দুই মন্ত্রীর ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ৭ দিনের কারাদণ্ড ।মন্ত্রীত্বের বিষয়ে সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভায়

46

যুগবার্তা ডেস্কঃ আদালত অবমাননার দায়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হককে দোষী সাব্যস্ত করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এ জন্য তাঁদের ৫০ হাজার করে এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে সাত দিনের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম আদালত অবমাননার দায়ে কোনো মন্ত্রীকে সাজা দিল সুপ্রিম কোর্ট।
আজ (রোববার) সকালে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত সদস্যের বেঞ্চ এ আদেশ দেন। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন—বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিয়া, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার।
দুই মন্ত্রীর জরিমানার অর্থ লিভার ফাউন্ডেশন ও ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে অনুদান হিসেবে জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। রায়ের বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সাত দিন পর জানাতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
রবিবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে প্রধান বিচারপতি ও বিচারাধীন বিষয়ে বিরূপ মন্তব্যের ব্যাখ্যা ও শো’কজ নোটিশের জবাব দিতে সুপ্রিম কোর্টে ফের হাজির হন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। তারা দু’জনই নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আদালত অবমাননার অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদন জানান। এর মধ্যে খাদ্যমন্ত্রী গত বৃহস্পতিবার নতুন করে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আবেদন জমা দিয়েছিলেন। আর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর আগের আবেদনটিই উপস্থাপন করা হয়। কামরুল ইসলামের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার। মোজাম্মেল হকের ক্ষমা চেয়ে করা আবেদনটি উপস্থাপন করেন তার ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। আদালতের নির্দেশে দুই মন্ত্রীর করা মন্তব্য পড়ে শোনান অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এরপর সকাল ১০ টা ১০ মিনিট পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করা হয়। নির্ধারিত সময়ে ফের বসে চূড়ান্ত রায় দেঢ আপিল বিভাগ।
আপিল বিভাগ বলেছে, ‘দুই মন্ত্রীকে ডাকার মাধ্যমে সারা জাতিকে জানাতে চাই, কেউ আদালত অবমাননা করলে আমরা কতটা কঠোর হতে পারি।’
আদালতের আদেশে পরে খাদ্যমন্ত্রীর আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার সাংবাদিকদের জানান, “আমরা নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আদালত অবমাননার অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদন জানিয়েছিলাম। আদালত আমাদের আবেদন নামঞ্জুর করে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে সাতদিন করে কারাদণ্ড দিয়েছেন।”
দোষী সাব্যস্ত দুজনের মন্ত্রিত্ব থাকবে কি না জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রীর আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার বলেন, “এর সঙ্গে সাংবিধানিক বিষয় জড়িত। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর বিষয়টি আমরা বুঝতে পারব।” সংক্ষিপ্ত রায়ে মন্ত্রিত্ব থাকা বা না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেনি উচ্চ আদালত।
দুই মন্ত্রীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভায়:অ্যাটর্নি জেনারেল
আদালত অবমাননার দায়ে অর্থদণ্ডে দণ্ডিত খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের মন্ত্রিত্ব থাকবে কিনা তা নৈতিকতার বিষয় উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, এ বিষয়ে মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নেবে।
আদালত অবমাননার দায়ে দুই মন্ত্রীকে অর্থদণ্ডের আদেশের পর এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি একথা বলেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সংবিধানে এ বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ নেই, তবে তারা মন্ত্রিপরিষদে থাকবেন কিনা সে বিষয়ে মন্ত্রিসভা নিদ্ধান্ত নেবে। এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করেত চাই না।
এর আগে গত ২০ মার্চ আদালত অবমাননার রুলের লিখিত জবাব দাখিলের নির্ধারিত দিন ছিল। ওই দিন সকালে আদালতে হাজির হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে জবাব দাখিল করেন দুই মন্ত্রী। কিন্তু কামরুল ইসলামের জবাব দাখিলের ওপর আদালত সন্তুষ্ট না হওয়ায় খাদ্যমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীকে আবারও সশরীরে হাজির হতে বলা হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া মীর কাসেম আলীর আপিলের রায়কে কেন্দ্র করে প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের সমালোচনা করে গত ৫ মার্চ রাজধানীতে এক সেমিনারে বক্তব্য দেন সরকারের দুই মন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও আ ক ম মোজাম্মেল হক। প্রধান বিচারপতি তাঁর আসনে থাকতে চাইলে ‘অতিকথন’ বন্ধ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন এক মন্ত্রী।
একই সঙ্গে মীর কাসেম আলীর মামলায় আপিল বিভাগের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি যেসব মন্তব্য করেছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে বাদ দিয়ে নতুন বেঞ্চ গঠন করে ওই মামলায় পুনরায় শুনানি করার আহ্বান জানান দুই মন্ত্রী।
প্রধান বিচারপতি এবং বিচার বিভাগ নিয়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বিরূপ মন্তব্যে গত ৮ মার্চ আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ বিস্ময় প্রকাশ করে। এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ মন্তব্য করে তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে নোটিশ জারি করে সর্বোচ্চ আদালত।
সর্বোচ্চ আদালত বলে, ‘গণমাধ্যমে তাদের যে সমস্ত বক্তব্য প্রচার ও প্রকাশ করা হয়েছে তা অশোভন ও অবমাননাকর। এ বক্তব্যগুলোতে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরা স্তম্ভিত। এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ হয়েছে বলে মনে করি’।