দুর্গত মানুষের হক ‘মেরে খাওয়ার উৎসব’

58

মশিউল আলম : আমাদের ছইওয়ালা নৌকাটি পাড়ের দিকে এগোচ্ছে দেখে চারজন নারী এসে উঁচু বাঁধের কিনারে দাঁড়ালেন। নৌকা আরও কাছে ভিড়ে দাঁড়ালে দেখতে পেলাম, তাঁদের শরীরগুলো পাতলা ও বাঁকা-তেড়া, মুখগুলো শুকনো, চোখে এমন এক অসহায়ত্বের ছাপ যেন নিজেরা জন্ম নিয়ে এবং শিশুদের জন্ম দিয়ে বিপদে পড়েছে। একজনের কোলে উলঙ্গ শিশু। কিনারের কাছে ঘোলা পানিতে গোসল করছিলেন মেদহীন শরীরের পাকাচুলো দাড়িওয়ালা এক লোক। তাঁর আশপাশে এক দঙ্গল ছোট ছোট ছেলেমেয়ে পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি করছে। তাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে ছোট, তারা সম্পূর্ণ উলঙ্গ। একটু বড়দের পরনে শুধু হাফপ্যান্ট। তাদের উদ্দাম ঝাঁপাঝাঁপি দেখে মনে হয় কালো কালো অপুষ্ট ছিপছিপে শরীরগুলো ভীষণ হালকা। তাদের পেটগুলো সেঁধিয়ে গেছে পিঠে, কিন্তু মুখে হাসি।
বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি উপজেলার কাজলা ইউনিয়নের চর ঘাগুয়া নামের জনপদ। আমরা নৌকা থেকে নেমে উঁচু বাঁধের ওপর দাঁড়ানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই জায়গাটাতে জড়ো হয়ে গেল ৫০-৬০ জন মানুষ। নারীদের সংখ্যাই বেশি, শিশুরাও আছে। দেখতে দেখতে কিছু পুরুষমানুষও এসে জুটে গেল।
‘আপনারা কেমন আছেন?’ এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হলো, ভুল করলাম না তো? কারণ, মানুষগুলোর চেহারা-সুরত, গা-গতর, দাঁড়ানোর ভঙ্গি আর চোখমুখের অসহায়-নিরুপায় অভিব্যক্তি স্পষ্টই বলে দিচ্ছে, এরা ভালো নেই। বন্যায় বিপর্যস্ত ও প্রায় সর্বস্ব হারানো লোকজন কেমন থাকতে পারে, তা উপলব্ধি করতে হয়।
কিন্তু আমার প্রশ্নটার উত্তর দিলেন এক নারী, ‘বন্যায় সব খায়া লিছে, হামরা আর ক্যাংকা থাকবার পারি?’
যখন ঘরবাড়ি ডুবে গিয়েছিল, তখন তাঁরা ঘটিবাটি নিয়ে কেউ উঠেছিলেন উঁচু এক বাঁধে, কেউ এক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টিকে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র ঘোষণা করা হয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার পর ঘরে ফিরে এসেছেন, কিন্তু ঘর তো আর নেই। শুধু পড়ে আছে শূন্য ভিটেখানা। সেখানে এখন নতুন করে ঘর তুলতে হবে।
এই কথাগুলো শুধু ওই নারীর একার কথা নয়, ওখানে জড়ো হওয়া প্রত্যেক নারী ও পুরুষের। তাঁদের প্রত্যেকেরই এখন প্রথম কাজ ঘর তোলা, তারপর বানে খেয়ে ফেলা ফসলের খেতে নতুন করে ফসল ফলানো। দুটো কাজেই টাকা দরকার। কিন্তু কারও হাতে টাকা নেই।
‘তাহলে কী করে আপনাদের নতুন ঘর উঠবে, ফসল ফলানোর বীজ কিনবেন কী দিয়ে?’
এই প্রশ্নের উত্তরে এক বৃদ্ধ বললেন, ‘করজ করা নাগবি’, অর্থাৎ ঋণ নিতে হবে। ১ হাজার টাকা ঋণ নিলে মাসে ৫০ টাকা সুদ দিতে হয়—এমন শর্তে ৩০-৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যায়। কেউ বললেন, ধানের চারা নেই, তাই আমন রোপার চেষ্টা আর করবেন না। পানি আরেকটু নেমে গেলে মরিচ আর মাষকলাই বুনবেন।
যাঁরা ফসল বুনবেন, তাঁদের কারোরই এক ছটাক জমি নেই। অন্যের জমি আধি-বর্গা নিয়ে ফসল ফলাবেন। ফসল উঠলে জমির মালিকের সঙ্গে ভাগাভাগি হবে, ঋণ শোধ হবে।
‘আপনারা কি ত্রাণ সাহায্য পেয়েছেন?’
এই প্রশ্নের উত্তরে এক নারী বললেন, তিনি কিছুই পাননি। তাঁর সঙ্গে গলা মিলিয়ে অন্য নারীরাও শোরগোল শুরু করলেন এই বলে যে তাঁরা কেউ কোনো ত্রাণ সাহায্য পাননি। ভিড়ের মধ্য থেকে এক পুরুষ বললেন, এই ওয়ার্ডে ভোটার আছেন সাড়ে তিন হাজার, তাঁদের মধ্যে ত্রাণ সাহায্য পেয়েছেন হাজারখানেক। এই সৌভাগ্যবানেরা হলেন তাঁরা, যাঁরা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার-চেয়ারম্যানের ‘পিছে পিছে’ ঘোরেন।
যাঁরা ত্রাণ সাহায্য কিছুই পাননি, তাঁরা কী খেয়ে বেঁচে আছেন? তাঁদের শিশুরা কী খাচ্ছে? দিনে কয়বার খেতে পাচ্ছে? কয়েকজন নারীকে এসব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে প্রায় একই ধরনের উত্তর পাওয়া গেল। সবারই সকালের খাবার পান্তাভাত, দুপুরের খাবার পান্তাভাত এবং রাতের খাবার ভাত। সঙ্গে থাকে নুন। ভাগ্যবানদের পাতে একটুখানি আলুভর্তা কিংবা ডাল জুটতে পারে। নদীর পানি উপচে ঘরবাড়ি ভাসিয়ে দিয়েছে, কিন্তু সেই পানিতে মাছ ধরা অসাধ্যসাধনের কাজ।
ত্রাণ পেয়েছেন এমন এক পুরুষকে অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেল। জিজ্ঞাসা করলাম, কী ত্রাণ পেয়েছেন? উত্তর: পাঁচ কেজি চাল, এক কেজি ডাল, এক কেজি সয়াবিন তেল, এক কেজি চিনি, একটা মোমবাতি আর একখানা দেশলাই। পেয়েছেন সাকল্যে একবারই, সেই মাস দেড়েক আগে। চাল পাঁচ কেজি আছে বলা হয়েছিল, কিন্তু মেপে দেখা গেছে সাড়ে তিন কেজি। ডাল আর চিনিও এক কেজি করে ছিল না, কম ছিল।
আসলে এই ত্রাণ সহযোগিতা এসেছিল সরকারি তরফ থেকে নয়, একটি বেসরকারি ব্যাংক এখানকার কিছু পরিবারকে তা দিয়েছিল। সরকারি ত্রাণ চর ঘাগুয়া নামের জনপদটিতে কেউ যদি পেয়ে থাকেন, আমরা অন্তত তাঁদের কারোর দেখা পাইনি। কিন্তু এই মানুষেরা জানেন, সরকার তাঁদের জন্য ত্রাণ বরাদ্দ করেছে। তাঁরা আমাদের নিঃসংকোচে বললেন, তাঁদের হক মেরে খাওয়া হয়েছে।
চর ঘাগুয়া থেকে এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে নৌকায় যাওয়ার পর আমরা পৌঁছলাম উঁচু এক বাঁধের কিনারে। মাটির বাঁধটির ওপরে এখনো রয়ে গেছে শ খানেক দুর্গত পরিবার। খুঁটির ওপরে টিনের চালা, তার নিচে গরু-ছাগলের সঙ্গে তাঁদের সন্তানসন্ততিসহ ঘর-গেরস্থালি চলছে। কারও চালার নিচে উদোম চৌকি, কোনো পরিবার শয্যা পেতেছে শুকনো পাটকাঠি বিছিয়ে। কণ্ঠার হাড় বের হওয়া উলঙ্গ-অপুষ্ট শিশুরা ছন্নছাড়া হাঁস-মুরগির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি করছে। আমাদের দেখে তারা পানি থেকে উঠে এসেছে। তাদের চোখগুলো ঘোলা-লালচে বর্ণ ধারণ করেছে, পাতলা ঠোঁটগুলো নীল, ভেজা বুক ও গলার কাছে ঘন হয়ে ফুটে আছে ঘামাচি।
কথা শুরু হলো। এইখানেও সেই একই দুঃখের কাহিনি: ঘর ভেসে গেছে। এইখানে এই উঁচু বাঁধের ওপর এসে উঠেছেন মাস দু-এক আগে। সেই থেকে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে। খাওয়ার পানি নেই, মাইল দু-এক দূরের এক উঁচু গ্রামে এক মসজিদ প্রাঙ্গণে একটা টিউবওয়েল আছে। নারীরা হাঁড়ি-পাতিল-কলসিতে করে সেখান থেকে পানি বয়ে আনেন। কিন্তু মসজিদের ‘মুনশি খাউমাউ করেন’, তাড়িয়ে দিতে চান। খাদ্য ও পানির কষ্ট শুধু মানুষের নয়, তাদের গরু-বাছুরগুলোও প্রায় অভুক্ত। আশপাশে সবখানে পানি, ঘাস নেই, খড় তো আরও দুর্লভ।
এই মানুষগুলো এখানে এসে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে গত প্রায় দুই মাসের মধ্যে ত্রাণ পেয়েছেন সাকল্যে মাত্র একবার—শুধু চাল। প্রতি পরিবারের পাওয়ার কথা ১০ কেজি চাল। কিন্তু কোনো পরিবার পাঁচ-ছয় কেজির বেশি পায়নি। কিন্তু তাঁরা জানেন, তাঁদের ১০ কেজি করে পাওয়ার কথা। বললাম, আপনারা কম নিলেন কেন? এক নারী রসিকতা করে বললেন, ‘ঢাকার থিনি ১০ কেজি চাউল দিছে। কিন্তু ঢাকা ত অনেক দূরে, এটি আসতি আসতি কমি পাঁচ কেজি হয়া গেছে।’
এই নারীর এই করুণ রসিকতার মধ্যে নিহিত আছে আমাদের সরকারের চলমান বন্যা ত্রাণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রকৃত চিত্র। সহজ কথায়, সরকারের বরাদ্দ ত্রাণসামগ্রীগুলো নিয়ে চুরির উৎসব চলছে। সরকারের ঘোষিত ২৭ জেলার ৫৭ লাখ বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য যা বিপর্যয়কর দুর্যোগ, সরকারি ত্রাণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একটা বড় অংশের জন্য তা দুর্গত মানুষের ‘হক মেরে খাওয়া’র মচ্ছব।
আমরা সরকারি সূত্রগুলো থেকে বারবার শুনে আসছি, বন্যার্তদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দ করা হয়েছে। ১৯ জুলাই সচিবালয়ে ২৩টা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে ঘোষণা করা হয়েছে, ত্রাণ সাহায্যের বরাদ্দ প্রাণ তিন গুণ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু সেই ত্রাণ বন্যাদুর্গত মানুষদের কাছে সত্যিই পৌঁছাচ্ছে কি না, পৌঁছালে কতটা পৌঁছাচ্ছে, তেমন কোনো হিসাব ওই বৈঠকে প্রকাশ করা হয়নি। বিষয়টা যেন এমন যে ত্রাণ সাহায্যের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে—এই খবর সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হলেই সরকারের সন্তোষ ঘটে এবং ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পালনকারী সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়।
গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বন্যাদুর্গত মানুষদের দেখতে ও তাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের উদ্দেশ্যে সারিয়াকান্দি সফরে এসে বিশাল জনসভায় হাজার হাজার বন্যার্ত মানুষকে আশ্বাস শোনালেন, পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, একজন মানুষও যেন খাবারের অভাবে কষ্ট না পায়, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই আশ্বাস বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন এবং তা করতে হলে যারা বন্যাদুর্গত মানুষগুলোর হক মেরে খাওয়ার মচ্ছবে নেমেছে, তাদের খুব শক্ত হাতে দমন করতে হবে।
কিন্তু এই কঠিন কাজটা করবে কে?
মশিউল আলম: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।