এম এইচ নাহিদঃ অসুস্থ হলে নিরাময়ের আশায় মানুষ ছুটে যান চিকিৎসকের কাছে। কিন্তু টেস্ট স্লিপ ও ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন)-এ চিকিৎসকের হাতের লেখা দুর্বোধ্য হওয়ায় বিড়ম্বনার শিকার হন অনেকে। ভুক্তভোগী রোগী ও স্বজনেরা ধরতে পারেন না চিকিৎসকের হাতের লেখা। এই বিড়ম্বনার শিকার শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে ঔষধ ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার পরেও প্রেসক্রিপশন পড়তে ব্যর্থ হন ফার্মেসি মালিক ও কর্মচারিরা। অনেক সময় না বুঝেই দিয়ে দেন ভুল ঔষধ। এর ফলে রোগীরা নিরাময়ের পরিবর্তে আরো অসুস্থ হয়ে যায়। মারাত্মক মৃত্যু ঝুঁকির সম্ভাবনাও দেখা দেয়। অনেকে মারাও যান। সারাদেশে অহরহ ঘটছে এসব ঘটনা। এমনতর পরিস্থিতিতে স্পষ্ট অক্ষরে ‘পড়ার উপযোগী করে’ প্রেসক্রিপশন লেখার নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ৩০ দিনের মধ্যে বিজ্ঞপ্তি জারির নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ‘প্রেসক্রিপশনে ঔষধের জেনেরিক নাম লিখতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না’- তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত। স্বাস্থ্য সচিব ও বিএমডিসির রেজিস্ট্রারসহ সাত বিবাদীকে এই রুলের জবাব দিতে হবে আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে।
প্রেসক্রিপশন অস্পষ্ট করে লেখা নিয়ে গত বছরের ২ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনে রিট আবেদন করে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস এ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি)। এই রিট আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন এ্যাড. মনজিল মোরসেদ। গত ৯ জানুয়ারি সোমবার বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি আবু তাহের মোঃ সাইফুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ রিটের শুনানি শেষে এই আদেশ এবং রুল জারি করেন।
প্রেসক্রিপশনে চিকিৎসকদের হাতের লেখা বুঝতে না পারায় ভোগান্তির ঘটনা বহু আগ থেকে। এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারাবিশ্বের মানুষ চিকিৎসকদের দুর্বোধ্য হাতের লেখা প্রেসক্রিপশন নিয়ে সমস্যায় পড়ছে। প্রতিবছর সারাবিশ্বে প্রায় ৭ হাজার রোগী মারা যান চিকিৎসকদের হাতের লেখা খারাপ হওয়ার কারণে। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই বছরে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ আরো বেশি অসুস্থ হন প্রেসক্রিপশন বিভ্রান্তির ঘটনার শিকার হয়ে। এ তথ্য উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব মেডিসিন (আইএমও) এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে।
চিকিৎসকের দুর্বোধ্য প্রেসক্রিপশন নিয়ে বিভ্রান্তির শিকার ভুক্তভোগী রোগী, স্বজন এবং ফার্মেসি মালিক ও কর্মচারিদের নিকট থেকে জানা গেছে, দ্রুত রোগী দেখা, মনোযোগ না দেওয়ার কারণে চিকিৎসকরা দায়সারা গোছের লেখা প্রেসক্রিপশন তুলে দেন রোগীদের হাতে। দেশের হতদরিদ্র ও স্বল্প শিক্ষিত মানুষ তো দূরের কথা, উচ্চ শিক্ষিতরাও এসব প্রেসক্রিপশন
পড়তে পারেন না। এমনকি সবসময় ঔষধের ‘ব্র্যান্ড নেম’ নিয়ে কাজ করা ফার্মেসি মালিক ও কর্মচারিরাও দুর্বোধ্য লেখা প্রেসক্রিপশন ধরতে ব্যর্থ হন। এ প্রসঙ্গে দেশের খ্যাতনামা একটি ফার্মেসির মালিক বলেন, ৩০ বছর যাবৎ এ পেশায় আছি। ৩০ হাজারের বেশি ‘ব্র্যান্ড নেম’ এর ঔষধ নাড়াচাড়া করছি। তারপরেও চিকিৎসকদের হাতের লেখা ধরতে পারি না। কর্মচারিরা অনেক সময় ভুল ঔষধ দিয়ে দেয়।
সূত্রমতে জানা গেছে, রাজধানীর এক খ্যাতনামা ফার্মেসির কর্মচারি প্রেসক্রিপশনের লেখা বুঝতে না পেরে এনারক্সিনের পরিবর্তে এনটক্স দেন। এনটক্স হলো ভিটামিন আর এনারক্সিন হলো রক্তক্ষরণ বন্ধ করার ঔষধ। এনটক্স এর পরিবর্তে এনারক্সিন দেওয়া হলে মারাত্মক সমস্যা হতো। এমনকি মৃত্যুও হতে পারতো। বিশেষ করে হার্টের সমস্যার রোগীকে এনারক্সিল দিলে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু ঘটতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ফার্মেসি মালিক জানিয়েছেন, প্রেসক্রিপশনে হাতের লেখা ভালো না হওয়া এবং তা পড়া দুর্বোধ্য হওয়ায় আরো একটি কারণ হলো কমিশন বাণিজ্য। চিকিৎসকরা এমনভাবে সংকেতের মাধ্যমে লেখেন যাতে পাশের দোকান এবং নির্ধারিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার ছাড়া অন্য কেউ না ধরতে পারে। রোগীকে বাধ্য হতে হয় নির্ধারিত দোকান ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে।
বেশ কয়েকজন ঔষধ বিক্রেতা জানিয়েছেন, চিকিৎসকদের হাতের লেখা ইংরেজি ‘ইউ’ কে ‘ডব্লিউ’, ‘ই’ কে ‘এ’ এবং ‘এল’ কে ‘টি’ মনে হয়। এতে সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া ঔষধ সেবনের নিয়মাবলি লিখতে গিয়ে বিডি, টিআইডি লিখে থাকেন যা অনেকেই বোঝেন না। রোগীরা রাতের ঔষধ সকালে, সকালের ঔষধ রাতে খান। এর ফলে অনেকের জটিলতা আরো বাড়ে। ঘুমের ঔষধ রাতের পরিবর্তে সকালে খেলে সারাদিন তার সমস্যা হবে। তাই প্রেসক্রিপশনে ‘রাতে খাবে’ না কি সকালে বা দুপুরে খাবে, খাবার আগে খাবে না পরে খাবে তা স্পষ্ট করে লেখা উচিৎ।
এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক-বর্তমান চিকিৎসকগণ বলেছেন, ইদানিং অনেক চিকিৎসকের হাতের লেখা অনেক দুর্বোধ্য হচ্ছে। চিকিৎসকের লেখা প্রেসক্রিপশন পড়তে সমস্যার কারণে রোগীকে ভুল ঔষধ দেওয়া হলে তা জীবন রক্ষার পরিবর্তে মানুষকে অসুস্থ করে ফেলতে পারে, তার মৃত্যুও ঘটতে পারে। তাই এ বিষয়ে চিকিৎসক ও ঔষধ বিক্রেতাদের সচেতন হওয়া উচিৎ। এই সমস্যার সমাধানের জন্য তারা বলছেন, রোগীর আইডি নম্বর খুলে রোগ সংক্রান্ত পূর্ব ইতিহাস বিস্তৃতভাবে লেখা এবং প্রেসক্রিপশন টাইপ আকারে দেওয়ার জন্য ‘ডিজিটাল চিকিৎসা তথ্য ও ব্যবস্থাপত্র’ পদ্ধতি চালু করলে বিড়ম্বনা অনেক কমে যাবে। কিন্তু রাতারাতি তা করা সম্ভব নয়। তাই এই পদ্ধতির উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিৎ এবং আপাতত স্পষ্টভাবে বড় হাতের অক্ষরে প্রেসক্রিপশন করা উচিৎ। অবশ্য পপুলার, স্কয়ার, ইউনাইটেড হসপিটালসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী রোগীদের সঠিক চিকিৎসা ও সুস্থ জীবন যাপনের জন্য চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন পড়ার উপযোগী হওয়া উচিত বলেই মনে করছেন চিকিৎসাবিদ ও সাধারণ মানুষ। সকলের প্রত্যাশা আদালতের দেওয়া নির্দেশনা ও রুলের আদেশ দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে সাধারণ মানুষকে বিড়ম্বনার হাত থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।