দুশ্চিন্তায় আওয়ামী লীগ

64

যুগবার্তা ডেস্কঃ আসন্ন ইউনিয়ন (ইউপি) পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী ইস্যুটি দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে। এ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানোর সঠিক কোনও পথ এখন পর্যন্ত বের করতে পারেনি দলটি। পৌরসভা নির্বাচনের মতো ইউপি নির্বাচনে বহিষ্কারের ভয়-ভীতি অথবা বাধ্য করে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না আওয়ামী লীগ, তেমনি বিদ্রোহীর আধিক্য থাকবে এটাও চায় না। দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ইস্যুটি উভয় সংকটে ফেলে দিয়েছে ক্ষমতাসীনদের। আবার ইউপি নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি হবে এ আশঙ্কাও দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ভেতরে ঝেঁকে বসেছে। তাই বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রশ্নে দিনে দিনে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে উঠছেন নেতারা।
নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
সূত্র জানায়, বিশেষ একটি সং¯’ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে একটি জরিপ চালিয়েছে। দলীয়ভাবে এই নির্বাচনে বিদ্রোহীর প্রার্থীর সংখ্যা কেমন হতে পারে- সেই সংখ্যা নিরূপন করতে। জানা গেছে, ওই জরিপের ফলাফল ভীষণ হতাশ করেছে ক্ষমতাসীনদের। তাই বিদ্রোহী ঠেকাতে বহিষ্কারের ভয়-ভীতির বাইরে আর কী কৌশল নির্ধারণ করা যেতে পারে সেটি নিয়ে ভাবছে দলটি।
যারা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে চা”েছন তাদের সবাই ¯’ানীয়ভাবে প্রভাবশালী। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তখন পাড়া-মহল্লায় দ্বন্দ্ব শুরু হবে। যার প্রভাব আগামী জাতীয় নির্বাচনের ভোটেও পড়তে পারে।
আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক মন্ত্রী বলেন, সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে কয়েক হাজার বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়িয়ে যেতে পারেন। সবাইকে বহিষ্কার করতে গেলে দল দুর্বল হয়ে পড়বে, বিভক্তি বাড়বে দলে। আর বিপুল সংখ্যক দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়াও কঠিন কাজ। এক্ষেত্রে ভুল প্রার্থী বাছাইয়ের সুযোগ থাকে। তখন যোগ্য ও দলের নিবেদিত অনেকে হয়তো বিদ্রোহী হবেন। আর এসব বিদ্রোহীকে দল থেকে বের করে দিলে তৃণমূলে চিড় ধরবে।
সম্পাদকম-লীর এক নেতা ইউপি নির্বাচনে তৃণমূলে সংঘাত ও সংঘর্ষের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, পৌর নির্বাচনে কিছু এলাকায় সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। দলীয় প্রতীকে এতো বেশি সংখ্যক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে একক প্রার্থী বাছাইয়ের পরে কোন্দল, হানাহানি ও সংঘাতের মতো সমস্যা হতে পারে।
সূত্র জানায়, বিগত পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগেই সবচেয়ে বেশি প্রায় ২০০ বিদ্রোহী প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছিল। চাপ ও ভয় দেখিয়ে, প্রশাসনকে ব্যবহার করে অনেককে নির্বাচনি মাঠ থেকে সরালেও শেষপর্যন্ত ৭০ জন বিদ্রোহী থেকে যান। এরমধ্যে ১৯ জন বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ীও হয়েছেন। দলীয় পদে ছিলেন এমন ১৫৯ জন বিদ্রোহী প্রার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। বাগেরহাটে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অন্তত অর্ধশত নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেও বিদ্রোহীদের নিয়ে আলোচনা হয়। তবে দলের সাংগঠনিক অব¯’ার কথা চিন্তা করে তাৎক্ষণিক কঠোর কোনও সিদ্ধান্তে যায়নি দলের কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড। বিষয়টি তদন্তাধীন করে রাখা হয়েছে। দলটির নেতারা বলছেন, যেটুকু করা হয়েছে তা শুধু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী ঠেকানোর একটা কৌশল। এভাবে যারা দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ করে এসেছে তাদের অধিকাংশই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো যোগ্য। তাদেরকে দল থেকে দূরে ঠেলে দিলে সংগঠনে অন্যরা আসতে চাইবে না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বলেন, আওয়ামী লীগ একটি পুরনো ও বিশাল সংগঠন। ফলে এখানে প্রতিদ্ধন্দ্বিতাও বেশি হয়। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও তার ব্যত্যয় ঘটবে না। তিনি বলেন, এখানেও বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়ানোর একটা সম্ভাবনা থাকবে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী যাতে না থাকে সেজন্যে আওয়ামী লীগ কাজ করছে। আশা করি তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাবেন না।
নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের প্রাণশক্তি। ইউপি নির্বাচনকে উপলক্ষ করে প্রার্থী হওয়া নিয়ে তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বেঁকে বসুক তা কিছুতেই চায় না ক্ষমতাসীনরা। আবার বিদ্রোহীর সংখ্যাও অস্বাভাবিক হারে থাকবে সেটাও চায় না তারা। মধ্যপš’া অবলম্বন করে সবকিছু ঠিক রাখার চিন্তা রয়েছে আওয়ামী লীগের ভেতরে। প্রার্থীদের কেন্দ্র থেকে বাধ্য করে বসানো, বহিষ্কারের ভয়-ভীতি দেখিয়ে বসানো কোনওভাবেই দলের জন্যে সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না। এতে করে বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানো সম্ভব হবে না। বরং হীতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকতে পারে। তাই বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতে বিকল্প পথ বের করতে বেশি তৎপর আওয়ামী লীগ।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নীতি-নির্ধারণী মহল আবার এটিও মনে করছে যে, ইউপি নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীর আধিক্য দলের শৃঙ্খলা নষ্ট করবে। শৃঙ্খলাহীন আওয়ামী লীগ তৃণমূলে দুর্বল হয়ে পড়বে। ক্ষোভ-বিক্ষোভ থেকে অনেকেই দলীয় রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারেন। অপর একটি সূত্র জানায়, তাছাড়া প্রার্থী বাছাইয়ের পদ্ধতিটি যদিও কেন্দ্রের ওপর তবুও প্রার্থী বাছাই শতভাগ সফল হবে সেটাও মনে করছে না নীতি-নির্ধারণী মহল। দলের অভ্যন্তরে একটা শ্রেণি গড়ে উঠেছে তদবির ও আর্থিক লেনদেন করে প্রার্থী বাগিয়ে নেওয়ার। সেখানে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীরা বাদ পড়ে যেতে পারে। ফলে এটি ভীষণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে তৃণমূল আওয়ামী লীগের ভেতরে। বিদ্রোহী ঠেকানোর বিকল্প পথ কী হতে পারে তা নিয়ে ভাবছে ক্ষমতাসীনরা।
দায়িত্বশীল কয়েকটি সূত্র জানায়, বহিষ্কারের ভয়-ভীতি সঠিক কোনও পথ নয়। বিকল্প চিন্তা মাথায় না রেখে বিদ্রোহের শাস্তি বহিষ্কার- এ অব¯’ানে অনড় থাকলে এবং এ অপরাধে দলের নেতাকর্মীদের বহিষ্কার করা হলে তৃণমূলের রাজনীতি করবে কারা? এমন প্রশ্নও দেখা দিয়েছে দলটির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে। এ নিয়ে দলের ভেতরে দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে বলে জানান নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা।
তাদের মতে, পৌরসভা নির্বাচনে কঠোর অব¯’ানে থেকেও বিদ্রোহী দমনের ক্ষেত্রে আশানুরূপ সফলতা পায়নি ক্ষমতাসীনরা। ইউপি নির্বাচন একেবারেই তৃণমূল পর্যায়ের নির্বাচণী উৎসব। তাই এখানে সফলতা পাওয়ার কল্পনাই করতে পারছেন না কেন্দ্রীয় নেতারা। ইউনিয়ন পর্যায়ে যারা রাজনীতি করেন তাদের সবারই সর্বশেষ স্বপ্ন থাকে- ইউনিয়ন চেয়ারম্যান হবেন তারা। তাই রাজনীতির পাশাপাশি ইউনিয়নের জনগণের সেবায় সর্বদায় নিয়োজিত থাকেন তৃণমূল পর্যায়ের এসব নেতারা। এবার দলীয়ভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আইন হওয়ায় সেই স্বপ্নে ছেদ ঘটে তাদের। তাই ইউপি নির্বাচনে সফলতা পাওয়ার চিন্তা একেবারেই দুঃস্বপ্ন হিসেবে দেখছে দলটির নীতি-নির্ধারণী মহল। আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
জানতে চাইলে সভাপতিম-লীর সদস্য কাজি জাফরউল্যাহ বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরে এক রকম দুশ্চিন্তা রয়েছে। তবে সঠিক নেতৃত্ব ও সঠিক সিদ্ধান্ত আমাদেরকে এ দুশ্চিন্তা থেকে উত্তরণ ঘটাবে। বাংলা ট্রিবিউন