছু ব্যত্যয় ঘটেছে। এ ব্যত্যয় পুনরুদ্ধার করতে গেলে আমাদের প্রকৃত আলেম তৈরি করতে হবে।” আফজাল মনে করেন, বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষাকে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ করতে হবে। এটি না হওয়া পর্যন্ত জাতীয়ভাবে খুৎবা রচনায় দেশের বিজ্ঞ আলেমরা যদি সহায়তা করেন, তাহলে অনেকে ‘উপকৃত’ হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, খুৎবা ইসলামের একটি মৌলিক দর্শন। তিনি অভিযোগ করেন, অনেকে ইসলামের ‘ভিন্ন ব্যাখ্যা’ তুলে ধরছেন। সেজন্য খুৎবা জাতীয়ভাবে রচনা করা হলে মুসলমান জনগোষ্ঠী এটিকে সাধুবাদ জানাবে বলে তিনি মনে করেন। সরকার নির্ধারিত খুৎবায় যা বলা হয়েছে: বৃহস্পতিবার রাতে ফাউন্ডেশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই অনুরোধ জানানোর পাশাপাশি দুই পৃষ্ঠার খুতবার আরবি ও বাংলা তরজমাও পাঠানো হয়েছে। খুতবার বাংলা তরজমায় বলা হয়েছে, “হে মসুলমানগণ! একজন মানুষ সে যাই হোক না কেন- তার জন্য পৃথিবীকে নিরাপদ জীবন ধারণের অধিকার স্বীকৃত। সে মুমিন হোক কিংবা কাফির হোক কিংবা ফাসেক হোক। অন্যায়ভাবে কোনো মানুষকে খুন করা কিংবা তার সম্পদ গ্রাস করা কিংবা তাকে অপমানিত করা হারাম। কুরআন বলেছে, আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করো না এবং আরও এরশাদ হচ্ছে যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোনো মানুষকে হত্যা করল সে যেন দুনিয়ার সকল মানুষকেই হত্যা করল।” এতে আরও বলা হয়েছে, “মহানবী বলেন, সর্বোচ্চ কবিরা গোনাহ হল মানুষ খুন করা। এখানে মুসলিম অমুসলিম পার্থক্য করা হয়নি।” খুতবায় অভিভাবকদের সচেতন করে বলা হয়েছে, “আপনারা আপনাদের সন্তান-সন্ততির বিষয়ে বিশেষভাবে মনোযোগী ও সাবধান থাকুন। তাদেরকে সুন্দর চরিত্রের শিক্ষা দিন। তাদের বিষয়ে সজাগ থাকুন যে আপনার সন্তানকে আপনার চোখ ফাঁকি দিয়ে যেন সন্ত্রাসীরা কেড়ে নিতে না পারে। সন্ত্রাসীরা এই অবুঝ সরল কিশোরদেরকে পরিবারের নিয়ন্ত্রণ থেকে ভাগিয়ে নিয়ে নানা অপকর্মের প্রশিক্ষণ দিয়ে জঙ্গি বানাতে চেষ্টা করে থাকে।” খুতবায় আরও বলা হয়েছে, “সবশেষে আমরা আহ্বান করি আমাদের সন্তানদেরকে, আমাদের যুবকদেরকে সকল সন্ত্রাসী কার্যক্রম থেকে বেঁচে থাকতে, হে আল্লাহ! আমাদের দেশ বাংলাদেশ। এ দেশকে আপনি সন্ত্রাস ও বিপর্যয় থেকে রক্ষা করুন এবং একে শান্তি ও সমৃদ্ধির দেশে পরিণত করুন।”