দাপায় কাঙাল, ঝাপায় কাঙালী! লাফায় বাঙাল, হাফায় বাঙালী!!

109

ইঞ্জি: সরদার মো: শাহীনঃ যে খেলায় বাংলাদেশ খেলে না, সে খেলায় সাধারণত আমি অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলকে, অপেক্ষাকৃত গরিব দেশের দলকে সমর্থন করি। কোনো দল আবার খুব বেশি ভালো খেললে অটোমেটিক্যালি তার প্রতিও সমর্থন চলে আসে। সেটা যে খেলার ক্ষেত্রেই হোক। কাউকে না কাউকে সাপোর্ট না করলে খেলা দেখে মজা পাওয়া যায় না; দেখায় জোস আসে না। আমার শোনিমেরও আসেনা।
যেমন ফুটবল। ফুটবলে আর্জেন্টিনার সাপোর্টার আমি তরুণ বয়স থেকেই। শুধু কি সাপোর্টার? যেন আর্জেন্টিনা হেরে গেলো মানে, আমিও হেরে গেলাম। ব্রাজিলের কাউকে দেখলেই গায়ে জ্বালা ধরে যেত। এ থেকে ফুটবলের রাজা পেলে কিংবা হালের নেইমার কেউই রেহাই পেত না। ভাবখানা এমন যেন আমার জনম জনমের শত্র“। সাপোর্টার হয়েছি যত না আর্জেন্টিনার কারনে, তার চেয়েও ঢের বেশী ম্যারাডোনার কারনে। এই ম্যারাডোনার কারনে সেই ১৯৮৬ তে সারা বাংলায় বিশেষ করে সব মহিলারা আর্জেন্টিনার সাপোর্টার হয়ে গেল। তবে আর্জেন্টিনাকে সাপোর্ট করে শান্তি পেয়েছিলাম জীবনে মোটে সেই একবারই। এর পর থেকে প্রতিবার বিশ্বকাপ দেখি আর হারি। সাথে কষ্টও পাই। আগে কান্নাও করতাম। এখন করি না; এখন গালিগালাজ করি। “ঘোড়ার ডিমের দল বানাইছে; আদেখলা কোচ নিয়া আইছে, একাদশ ঠিকমত সাজাইতে পারে নাই। অথবা রেফারী পার্শিয়ালিটি করছে; ইচ্ছে করেই আর্জেন্টিনাকে হারাইয়াছে ইত্যাদি!”
বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে বসে ভুলেই যাই, আমি আর্জেন্টাইন না; আমার দেশও এই টুর্নামেন্টে খেলে। ভুলবো না কেন? ফুটবলের বাছাই পর্বেই বাংলাদেশ এমনভাবে ধোলাই খায়, যেটা খুবই লজ্জার। এবং সেটা যত তাড়াতাড়ি ভোলা যায়, ততই মঙ্গল। বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবলে আমাদের উত্তেজনা এই জীবনে দেখে যেতে পারবো বলে মনে হয় না। তবে দেশীয় ফুটবলে বহু উত্তেজনাময় খেলা উপভোগ করেছি। দিনের পর দিন করেছি। সেটা অবশ্য অনেক অনেক আগের কথা।
দেশীয় ফুটবলের বাঘা বাঘা দুটো দল আবাহনী আর মোহামেডান। কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান। সারা বাংলাও দুটো শিবিরে বিভক্ত। খেলার দিন সকাল থেকেই ঢাকা শহর ছেয়ে যেত দুই দলের পতাকায়। তখন তো ছিল সাদাকালো টিভির যুগ। তাই খুঁজে খুঁজে রঙিন টিভি আছে এমন বাসা খোঁজা হত। বাসার খালাম্মাকে পটিয়ে পাটিয়ে কোনমতে জায়গা একটা ম্যানেজ করে বসে দুদলের সমর্থকেরা খেলা দেখতে বসে যেতাম। সাংঘাতিক সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক ছিল আমাদের দুদলের সমর্থকদের। খালাম্মা খেলা দেখতেন না। তবে মন ভরে আপ্যায়ন করতেন। মোহামেডানের সালাম মুর্শিদী বল নিয়ে দ্রুত পায়ে এগুচ্ছেন আর আবাহনীর স্ট্রাইকার আসলাম পেছন থেকে বাঁধা দেবার প্রাণ পন চেষ্টা করেছেন। তেলেমাখা ঝাল মুড়ি মুখে দিয়ে কুড়মুড় করে চাবাতাম আর সে সব দেখতাম। আবার একটু পর পর চায়ের কাপে চুমুক দিতাম। কখনো লবন চা, কখনো বা গুড়ের। সে স্মৃতি ভোলার নয়।
এসবই ঘরোয়া ফুটবলের ঘরে বাইরের খবর। তবে মাঠের অবস্থা ছিল ভিন্ন। মাঠ খুব গরম থাকতো। ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে ওদের খেলা হবে আর মারামারি হবে না এটা হতেই পারে না। স্টেডিয়ামে দুদলের সাপোর্টারদের জন্য নিরাপদ দূরত্বে আলাদা গ্যালারী। বসতাম মোহামেডান গ্যালারীতে। বাসায় কেউই জানতো না। একবার কঠিন মারামারিতে পড়ে গেলাম। সারা স্টেডিয়ামপাড়া লন্ডভন্ড হয়ে গেল। গাড়ী পুড়লো, বাস পুড়লো। দোকানপাটেও হাত পড়লো। কিছুটা লুটতরাজও হলো। আমি কোনমতে স্টেডিয়াম থেকে জান নিয়ে বেরুতে পেরেছি; তবে মান নিয়ে নয়। জামার হাতা নিয়েও নয়। টানাটানিতে আমার জামার একটা হাতা কেউ ছিড়ে নিয়ে গেছে। তবুও আমি খুশী। হাতা যায় যাক, গায়ে বাকী জামাটুকু তো আছে!
এ নিয়েই দৌঁড়াচ্ছি। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে হাইকোর্টের সামনে পুলিশের হাতে পরলাম। ভাবলাম বাঁচা গেল। কিন্তু ফল হলো উল্টো। জামার একহাতা নেই দেখে সন্দেহ করে আটকালো। বললো, “টাকা দে, নইলে থানায় চালান দেবো।” খুব অসহায় ভাবে বললাম, “টাকা দেবো কোত্থেকে? জামার হাতাও তো নাই। আপনি দেখেন না আমার অবস্থা! মাইর খাইয়া শেষ হইয়া গেছি!” পুলিশ ভেংচী দিয়ে বলে, “জামার হাতা নাই তো কী হইছে, পকেট তো আছে! ওইখানে হাত দে। নইলে চালান দেবো।” আমি মাথা নিচু করে কেবল দোয়া পড়ছি। পুলিশ কি আর চুপ থাকে! নিজেই পকেট হাতিয়ে যা পেল তার প্রায় পুরোটাই নিল। বাসে বসে মহা টেনশানে আছি। ঢাকা থেকে টংগী। একমাত্র টেনশান বাসাকে ম্যানেজ করা। ছেড়া জামা নিয়ে ঢুকবো কিভাবে? সারা পথ আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে এসেছি যেন ভাইয়ার সামনে না পড়ি। বাবা মাকে ম্যানেজ করতে পারবো। একমাত্র বাহার ভাইয়া বাসায় থাকলেই বিপদ। তিনি হলেন ঘরের বাঘ। তাঁর থাবায় পড়লে আর রক্ষে নেই। প্রথমে দুহাত একমুঠে ধরেই ঝটাপট ঘাড়ে পিঠে ক’খানা দেবেন। এরপর ২য় পর্ব; জামার দ্বিতীয় হাতা টেনে ছেড়ার পর্ব! মনে মনে এসব ভাবছি আর আল্লাহকে ডাকছি।
সে যাত্রায় আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছিলেন। তবে এবার রমজানের সময় লন্ডনে অনুষ্ঠিত আইসিসি ট্রফির ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ফাইনালের দিন অনেকের দোয়াই আল্লাহ কবুল করেন নাই। মসজিদে খতম তারাবী পড়ছি সবাই। এক সময় আমার খুব প্রিয় একজন অসম্ভব ভাল মানুষ আমারই পাশের জনকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, “ছয়।” পাশের জনা বললেন, “ছয় না; আট। নামাজ আট রাকাত হয়েছে।” প্রিয় মানুষটি ইশারায় তাড়াতাড়ি বুঝালেন, “ছয় রাকাতের কথা বলি নাই। বলেছি ছয় উইকেটের কথা। ছয়টা পড়ে গেছে।”
আমি বিষয়টি বেশ উপভোগ করেছি। এটুকু হতেই পারে। আমরা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার জয় পরাজয়ে উচ্ছসিত হতে পারি; উত্তেজিতও হতে পারি। তাহলে ভারত-পাকিস্তানের বেলায় সামান্য হলেও পারবো না কেন? অকাট্য যুক্তি। সীমার মধ্যে থেকে সেটুকু করাটা দোষেরও নয়। আমার প্রিয় মানুষটি সেটুকুই করেছেন। কিন্তু এর বাইরেও চিত্র আছে। ভয়াবহ সে চিত্র।
ভারত-পাকিস্তানের সেই খেলায় পাকিস্তানের সমর্থনে বাংলাদেশের পাকিস্তানপ্রেমীরা আনন্দে যখন চিৎকার করছিল, তারা পাকিস্তান ভালো খেলেছে বলে সমর্থন করছিল না। পাকিস্তানকে সমর্থন করতে গিয়ে বাঙালীরা দলবেঁঁধে প্রকাশ্যে রাস্তায় নেমে, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলতে বা পাকিস্তানের পতাকা ওড়াতে তাদের একটুও কণ্ঠ কাঁপেনি, হাত কাঁপেনি।
পাকিস্তান ৭১ সালে ৩০ লক্ষ বাঙালীকে হত্যা করে শহীদ করেছিল। মা বোনের উজ্জত লুটেছিল। তারপরও ওদের পরাজিত করে এখন আমরা স্বাধীন। অথচ আজো সুযোগ পেলেই ওরা আমাদের হেয় করে, ছোট করে। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার জন্যে সব শক্তি নিয়োগ করে। আজ পর্যন্ত ক্ষমা তো চায়ইনি, উল্টো হাম্বিতাম্বি করে। কখনো লজ্জা হয় না ওদের। দুঃখ হয়, আজ সেই স্বাধীন দেশে স্বাধীন লাল-সবুজ পতাকায় মোড়া বাঙালীদের ফাকার জামানের সেঞ্চুরি উদযাপন করতেও লজ্জা হয় না!
আর ভারত? অস্বীকার করবো না মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের কথা। আমরা চির কৃতজ্ঞ। কিন্তু তাই বলে তারাও যা ইচ্ছে তাই করবে? অন্য সব বাদ দিলাম। আজ ক্রিকেটে ভারত আমাদের মারছে না? ক্রিকেটবিশ্বে বাংলাদেশের প্রথম দুশমন হলো ভারত। তাই ভারত যার সাথেই হারুক না কেন, বাংলার মানুষ খুশি হয়। খুব খুশী হয়। সেই খুশী প্রকাশে ভারতকে নিয়ে মনের ঝাল মিটিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করে। কোলাজ কার্টুন করে। ক্রিকেটে ভারত বাংলাদেশকে নিয়ে যা করে তার বিনিময়ে বাংলাদেশীদের এরূপ আচরন হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রতিটি বাংলাদেশীর মনে এ নিয়ে যথেষ্ঠ কষ্ট আছে; ক্ষোভ আছে।
তাই বলে পাকিস্তানের সাথে হারলে সেই খুশী প্রকাশ করতে রাস্তায় মিছিল বের করে পাকিস্তানের জয়ধ্বনি করবে বাংলার মানুষ? মুখে যে যাই বলুক, যত যুক্তিই টেনে আনুক, এটা আসলে ভারতের হারে যত না আনন্দ, তার চেয়ে ঢের বেশী পাকিস্তানের জয়ে।
পাকিস্তান খেলে কাঙালীর মত। জেতার কাঙালী। দাপিয়ে খেলে বটে। তবে অবস্থা বেগতিক দেখলে ম্যাচ ফিক্সিং এর ফন্দি করে। জুয়ারীদের সাথে হাত মেলায়। বিপক্ষ শিবিরে গভীর রাতে জুয়ারী পাঠিয়ে খেলাকে নিয়ন্ত্রনে নেবার সব চেষ্টাই করে। আর ভারতও একই গোত্রীয়। খেলে কাঙালের মত। জেতার জন্য কাঙালের মত খেলে; দাপিয়ে খেলে। হয় মাঠে খেলে জিতবে, না হয় ম্যাকানিজম করে আইনের মারপ্যাচে বিরোধী পক্ষকে দূর্বল করে কৌশলে জিতবে। জিততে হবেই, তা যে করেই হোক। নাহলে ওদের উজ্জত পাংচার হয়ে যাবে যে।
অথচ এসব দেখে বুঝেও বাংলার দর্শক তথা আপামর জনগণ লাফালাফি করে এই দুই দেশকে নিয়ে। পুরো দেশ আবাহনী মোহামেডানের মত খুব নিরবে ভারত পাকিস্তান নামে দুটো শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায়। ব্রাজিল আর্জেন্টিনার মত পতাকা নিয়ে বাইরে আসতে পারে না বটে। তবে ড্রয়িং রুমে গরম করে ফেলে। মাঠে খেলে দাপায় ভারত, ঝাপায় পাকিস্তান! আর টিভির সামনে বসে হালুম হুলুম করে লাফায় বাঙালী; হাফায় বাঙালী!! হায়রে অভাগা বাঙালী!!!-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা