দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এখন পরাশক্তি!

11

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন:

গরীব, গরীব আর গরীব! জন্মের পর থেকেই শুনে আসছি আমরা গরীব। আমরা মানে; আমার পরিবার, আমার দেশ ও জাতি। আমাদের পরিবার গরীব; এটা মানতে সমস্যা নেই। কিন্তু একটা দেশ গরীব, গরীব গোটা জাতি; এটা মেনে নেয়ার চেয়ে কষ্টের আর কি আছে! মেলা কষ্ট। কষ্ট যেমন, অবস্থাও তেমনি ছিল বেগতিক। তবে পারিবারিক ভাবে আমাদের ধনী হবার সুযোগই ছিল না। বিশেষ কোন জাতও ছিল না আমাদের। শুধু ছিল জাতে ওঠার চেষ্টা। জাতে থাকার চেষ্টা।

অবশ্য মোটামুটি ভাবে জাতে থাকার জন্যে জন্মসূত্রে আমাদের একটা পরিচয় ছিল। তকমা লাগানো পরিচয়। আমাদের ছিল মধ্যবিত্তের তকমা। কে বা কারা দিয়েছিল তা না জানলেও তকমাটা মন্দ ছিল না। গরীবের এই মধ্যবিত্ত নামের তকমাটাই সম্বল, তকমাটাই স্ট্যাটাস। একটা শুকনো স্ট্যাটাস। সকালের নাস্তায় শুকনো রুটি চায়ে ভিজিয়ে দিনের বাকী দুবেলা মোটা চালের ভাত দিয়ে পেট ভরে খেতে পারার দলটিই মধ্যবিত্ত।

মধ্যবিত্ত চা খেতে খুব পছন্দ করতো। ছোট ছোট কাপে অল্প অল্প চা। চা খেয়েও মজা, দেখিয়েও মজা। ব্রিটিশসাম্রাজ্য উত্তর বাঙালী মধ্যবিত্ত সমাজ এই এক চা দিয়েই ব্রিটিশভাব ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। তবে সেই চা কালেভদ্রে চিনি মিশ্রিত দুধ চা হলেও সকল সময় হতো না। চিনি থাকলে দুধ থাকতো না, কিংবা দুধ থাকলে চিনি। বেশি হতো গুড়ের চা। মুখে মুড়ি পুড়ে চায়ে চুমুক দিয়ে দিয়ে খাবার সে কী ফিলিংস! মুড়ির সাথেও ফিলিংস, ফিলিংস শুকনো রুটির সাথেও। বিত্তের ত্রিসীমায় না থাকা মধ্যবিত্তের ফিলিংস! মন্দ কি!

মোটেও মন্দ নয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রথম দিকে এমনিই ছিলাম আমরা। স্বাধীনতা পাবার আগের দিনগুলো আরো জটিল ছিল। পাকিস্তান আমল। পাকিস্তানীদের দালালী করা কিছু পরিবার ছাড়া পুরো দেশটাই ছিল মধ্যবিত্তের দেশ। মানসিকতায় আমরা ছিলাম শতভাগ মধ্যবিত্ত। বড় গৃহস্থ পরিবার। গোলাভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু। আর পুকুর ভরা মাছ। কিন্তু কালেভদ্রে সেই মাছ ধরে খাওয়া হতো। বিশেষ করে জামাইজন এলে। আর মাংস? ওটা ছিল বছরে দুই ঈদের খাবার।

এক রকমের যাপিত জীবন! তবে জীবন যেমন তেমন; সেই জীবনে স্বপ্ন ছিল। কিন্তু কোন প্রতিযোগিতা ছিল না। বড় হবার কিংবা ধনী হবার নোংরা প্রতিযোগিতা। অথচ সময়ের বিবর্তনে পাল্লা দিয়ে নোংরা প্রতিযোগিতায় ধনী হতে দেখেছি ক্ষমতায় থাকা মানুষদের। কোন না কোনভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা মানুষেরা দিনকে দিন কেবল ধনীই হয়েছেন। রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা মানুষ বলতে শুধু পলিটিশিয়ানগণকে মিন করছি না। বরং ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাদের চেয়েও বেশি ধনী হয়েছেন সরকারী পিয়ন থেকে সর্বোচ্চ আমলা পর্যন্ত। এই আমলের মত সেই আমলেও আমলারা সাধারণ কিংবা অধঃস্তনদের দেখতেন কামলাদের মত করে। মনে পড়ছে আমিনুল ইসলাম সাহেবের কথা। বিশিষ্ট আমলা। সিনিয়র নন, জুনিয়র। পদোন্নতি পেয়ে সবে সহকারী পরিচালক হয়েছেন। পদবীটাও ঈর্ষনীয়; কন্ট্রোলার। সমাজ কল্যাণ বিভাগের ভবঘুরে আশ্রমের কন্ট্রোলার। ব্রিটিশ লর্ডের মত অবস্থা আর কি। ঢাকা থেকে ভিজিটে এসেছেন ধলা ভবঘুরে আশ্রমে ব্রিটিশ লর্ডের মত করেই।

মাথায় ক্যাপ পড়েছেন। হাতে ছোট লাঠি। একবার ডান হাতে, একবার বামে। আইয়ুব খানের মত। সদ্য স্বাধীন দেশের নব্য আইয়ুব খান। পাকিস্তানের প্রবল প্রতাপশালী সামরিক শাসক। ঠিক তার মত করেই হাতে থাকা লাঠিটি চপাশ চাপাশ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পুরো জমিদার বাড়ি প্রদক্ষিণ করছেন। সারা বাড়িতে থমথমে অবস্থা। আজ কার উপর দিয়ে কতটুকু ডলা যায় কে জানে। এক পর্যায়ে পুকুরের কোণায় পেয়ে গেলেন হেলিম কাকা (ছদ্মনাম) কে।

হেলিম কাকা ওয়ার্ডার। মানে সিকিউরিটির লোক। গায়ে হালকা পাতলা অফিসিয়াল খাকি পোশাক। নায়কের মত দশাসই চেহারা। কেবল পায়ে বুট ছিল না। সেই কাকাকে দেখা মাত্রই খান সাহেব ক্যাচাং ক্যাচাং কয়েক ঘা বসিয়ে দিলেন। পায়ে বুট না থাকার কারণেই বেত্রাঘাত। কাকার হাতের বাহু এবং পিঠ পুড়ে উঠলো। উফ করে কাতরে উঠলেন। লজ্জায় মুখ লাল টকটকা হলো। এমনিতেই ফর্সা মুখ। লাল হলে পরিষ্কার বোঝা যায়। কাকা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সবার সামনেই ঘটছে এসব। কারো মুখে রা নেই। প্রতিবাদ করার সাহস নেই। কে দেখাবে সাহস? ঢাকা থেকে আসা বড় আমলা! ধলার চাকর বাকররা (!) এত সাহস কোথায় পাবে? আমলা বাবু আরো আগ্রাসী হলেন। কড়া হুকুম দিলেন একের পর এক গায়ের সব পোশাক খোলার। খোল, তাড়াতাড়ি খোল। শার্ট খোল, প্যান্ট খোল। প্যান্ট খোলানোর বিষয়টি বাঙালী বাবুরা পেয়েছেন ব্রিটিশ আর পাকিস্তানীদের কাছ থেকে। কথায় কথায় প্যান্ট খোলাতেন। কেন খোলাতেন, কি দেখতে খোলাতেন; কে জানে। এত জিনিস থাকতে ওরা বাঙালীর প্যান্টের নীচে কি দেখতে চাইতেন, কে জানে!

কন্ট্রোলার বাবুও জানতেন না যে, অফিস থেকে সরকারী বুট সরবরাহ না থাকার কারণে হেলিম কাকা বুট না পড়েই ডিউটি করছিলেন। সরকার তখন বুট পাবে কোথায়? বাঙালীর ভাতের ব্যবস্থা করতেই সরকারের দম আসে আর যায়। বুট নিয়ে ভাবার সময় কোথায়! এটা কর্তাবাবু মানতে নারাজ। ওসব দেখা কর্তাবাবুর কাজ নয়। কর্তাবাবুর কাজ কর্তাগিরি করা। শেষমেষ সবার সামনে হেলিম কাকার গায়ের পোশাক খুলিয়েই ছাড়লেন।

এ ধরণের প্রাকটিস এখন আর তেমনটা দেখি না। তেমনটা শুনিও না। আজ দিন বদলেছে। হয়ত এ কারণেই বদলেছেন কর্তাবাবুরাও। নিশ্চিত তারা আগের মত নেই। হেডাম থাকলেও ধরণ পাল্টেছেন। পাল্টাতে বাধ্য হয়েছেন। বাধ্য হয়েছেন খাসিলতে পরিবর্তন আনতেও। শুধু তারা নন। সব কিছুতেই বাংলাদেশ ঘুচিয়েছে তার অবস্থান। খোলস পাল্টে বেরিয়েছে নবরূপে; নব সাজে। গরীবের খাতা থেকে নাম কাটিয়ে তুলেছে মাঝারো ধনীর খাতায়।

এটা অবশ্য কর্তাবাবুদের কৃতিত্ব নয় মোটেও। এটা পুরোপুরি বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের কৃতিত্ব। একটি রাজনৈতিক সরকারের সদিচ্ছায় গোটা দেশটা যে বদলে যেতে পারে, তার প্রমাণ তো এখন দৃশ্যমান। চারিদিকে শুধু উন্নয়নের জয়ধ্বনি। সর্বত্র জয়জয়কার। হয়ত দেশে পুঁজিবাদীদের তথাকথিত গণতন্ত্র নেই, নেই সাম্যবাদীদের তথাকথিত সাম্যের রাজনীতি। না থাক। কিন্তু উন্নয়নতো আছে। গণতন্ত্র যদি হয় দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে, তাহলে এটা তো বলাই যায় যে লক্ষ্য পুরোপুরি হাসিল হচ্ছে।

বাংলাদেশ শক্তিশালী হচ্ছে। এবং শক্তির বার্তা জানান দিচ্ছে বিশ্বব্যাপী। গেল কয়েক মাসে দেশের গন্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশ তার আশাতীত উন্নয়নের আনুষ্ঠানিক বার্তা পাঠিয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহে। প্রতিবেশী বলতে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মিয়ানমার এবং চীন। সঠিক সময়ে বাংলাদেশ সঠিক কাজটিই করছে। চেষ্টা করছে দক্ষিণ এশিয়ায় নেতৃত্ব দেবার; পরাশক্তি হবার।

দক্ষিণ এশিয় পররাষ্ট্রনীতি পাল্টে দিয়ে সব প্রভাব বলয় থেকে দূরে থাকছে বাংলাদেশ। বেইজিং এর হুমকি বা দিল্লির তোষণকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজস্ব ভারসাম্যনীতি গ্রহণ করেছে ঢাকা। বাংলাদেশে চলমান বেশ কিছু মাল্টিবিলিয়ন ডলারের মেগা প্রকল্পে কাজ করছে চীনা কোম্পানি। কিন্তু এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে দেয়নি, যেনো কখনই বড় দেশটির সামনে বাংলাদেশকে হাঁটু মুড়ে বসতে হয়। চীনের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও বাংলাদেশ সোনাদিয়া বন্দর প্রকল্পকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়নি। অর্থাৎ চীনকে প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া হয়নি।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, এর পেছনে ছিলো ভারতের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা। কারণ নয়াদিল্লি শুরু থেকেই এর বিরুদ্ধে ছিলো। একই সঙ্গে বাংলাদেশ চীনকে সাবমেরিন ঘাঁটি তৈরির কাজ দিয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতের আপত্তি ধোপে টেকেনি। মজার ব্যাপার হলো, এই বন্দর বাতিল করেও বাংলাদেশের লোকসান হয়নি। সোনাদিয়া থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে মাতারবাড়িতে বন্দর তৈরি হচ্ছে। যার কাজ ভারত বা চীনের কেউই পায়নি। পেয়েছে জাপান। এটিও বাংলাদেশের ভারসাম্য রক্ষার বড় প্রমাণ।

একটি উদীয়মান পরাশক্তিই পারে এরূপ ভারসাম্য রক্ষা করতে। বাংলাদেশ তাই করে দেখাচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে আরো করে দেখাবে। সেই দিন বেশি দূরে নয়, যেদিন গরীব শব্দটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মোটেও প্রযোজ্য হবে না। প্রযোজ্য হবে না বাংলার মানুষের ক্ষেত্রেও। গরীব শব্দটি স্থান পাবে বাংলার মিউজিয়ামে। গর্বিত বাঙালী শির উন্নত করে সেদিন বলতে পারবে দারিদ্রতা জয়ের ইস্পাত কঠিন এবং দূর্বার ও দুস্তর এই ইতিহাস।