তিন পার্বত্য জেলায়:২৪ বছরেও ভূমি জরিপ ও আদমশুমারি হয়নি

ডেস্ক রিপোর্ট তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ২৪ বছরেও ভূমি জরিপ ও আদমশুমারি হয়নি। সরকারের সব সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার পরও ভূমি জরিপ ও আদমশুমারিতে শুরু থেকেই বাধা দিয়ে আসছে পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ।

একবার ভূমি জরিপের কাজ করতে গেলে জেএসএসের সন্ত্রাসীরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অপহরণ করে নিয়ে যায়। এ কারণে ভূমি জরিপ ও আদমশুমারি বন্ধ রয়েছে। অথচ দেশের ৬১টি জেলার সব উপজেলায় ভূমি জরিপ কার্যালয় আছে। সেখানে এসি ল্যান্ডের নেতৃত্বে ভূমিসংক্রান্ত সব কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু ব্যতিক্রম পার্বত্য তিন জেলায়। বাংলাদেশের ভূখণ্ড হয়েও সেখানে ভূমি জরিপ ও আদমশুমারি বন্ধ রয়েছে। পাহাড়িদের ৯০ ভাগ বাসিন্দা এটাকে মেনে নিতে পারছেন না। তাদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে।

স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, পূর্বের মতো অবস্থা এখন আর পার্বত্যাঞ্চলে নেই। পার্বত্যাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এখন ভূমি জরিপ কাজ শুরু করতে পারে সরকার। একই সঙ্গে পরিসংখ্যান ব্যুরো আদমশুমারিও চালাতে পারে।

পার্বত্যাঞ্চলে পাহাড়ি ও বাঙালির জনসংখ্যা প্রায় সমান। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি নিয়ে জটিলতা নিরসন হয়নি এখনো। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১-এর সংশোধিত আইন (২০১৬) পাশ হওয়ার পর তিন পার্বত্য জেলা থেকে ভূমি কমিশন বরাবর ২২ হাজার ৯০টি আবেদনপত্র জমা পড়ে। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের ষষ্ঠ বৈঠক হয়। একই বছরের ২৩ ডিসেম্বর কমিশনের সপ্তম বৈঠকে আবেদন যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কমিশন তা করেনি। এ নিয়ে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। একই কারণে বর্তমান ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের প্রতি বাঙালিদের তেমন কোনো আস্থা নেই।

তাই নতুন বিধিমালা তৈরির পূর্বেই ভূমি কমিশনের কার্যক্রম শুরু হলে তাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যা ভবিষ্যতে দাঙ্গায় পরিণত হতে পারে। এ কারণে বিধিমালা প্রণয়নের পূর্বেই ভূমি কমিশনে আবেদনকৃত অভিযোগসমূহ যাচাই-বাছাই কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখা প্রয়োজন বলে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা জানান। এছাড়া খাগড়াছড়িতে প্রধান ভূমি অফিস এবং রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে শাখা অফিস প্রতিষ্ঠা এবং অবিলম্বে তা চালু করা হবে বলে স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে ভূমি কমিশনের বর্তমান বিধিমালায় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে কমিশনের সচিবসহ অন্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পদসমূহের ক্ষেত্রে উপজাতীয় ব্যক্তিদের নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। যা কমিশনের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। অপরদিকে আশির দশকে তৎকালীন শান্তিবাহিনীর অপতত্পরতার কারণে ১৯৮৬ সালে বাঙালিদের গুচ্ছগ্রামসমূহে স্থানান্তর করা হয়। কালের পরিক্রমায় বাঙালিদের ফেলে যাওয়া অধিকাংশ জমি উপজাতীয়রা দখল করে নেয়। খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার ৫ নম্বর বাবুছড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত সোনামিয়া টিলা নামক স্থানে ৮১২ ভুক্তভোগী বাঙালি পরিবারের জমি উপজাতীয়দের দখলের ঘটনা এর মধ্যে অন্যতম।

২০১৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সোনামিয়া টিলায় ৮১২টি বাঙালি পরিবারের সরকার বরাদ্দকৃত (১৯৮১-৮২) খাস ভূমির বেশ কিছু অংশ দখল করে ইউপিডিএফের (প্রসিত) প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মদতে স্থানীয় উপজাতীয়রা কৌশলে বসতি গড়ে তোলে। বিষয়টি বাঙালিদের নজরে এলে বিভিন্ন সময়ে তারা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করার পাশাপাশি তাদের নামে বরাদ্দকৃত ভূমিতে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক এবং জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে ভূমি উদ্ধারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা প্রদান করে। কিন্তু এখনো কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালি ব্যক্তিবর্গ নিয়মিতভাবে আয়কর প্রদান করে সরকারের রাজস্ব খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয় ব্যক্তিবর্গ আয়কর প্রদান করেন না। এতে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি উপজাতীয় ব্যক্তিবর্গ অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং মুদ্রা পাচারসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।-ইত্তেফাক