তাহলে সংলাপ সমঝোতা রাজনীতি থেকে বিলুপ্ত হচ্ছে

যুগবার্তা ডেস্কঃ আগেও তেমন কোনো সংলাপ ও সমঝোতার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি বলে যে ভবিষ্যতেও তা হবে না এটা মেনে নেওয়া যায় না। রাজনৈতিক সংকট নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেদের মধ্যে এধরনের সংলাপের মধ্যে দিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারে তাহলে নতুন রাজনৈতিক ধারা সৃষ্টি হতে বাধ্য। কিন্তু রাজনীতিবিদরা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক দোষারোপ ও একে অপরকে নির্মূলের রাজনীতির মধ্যে ফেলে এমন এক দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান দেওয়াল তৈরি করে রেখেছে যা দুর্ভেদ্য হয়ে উঠেছে। এর ফলে রাজনীতির বাইরের ক্রীড়ণকদের সুবিধা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। তারা অনায়াসে রাজনীতির ওপর প্রভাব বলয় সৃষ্টি করতে পারছে। এজন্যে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে যে সুযোগ ও সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল তা একপেশে ও পুরোনো বৃত্তের রাজনীতির মধ্যে পড়ে খাবি খাচ্ছে। সেই সার্চ কমিটি, পরে আইন তৈরি ইত্যাকার বিবেচনায় রাজনীতির স্টেশনের যে ট্রেন মিস করছে জনগণ তাতে তার ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার একটা পাকাপোক্ত ব্যবস্থা হচ্ছে না।
এখন যদি সংলাপ সমঝোতা শুধু লোক দেখানো কিংবা নির্বাচনী বৈতরণী পার হবার জন্যে কেবল প্রয়োজন হয় তাহলে এর একটা শক্ত পাটাতন দাঁড় করানো অসম্ভব। অসম্ভব এ কারণেই এসব বিষয় নিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছা দেখা যাচ্ছে না। একধরনের বোঝাপড়া হয়ে গেছে রাজনীতিতে এবং তা হচ্ছে ক্ষমতায় টিকে থাকা। এধরনের রাজনীতি ভোটের অধিকার, বিরোধীদলের সংসদে প্রাণবন্ত অংশগ্রহন, সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা ও সরকারের সঙ্গে বিরোধীদলের সত্যিকার ভূমিকায় সরকারের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ হয়ে ওঠা নিশ্চিত করতে পারছে না।
দিন কয়েক আগে ভ্যাটিকানে পোপ ফ্রান্সিস মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসীন হওয়ার ব্যাপারে এখনি কোনো বক্তব্য না দিয়ে অপেক্ষা করে মূল্যায়ন করার পরামর্শ দিয়েছেন। গ্লোবাল ভিলেজের অংশ হিসেবে আমরা যদি লক্ষ্য করি পোপের বক্তব্য তাহলে নিজেরা কোথায় আছি তার সার্বিক সমীকরণ নিয়ে একটা ভাবনা তৈরি হতে পারে। পোপ বলেছেন, হিটলার ক্ষমতা ছিনিয়ে নেননি। তিনি নির্বাচিত ছিলেন এবং নির্বাচিত হয়েই তিনি তার জনগণকে ধংস করেছেন। এখন আমাদের লক্ষ্য করা উচিত হিটলার তা কিভাবে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে থেকেই বিপুল জনপ্রিয়তার মধ্যে দিয়ে তা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এমন কোনো ধরনের রাজনৈতিক বাতাবরণ আমাদের রাজনীতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে কি না তাও ভাবার বিষয়।
রাজনীতিতে রাজনীতি নেই। এ কথা অনেক পুরোনো হয়ে গেছে। তাহলে রাজনীতি গেল কোথায়? আর সেই শূন্যস্থান কারা পূরণ করছে। কি সরকারি দল, কি বিরোধী দল এখন পর্যন্ত কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় একে অপরের সঙ্গে অংশগ্রহণমূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেনি। এধরনের সম্পর্ক স্থিতিশীল হওয়ার আগে সামরিক শাসন কিংবা গণতন্ত্রের মোড়কে অগণতান্ত্রিক শাসন রাষ্ট্রক্ষমতায় পাকাপোক্ত হয়ে বসায় রাজনীতির ভগ্নাংশ কখনো শক্তিশালী প্লাটফরমে দানা বেঁধে উঠতে পারেনি। তাহলে রাজনৈতিক দলের কি এতসব দায়িত্ব রয়ে গেছে নাকি যারা রাজনীতির দর্শন তৈরি করে দেন, রাজনীতিকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করেন তারা কি করেছেন, তারা কি কোনো লেজুরবৃত্তির মধ্যে পড়ে যাওয়ায় তাদের ভাবাদর্শ গায়েব হয়ে গেছে। জাতীয় রাজনীতি কি তাদের সেই দর্শন থেকে বঞ্চিত হয়েছে?
এর ফলে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সমাজ কখনোই কাজ করেনি। যা হয়েছে তা হচ্ছে নির্বাচন এলেই যেন তেন প্রকারে ভোটারের সমর্থন কব্জা করে ক্ষমতায় আরোহন করা। তারপর ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পথ পরিক্রমাগুলো রাজনীতির বাইরে নির্দেশিত হওয়ায় এনিয়ে যে হাঙ্গামা হয়েছে তাতে ভোটাধিকার, জনগণের সমর্থনে ও ইচ্ছায় জনগণের সরকার গঠনের প্রক্রিয়া অবশিষ্ট থাকছে না। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে বিরোধী দল রাজনীতি থেকেই ছিটকে গেছে।
রাজনীতির এ বেহাল অবস্থা থাকলে আইনের শাসন, নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, রাষ্ট্র সম্পর্কে তারও ভবিষ্যত দূরদর্শিতা ও দর্শন প্রয়োগের স্থান একেবারেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। মত প্রকাশ করা সম্ভব ততটুকুই যাতে গায়ে আঁচর না লাগে। এতে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। রাজনৈতিক নেতৃত্বের এ নিয়ে মাথাব্যথা হয়ত আছে কিন্তু দিকদর্শন ভিত্তিক দিক নির্দেশনা পাচ্ছে না কর্মীরা। মামলার পর মামলায় পালিয়ে কর্মীদের অবস্থা দিকভ্রান্ত। আর যারা সরকারি দলের সমর্থক তারা আছেন বহাল তবিয়তে। তারা এধরনের বহাল তবিয়তে থেকে আখের গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। মাঝখান থেকে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি যে লাউ সেই কদু হয়ে আছে।
ফলে জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশ রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়েছে। রাজনীতি সম্পর্কে তাদের বীতশ্রদ্ধা থাকলেও তা তারা প্রকাশ করতে চান না। এতে একধরনের ভয়ানক দূরত্ব তৈরি হচ্ছে মানুষের সঙ্গে রাজনীতির। রাষ্ট্রের কাছে জনগণের চাওয়া আছে কিš‘ শক্তিশালী কোনো সামাজিক চুক্তি না হয়ে ওঠায় তার সে চাওয়া আদায় করতে পারছে না।
এমন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে যে নিজের সমর্থিত দল যেন তেন প্রকারে ক্ষমতায় গেলে বা ক্ষমতায় টিকে থাকলে নিজেও তা থেকে সুবিধা আদায় কিভাবে নিশ্চিত করা যায় সেই প্রচেষ্টায় বুঁদ হয়ে থাকা। এই সর্বনাশা ঘেরাটোপে পড়ায় জনগণের রাজনীতিতে শিক্ষিত হয়ে ওঠার পথপরিক্রমাই বন্ধ হয়ে গেছে।
অথচ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সেই সব আন্দোলন ও সংগ্রামের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, কার্যকর ও একটি স্থিতিশীল গণতন্ত্রের মধ্যে এমন এক উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা যেখানে বৈষম্য কখনোই উন্নয়নকে চেটেপুটে খেয়ে ফেলতে পারবে না। এমন এক লক্ষ্য অর্জনে প্রিয়মাতৃভূমির স্বাধীকার আদায়ে এদেশের মাটিতে শহীদের বীরত্ব গাঁথা এখনো কানপাতলে শোনা যায়। তা নতুন প্রজন্মকে শুনিয়ে তাদের আগামীদিনের জন্যে রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত করে তুলতে না পারলে আরো দুর্বিষহ পরিস্থিতির জন্যে অপেক্ষার কোনো বিকল্প নেই।-আমাদের সময়.কম