দিশেহারা সরকার

108

যুগবার্তা ডেস্কঃ দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, আর্থিক খাত থেকে শুরু করে সর্বত্রই এক বিশৃঙ্খল অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বছরের পর বছর ধরে অপরিণামদর্শী নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে এসব সেক্টরে অগ্রগতির বিপরীত যাত্রায় দিশেহারা সরকার। সরকারের মন্ত্রী, এমপি, উপদেষ্টাদের কথা ও কাজে সমন্বয় নেই। একই বিষয়ে একেকজন একেক ধরনের কথা বলেন। ব্যর্থতা ঢাকতে যেকোনো ঘটনায় দোষারোপ করা হয় বিএনপি-জামায়াতকে। কিন্তু আলোচিত কোনো ঘটনাতেই তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি। বরং খুন, অপহরণ, লুটপাটে সরকারি দলের ক্যাডারদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। আবার কোনো বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী যা বলেন, ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীও সেখানে মত ব্যক্ত করেন ভিন্নভাবে। এসব ঘটনায় সমন্বয়হীনতায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে সরকার। : সম্প্রতি জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু সংসদে বলেছেন, মন্ত্রীরা এক রকম বলেন, উপদেষ্টারা আরেক রকম বলেন। এ যেন দোতলা বাস। একতলায় মন্ত্রীবর্গ। দোতলায় উপদেষ্টারা। দোতলা বাস ধীরেই চলে। ছোট গাড়ি দ্রুত চলে। তিনি বলেন, সরকার ও প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা এবং মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের বাকচপলতা নিয়ে মানুষ বিরক্ত। সরকারের কাজের গতি বাড়ানো দরকার। : তথ্যমন্ত্রী সরকারের ব্যর্থতা স্বীকার করে বলেন, এটা ঠিক যে সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। শেয়ার মার্কেটে কারসাজি রোধ করতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা ও বাড়াবাড়িতে জনমনে হতাশা ও লোভ তৈরি হয়েছে। টেন্ডারবাজি, ছাত্রলীগের গুন্ডামিতে মানুষ বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ। ইনু আরো বলেন, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, এটা আমি বিশ্বাস করি না। বিশাল জনসংখ্যার দেশ চীন ও ভারত যদি পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে তাহলে বাংলাদেশ কেন পারবে না? পুঁজি বাজার সম্পর্কে জাসদ সভাপতি বলেন, শেয়ার মার্কেটের কারসাজি বন্ধ করা যায়, কারসাজির হোতাদের ধরে কারাগারে আটকও করা যায়। অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, শেয়ার মার্কেটকে জুয়ার আসর, ফটকাবাজার, অর্থনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলে না- এসব কথা এতদিন ধরে বললেন কেন? আমি বলি, শেয়ার মার্কেট বাপ-মা হীন না। অনাথও না। আস্থা ফেরত আনতে দোষীদের কারাগারে পাঠাতে হবে। এদিকে কিছুদিন আগে প্রাথমিক শিা সমাপনী পরীা ও অষ্টম শ্রেণিতে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীা বাতিলের কথা বলা হয় প্রাথমিক ও গণশিা মন্ত্রণালয় থেকে। অপরিণত বয়সে এবং অধিকহারে পরীক্ষাগ্রহণ শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। শিক্ষাবিদরা শুরু থেকেই এর সমালোচনা ও বিরোধিতা করছেন। গত সোমবার মন্ত্রীসভার বৈঠকে প্রাথমিক ও গণশিা মন্ত্রণালয় অষ্টম শ্রেণিতে প্রাইমারি স্কুল সার্টিফিকেট (পিইসি) পরীা পদ্ধতি চালুপূর্বক পঞ্চম শ্রেণি পর্যায়ে বিদ্যমান প্রাথমিক শিা সমাপনী (পিইসি) পরীা পদ্ধতি বাতিল করার প্রস্তাব করে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক তাতে সাড়া দেয়নি। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের এ কথা জানান। তিনি বলেন, এদিনের মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রাথমিক ও গণশিা মন্ত্রণালয়ের ‘অষ্টম শ্রেণিতে প্রাইমারি স্কুল সার্টিফিকেট (পিইসি) পরীা পদ্ধতি চালুপূর্বক পঞ্চম শ্রেণি পর্যায়ে বিদ্যমান প্রাথমিক শিা সমাপনী (পিইসি) পরীা পদ্ধতি বাতিল’-এর প্রস্তাব অনুমোদন না দিয়ে মন্ত্রিসভা তা আরো পরীা-নিরীা করে উপস্থাপনের নির্দেশনা দিয়েছে। তাই যতদিন এটা পরিবর্তন না হবে পুরনো নিয়মে (পরীা) চলতে থাকবে। শিক্ষাক্ষেত্রে এলোমেলো দশা শুধু সমাপনী পরীক্ষাতে নয়। প্রাথমিকের সমাপনী থেকে শুরু করে প্রতিটি পরীক্ষাতেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, এমনকি : ফটোকপির দোকানেও পাওয়া যায়। সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ না করে বরং যারা এই প্রকাশ করছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ফলে শিক্ষায় সরকারের এলোমেলা দশা জাতিকে ডুবাচ্ছে। : আইনশৃঙ্খলা ও জঙ্গিদমনে সরকারের এলোমেলো অবস্থা বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে বিদেশি নাগরিক থেকে শুরু করে মসজিদের ইমাম, গির্জার ফাদার, মন্দিরের পুরোহিত, পুলিশ পরিবার, সাধারণ মানুষ কেউ নিরাপদ নয়। দৈনিক নৃশংসভাবে খুনের শিকার হচ্ছেন তারা। এ সময়ে এসব হত্যার ঘটনা বন্ধ, খুনি ও জঙ্গিদের ধরতে ধারাবাহিক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। উপরন্তু এসব ঘটনায় রাজনৈতিক প্রলেপ দিয়ে ফায়দা নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের মন্ত্রী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা বিরোধী দলকে দায়ী করছেন। কিন্তু তাতে বসে নেই প্রকৃত অপরাধীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুনিদের ধরতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। জনগণ ফাহিম নামক এক যুবককে হাতেনাতে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে। মাদারীপুরে হিন্দু শিক্ষককে ছুরিকাঘাতের পর পালানোর সময় সে ধরা পড়ে বলে জানা যায়। ফাহিম ধরা পড়ার পর বতর্মান সময়ে জঙ্গিদের দ্বারা খুনের ঘটনায় অন্তরালের গডফাদাররা ধরা পড়বে বলে আশা করা হচ্ছিলো। জিজ্ঞাবাদের জন্য আদালত তাকে ১০ দিনের পুলিশ রিমান্ডে দেয়। কিন্তু রিমান্ডের একদিন পরেই পুলিশের কথিত ক্রসফায়ারে ফয়জুল্লাহ ফহিম খুন হয়। ফলে অধরাই রয়ে যায় আসল অপরাধীরা। পুলিশ হেফাজতে ফাহিম খুন হওয়ায় সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরা এলোমেলো অবস্থা আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এ ঘটনা সরকার জঙ্গি দমনে আন্তরিক কিনা, ফাহিমকে খুনের উদ্দেশ্য কী এমন অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। : চট্টগ্রামে পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যায়ও সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কথা এবং কাজের মধ্যে এলোমেলো অবস্থা ফুটে উঠেছে। হত্যার এতদিন পর হত্যার মিশনে অংশ নেয়া চারজনকে ধরার দাবি করা হচ্ছে পুলিশের পক্ষ থেকে। কিন্তু তাদেরকে দিয়ে কারা খুন করেছে পুলিশ জেনেও নাম প্রকাশ করছে না। আবার গভীর রাতে বাবুল আক্তারকে বাসা থেকে ডিবি কার্যালয়ে তুলে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেয়া হয়। আবার ডিএমপি বলছে ভিন্ন কথা। আবার মিতুর পরিবার থেকে বাবুল আক্তারকে ফাঁসানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাছাড়া এখনও পর্যন্ত বাবুল আক্তার কাজে যোগদান না করার ঘটনায় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সর্বোপরি মিতু হত্যায় এলোমেলো অবস্থায় সরকার। : সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী ২০১৬-১৭ অর্থরের যে বাজেট দিয়েছেন সেখানেও চরম এলোমেলো অবস্থা। গদবাঁধা বাজেটের আকার বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাজেট কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তার সুনির্দিষ্ট রূপরেখো নেই। বিগত অর্থবছরের বাজেটও বাস্তবায়ন হয়নি। আবার বৃহৎ এ বাজেটে ঘাটতি রেকর্ড পরিমাণের প্রায় লাখ কোটি টাকার। আবার প্রতিবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, শেয়ার বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি হচ্ছে। যা পাচার হচ্ছে বিদেশে। অর্থমন্ত্রী যাকে সাগর চুরি হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর সাথে জড়িতরা সরকারি দলের এবং প্রভারশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না বলে স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী। এভাবে চুরি ও লুটপাটে অর্থিক খাতে এলোমেলো ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। : দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না। বেসরকারি বিনিয়োগও প্রতিবছর কমছে। ফলে অর্থনীতি গতি পাচ্ছে না। গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে প্রতিবছর শত শত শিল্প কারখানা বন্ধ হচ্ছে। ফলে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না কাক্সিত হারে। বাড়ছে বেকারত্ব। এই এলোমেলো অবস্থার জন্য সরকারের নীতি ও দক্ষতার অভাবকেই দায়ীয় করছেন অর্থনীতিবিদরা। : অন্যদিকে দীর্ঘবছর ধরে বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিদেশে শ্রমবাজারও মুখ থুবড়ে পড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি বাতিল করেছে। জিএসপি ফিরে পাওয়া নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী একেক সময় একেক কথা বলছেন। কখনও তিনি বলেন, শিগগিরই জিএসপি ফিরে পাবো। আবার কখনও বলছেন, কেয়ামত পর্যন্তও সম্ভব নয়। জিএসপির শর্ত পূরণে ব্যর্থতা ও ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন ও দেশে-বিদেশি অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনই এর পেছনে বড় কারণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। আবার বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক অবনতি ও সরকারের ব্যর্থতায় বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজারও সংকুচিত হয়েছে ব্যাপকভাবে। যার প্রভাব পড়েছে বাণিজ্য ও সমগ্র অর্থনীতিতে। : সর্বোপরি সরকারের প্রায় প্রতিটি বিভাগে এখন এলোমেলো ও বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছে সরকার। যার প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে। জনজীবনে।দিনকাল