তুমি আমাদের সকলকে হেফাজত করো!!!

157

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ
এবার আমার শোনিমকে সাথে করে আনা হয়নি। আগে প্রতিবারই ও আমার সাথেই ছিল। যেখানে গেছি, যাই করেছি, শোনিমকে নিয়েই করেছি। চেষ্টা করেছি সব কিছু ওকে হাতে কলমে শিখিয়ে দেবার। এবার ওকে রেখে আসাতে বড্ড একা লাগছে! শোনিম যখন পাশে থাকে, তখন মনের অজান্তেই ওর হাতের মুঠিটি শক্ত করে ধরে ওর রক্তের স্পন্দন আমি আমার রক্ত দিয়ে অনুভব করি। জন্মের দিন থেকেই ওকে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু বানাবার প্রানান্তকর প্রচেষ্টা থেকে একটিবারের জন্যেও ক্ষান্ত হইনি আমি। পারতপক্ষে ওদেরকে ফেলে একা কোথায়ও যেতে মন চায় না আমার। ছোট্ট এই মানুষটি পৃথিবীতে আসার পর ওকে ছেড়ে কোথায়ও যেয়ে আমি একটুও তৃপ্তি পাই না; শান্তি পাই না। এরপরও যেতে হয়। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনেই যেতে হয়। আজ এ দেশে, তো কাল ও দেশে!
এর আগে যতবার এসেছি কেবলই ধর্ম কর্মে এলেও এবার সৌদিতে এসেছি কর্ম এবং ধর্ম দুটো কাজেই। প্রথমে রাজধানী রিয়াদে ক’টা দিন ছিলাম কর্ম নিয়ে। ওখানে আমার কাজিনরা থাকে। ব্যবসা বানিজ্য করে বেশ ভাল আছে ওরা। হয়ত কিছুটা খারাপও আছে কেউ কেউ; তবে তেমনটা চোখে পড়েনি আমার স্বল্প সময়ে, স্বল্প পরিসরের অভিজ্ঞতায়। কাজিনরা তিনভাই বোন পরিবার নিয়ে রিয়াদ এবং দাম্মামে থাকে। সকলেই সফল ব্যবসায়ী; প্রচন্ড পরিশ্রম করে এমন একটা শক্ত অবস্থান তৈরী করতে পেরেছে ওরা। এদের একজন বাংলাদেশ থেকে তৈরী পোশাক আমদানী করে। পুরো সৌদি জুড়ে ওর মার্কেট।
বিনা ঝামেলায় এত বড় দেশে একাই নির্বিঘেœ বানিজ্য করতে পারছে। কোন সমস্যা নেই; কোন বাঁধা বিপত্তি নেই। যা কিছু সমস্যা কেবল বাংলাদেশে। প্রতিমাসে কনটেইনার ভর্তি করাতে যেয়ে ঢাকাতে পদে পদে হয়রানী সামাল দিতে হয়। হয়রানী কোথায় নেই! হয়রানী আছে কেনা মালে, মালের বিলে; হয়রানী সকলের দিলে, হয়রানী করে সকলে মিলে। ওর একটাই কথা, বেসরকারী হয়রানী সহ্য করা যায়; সরকারী হয়রানী সহ্য করা যায় না!
দিন সাতেক ওদের সাথে থেকে ১২০০ কিঃ মিঃ দূরের প্রাণের মদিনায় আসলাম দুপুরের ফ্লাইটে। সাধারণত মদিনায় সব সময় আসি গাড়ী বা বাসে করে মক্কা হয়ে। এবারই প্রথম মদিনা আসলাম মক্কা যাবার আগে।এয়ারপোর্টের সকল ফরমালিটিজ শেষ করে আকুল হয়ে আছি কখন বের হবো। মক্কা মদিনার কাছাকাছি আসার পর প্রতিটিবার মনটা এমনই আনচান করে উতলা হয়ে উঠে। গাড়ীতে বসে দূর থেকে প্রানের মদিনা শহর দৃশ্যমান হবার পরে চোখের পলক আর পড়ে না। যতই শহরের কাছে চলে আসছি ততই নূরের নবীর রওজার সবুজ গম্বুজ দেখার জন্যে অস্থির হয়ে উঠছি। এক সময় দৃশ্যমান হলো। বিশাল সুউচ্চ মিনারের মসজিদে নববী; যেখানে শুয়ে আছেন প্রানের নবী মোহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ)।
মসজিদে নববীতে যেয়ে দু’রাকাত নফল নামাজ শেষে মসজিদের ভেতরেই থাকা জমজমের পানি খেয়ে নিলাম পরপর কয়েক কাপ। আমার অস্থিরতা কিছুটা হলেও কমলো। নামাজের প্রতিটি কাতারের এপাশে ওপাশে সারি সারি সাজানো পানির ড্রাম। কোনটি ঠান্ডা, কোনটি নরমাল। মসজিদে আসা সকল মুসুল্লীর জন্য রয়েছে এই পানি পানের সুব্যবস্থা। মজার বিষয় হলো আবে জমজম বা জমজম কূপের অবস্থান ৫০০ কিঃমিঃ দূরের মক্কায়। আর আমি এই পানি পান করছি মদিনায় বসে। নিত্যদিন ট্রাক ভর্তি করে জমজমের পানি মক্কা থেকে মদিনায় আনা হয়।
মক্কা মদিনার সবকিছুর মাঝে আমার কাছে সবচেয়ে বিস্ময় লাগে এই জমজমের পানি। স্বাদের কথা বলাই বাহুল্য। নিঃসন্দেহে কিছুটা হলেও ভিন্ন স্বাদের এই পবিত্র পানি। তবে এর মোজেজা আমার কাছে অন্য জায়গায়। তিন হাজার বছর ধরে মুরুভূমির বুকে থাকা এই কূপটি জীবন্ত। কোনভাবেই এর পানি শেষ হচ্ছে না। এমন তো নয় যে দিনে দু’চার বালতি পানি এখান থেকে উত্তোলিত হচ্ছে! প্রতিদিন গড়ে প্রায় দশলক্ষ লোক মক্কায় কাবা শরীফে আর পাঁচলক্ষ মুসুল্লী মদিনায় মসজিদে নববীতে নামাজ আদায় করেন। সবমিলে প্রায় পনের লক্ষ লোক এই পানি নিত্যদিন পান করে যাচ্ছেন। এর বাইরে সব হাজীগন লক্ষলক্ষ লিটার পানি সাথে করে নিয়ে যাচ্ছেন নিজ দেশে আত্মীয় স্বজনদের জন্যে। অথচ একটি দিনের জন্যেও সামান্যতম টান পড়েনি পবিত্র এই পানির।
সবার কাছে মসজিদে নববীর ভেতরের সবচেয়ে আকর্ষনীয় জায়গা হলো রিয়াজুল জান্নাত; অর্থাৎ দুনিয়ার বেহেস্ত। রাসুল (সাঃ) এর থাকার ঘর, মানে হুজরাতেই তাঁর পবিত্র রওজা মোবারক। এই হুজরা থেকে খানিকটা দূরে তাঁর সময়ে মসজিদের যে মিম্বর ছিল এর মাঝের জায়গাটুকুই রিয়াজুল জান্নাত। প্রচন্ড ভীড়ের মাঝে চাপাচাপি করে হলেও অন্তত দু’রাকাত নফল নামাজ পড়ার জন্যে পেরেশানিতে থাকেন না এমন একজন হাজীও খুঁজে পাবেন না মসজিদে নববীতে।
প্রাণের মদিনা ছাড়তে বড় কষ্ট হচ্ছিল! শহরের প্রান্তে মিকাত মসজিদে সময় নিয়ে ওমরাহর এহরাম বেঁধে মক্কার পথে রওনা হলাম। কাবা শরীফে পৌঁছে সর্বপ্রথম কাজ হলো ওমরাহ করা। কাবাশরীফ মসজিদের বাদশাহ ফাহাদ গেইট দিয়ে “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাবল্লাইক” বলতে বলতে ভিতরে যেতে এক পর্যায়ে আল্লাহ পাকের পবিত্র ঘর কাবা দৃষ্টিগোচর হলো। যাকে কেবলা করে সারা মুসলিম জাহান সালাত আদায় করে! সুবহানাল্লাহ বলে পলক না ফেলে তাকিয়ে রইলাম ঘরটির দিকে। চোখের জলে কখন দু’গাল ভিজে উঠেছিল ঠিক মনে নেই!!
এমনিতে হজ্ব করাটা খুব কষ্টের কাজ। শরীরের উপর দিয়ে ভাল রকমের একটি ধকল যায়। তবে ওমরাহ করাটাও কম কষ্টের নয়। ৭ বার করে কাবা ঘর তাওয়াফ এবং সাফা মারওয়া সাঈ করার পর শরীর আর চলে না। ঢগ ঢগ করে কয়েক কাপ জমজমের পানি এক শ্বাসে শেষ করেও ক্লান্তি কমে না। রমজান মাস বলে হাজীগনে গিজ গিজ করছে পুরো কাবাশরীফ। বাইরে প্রচন্ড গরম হলেও ভিতরে বোঝার কোন উপায় নেই। আরামদায়ক সব ব্যবস্থা; শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত।
দ্বীনের নবী (সাঃ) যখন এখানে দ্বীন প্রচার করতেন তখন পরিবেশ এমনটা ছিল না। ঘর ছিল না, বাড়ী ছিল না! শুধু পাহাড় আর প্রচন্ড গরমের ধূধূ মরু প্রান্তর। শ্বেত পাথরের মেঝে ছিল না, মাথার পাশে ফ্রিজিং করা জমজমের পানি ছিল না, ছিল না হিমশীতল করা কোন যন্ত্র। সাহাবাদের নিয়ে তাঁরা কত কষ্ট করতেন এখানে! তাঁদের ত্যাগের মহিমায় ইসলাম সৌন্দর্য্য পেয়েছে; হয়েছে মহিমান্মিত। ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে ইসলামের পরম শান্তির আলো।
কিন্তু আজকাল সমগ্র বিশ্বেই কোথায় যেন সে সব হারিয়ে গেছে। ত্যাগের ইসলাম আর চোখে পড়ে না। ভোগের ইসলামে হারিয়ে যেতে বসেছে ত্যাগের ইসলাম। হানাহানির ইসলামে শান্তির ইসলাম বিলুপ্ত প্রায়। যে ইসলামে সাম্প্রদায়িকতার সামান্যতম জায়গা নেই, সেই সাম্প্রদায়িকতাই যেন বারবার সুযোগ খুঁজছে ইসলামকে গ্রাস করতে। এসব ভাবলে বড্ড কষ্ট হয়!
ইসলামের অবমাননা কথাটি বিশ্বে বিশেষ করে বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত একটি কথায় পরিনত হয়েছে আজকাল। ইসলাম নিয়ে কাউকে কথাবার্তায় একটু অসাবধানী হতে দেখলেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে ইসলাম রক্ষায়। ভাবটা এমন যে, জান দেবো, জান নেবো; তবু ইসলামের ক্ষতি হতে দেবো না। কথাবার্তায় আমরা সব সময় খুবই সতর্ক এবং ইসলামের প্রতি অঢেল শ্রদ্ধা উতলে পড়ে। কিন্তু কর্মের বেলায় ঠনাঠন। এখানে ইসলাম তথা ধর্মের যে মারাত্মক অবমাননা হয় সেদিকে লক্ষ্য নেই। আমরা বুঝে হোক বা না হোক, নিজেরাই কঠিন ভাবে বর্তমানে ইসলামের অবমাননা করছি। অবমাননা করছি আমরা প্রতিনিয়ত; আমার ধর্মকে সঠিকভাবে পালন না করে, ধর্মকে অপব্যবহার করে। ইসলামিক বিশ্ব আজ সত্যি এক মহা মসিবতের মাঝে আছে।
আমার মত সামান্য মানুষ এই মসিবতে কী আর করতে পারে! প্রচন্ড ভীড়ের মাঝে কাবা ঘরের খোলা চত্বরে মাকামে ইব্রাহীমের পেছনে দাঁড়িয়ে দু’রাকাত ওয়াজিব নামাজ শেষে দোয়া করা ছাড়া এই অধমের আর কীইবা করার আছে! আমার বিশ্বাস আমার মত পুরো দেশবাসীও যে যেখানেই থাকে, ঈদুল ফিতরের এই আনন্দঘন সময়ে সারাক্ষণ কেবল এই দোয়াই করেছে, হে আল্লাহ! তুমি মহান, তুমি সর্বশক্তিমান! তুমি আমাদের সকলকে হেফাজত করো! আমাদের প্রতিটি দিনকে ঈদের দিন বানিয়ে দাও! ঈদ মোবারক!!