তিস্তা ব্যারেজে কমেছে পানির প্রবাহ, জেগেছে চর

89

যুগবার্তা ডেস্কঃ ভারতের উজানে ব্যারেজের গজলডোবা অংশের সবগুলো গেট বন্ধ করে দেওয়ায় তিস্তা নদীর পানি প্রবাহ একেবারে নেমে এসেছে। গত ৩ দিন ধরে তিস্তা ব্যারেজ এলাকার পানির প্রবাহ মাত্র এক হাজার কিউসেক। ব্যারেজের সামনেই বিশাল এলাকা জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে চর। এক সময়ের প্রমত্তা তিস্তা শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই খালে পরিণত হয়েছে।
এদিকে তিস্তা নদীর পানি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসার কারণে ব্যারেজ কমান্ড এলাকার ২ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দিতে পারছেন না কৃষকরা। ফলে পানির অভাবে জমি তৈরি করতে না পারায় এখনও অনেক এলাকায় কৃষকরা জমিতে ইরি বোরো ধানের চারা রোপন করতে পারছেন না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এবার বারো মৌসুমে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে পানি সরবরাহ করা যাবে। তাও রেশনিং পদ্ধতিতে। বাকি জমিতে সেচ যন্ত্র বসিয়ে জমি তৈরি, চারা রোপন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন প্রকৌশলী জানান, তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি গেট খুলে দেওয়ার পরও ব্যারেজের সামনে বিশাল চর পড়েছে। এছাড়া পুরো নদীতে অসংখ্য চর জেগে ওঠায় নৌকার পরিবর্তে পায়ে হেঁটে নদী পারাপার করছে হাজার হাজার মানুষ।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে মূলত সেচ সুবিধা দেওয়ার জন্যই তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ করা হয়েছে। সেই সাথে ব্যারেজ থেকে শুরু করে রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়া জেলার ২ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে খাল খনন করা হয়েছে। কিন্তু শুকনো মৌসুমের শুরুতেই ভারত তাদের উজানে গজলডোবা বাঁধ নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে রেখেছে। ফলে বাংলাদেশ তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রতিবারই এই শুষ্ক মৌসুমে ভারত পানির প্রবাহ বন্ধ করে রাখলেও গত বছর এ মৌসুমে পানির প্রবাহ প্রায় ২ হাজার কিউসেক ছিল। কিন্তু এবার ফেরুয়ারি মাসেই তা এক হাজার কিউসেকে নেমে এসেছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে মার্চ ও এপ্রিলের দিকে পানি প্রবাহ ৩শ’ কিউসেকে নেমে আসতে পারে। ফলে তিস্তা ব্যারেজের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার একর জমির বীজতলা মরে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ ঠিক রাখা ও সেচ সুবিধা দিতে কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ হাজার কিউসেক পানি থাকলেই চলে। কিন্তু ভারত তাও দিচ্ছে না। অন্যদিকে তিস্তা নদী সংলগ্ন বালু মাটি এলাকা, বিশেষ করে লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা, কালিগজ্ঞ, নীলফামারী জেলার জলঢাকা, কিশোরীগজ্ঞ, ডোমার, ডিমলা, রংপুর সদর, তারাগঞ্জ, বদরগজ্ঞ উপজেলার কৃষকরা তিস্তা নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। তারা দীর্ঘ দিন ধরে স্বল্প খরচে পানি জমিতে দিয়ে বিশেষ করে বোরো ধান চাষ করে আসছে। কিন্তু এবার মৌসুমের শুরুতেই ব্যারেজ সংলগ্ন জলঢাকা উপজেলার এস৮০ খালে এতটকু পানি নেই। পাউবো সেই খালে পানি সরবরাহ করতে পারেনি। একইভাবে চাপানির ৪০ নম্বর খালেও পানি সরবরাহ করতে পারছে না পাউবো। ফলে নীলফামারীর জলঢাকা, কিশোরীগঞ্জ ও লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার ৪৫ ভাগ কৃষক এখন পর্যন্ত জমিতে চারা রোপন করতে পারেনি। রোপন করা চারা পানির অভাবে মরে যাচ্ছে।
ওই এলাকার কৃষক মমতাজ উদ্দিন, আলেফ উদ্দিন, সালাম, জহিরুলসহ অনেকে জানালেন, বালুমাটির এলাকা হওয়ার কারণে এখানে শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে পানি নিয়ে ধান চাষ করা সম্ভব নয়। কারণ ওই পানি এক ঘণ্টার বেশি থাকে না। এতে খরচও পড়ে অনেক বেশি। আর নদীর পানি প্রয়োজন মতো পাওয়া যায় বলে কোনও সমস্যা হয় না। এমন অবস্থায় তিস্তা নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
তিস্তা ব্যারেজের কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার ব্যারেজ এলাকায় পানির প্রবাহ ছিলো এক হাজার কিউসেকের কাছাকাছি। নুর ইসলাম নামে দায়িত্বরত একজন কর্মকর্তা বিষয়টি স্বীকার করে আর কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ ব্যাপারে তিস্তা ব্যারেজের প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান জানান, পানির প্রবাহ কমপক্ষে ৩/৪ হাজার কিউসেক থাকলে কোনওরকমে রেশনিং পদ্ধতিতে সরবরাহ করা যাবে। এ জন্য ভারত সরকারের সাথে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা করা দরকার। তারা আপাতত তাদের গজলডোবা ব্যারজের কয়েকটি গেট খুলে দিলেই পানি সমস্যা কিছুটা হলেও লাঘব হবে। তিনিও জানান, তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় পানির প্রবাহ এক হাজার কিউসেকে নেমে এসেছে।
এদিকে ভারত একতরফা পানির প্রবাহ বন্ধ করে রাখায় রংপুর অঞ্চলের হাজার হাজার জেলে ও মৎস্যজীবী বেকার হয়ে পড়েছেন। সেই সাথে পুরো তিস্তা নদী এখন মরা খালে পরিনত হয়েছে। এর ফলে জীববৈচিত্রে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। চুক্তির মাধ্যমে তিস্তার পানি আদায় করতে না পারলে পুরো রংপুর অঞ্চলসহ আশপাশের ৮ জেলা মরুভূমিতে পরিণত হবে।
এদিকে তিস্তা নদীর ন্যায্য হিস্যার দাবিতে সোমবার রংপুর থেকে তিস্তা ব্যারেজ অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল- বাসদ। ব্যারেজ এলাকায় সমাবেশে বক্তব্য দেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা শুভাংসু চক্রবর্তী। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ভারত সম্পূর্ণ একতরফা তিস্তার পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে হাজার হাজার কৃষককে পথে বসিয়েছে। পানির অভাবে তারা ধানের চারা রোপন করতে পারছেন না। অথচ সরকার এখন পর্যন্ত তেমন কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। তিনি তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে ভারতকে বাধ্য করার জন্য জাতিসংঘের সহায়তা নেওয়ার দাবি জানান।