তারেকের দিকে চেয়ে আছে বিএনপির তৃণমূল

55

যুগবার্তা ডেস্কঃ কাউন্সিলের পর ৪ স্তরে কমিটি ঘোষণা করেছে বিএনপি। এবারের কমিটিতে নতুন ও তরুণদেরই মূল্যায়ন করেছেন খালেদা জিয়া। বাদ পড়েছেন অনেক সিনিয়র নেতারা। যুগ্ম মহাসচিব এবং সাংগঠনিক সম্পাদক পদে ৪২ জনের আংশিক কমিটির নাম ঘোষণার পর বিএনপিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। স্বস্তির পাশাপাশি চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে বিএনপির দলের ভিতরে।
অসন্তোষের কারণ তিন দফায় গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন অনেকেরই নাম ঘোষণা করা হয়েছে যারা দলে নিষ্ক্রিয়, নবাগত, সংস্কারপন্থি এবং বিগত দুই আন্দোলনে মাঠে ছিলেন না। যোগাযোগ ছিল না নেতা-কর্মীদের সঙ্গে। এমনকি হাইকমান্ডের সঙ্গেও।
যারা আন্দোলন-সংগ্রামে পলাতক ছিলেন তাদের পদোন্নতিতে হতবাক সবাই। অবশ্য সাংগঠনিক কর্মকা- ও আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা বিবেচনায় কমিটিতে কয়েকজন নেতাকে জায়গা করে দেয়ায় তাদের ব্যাপারে সন্তুষ্ট সবাই। তবে দল থেকে হারিয়ে গিয়েছিলেন এমন কেউ কেউ চলে এসেছেন যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক, সহসাংগঠনিক সম্পাদক পদে। লঙ্ঘিত হয়েছে জ্যেষ্ঠতা। এতে দলের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছেন নেতা-কর্মীরা।
এক অসুস্থ নেতাকে বিভাগীয় ‘সাংগঠনিক সম্পাদক’ করার পর তিনি নিজেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, আমি গুরুতর অসুস্থ। আমি এই দায়িত্ব পালন করার মতো অবস্থায় নেই। যুগ্ম মহাসচিব এবং সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পেয়েছেন দুজন নবাগত। যারা বিএনপিতে এসেছেন বেশি দিন হয়নি। বেগম খালেদা জিয়া যে বারবার বলে আসছেন নতুন কমিটিতে দক্ষ ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে বাস্তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টো হয়েছে। ফলে কেউ কেউ দল ছাড়ার হুমকি দিচ্ছেন।
আর কয়েকজন নেতার নাম ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করছে। তাদের বক্তব্য ঐ নেতারা এই কমিটিতে নাম কাটছাঁট করছেন। ঘোষিত আংশিক কমিটিতে বিগত আন্দোলনে থাকা ত্যাগী ও মামলায় জর্জরিত নেতারা অবমূল্যায়নের শিকার হচ্ছেন বলেও দলের ভিতরে-বাইরে আলোচনা হচ্ছে।
বিএনপির গুলশান অফিস, নয়াপল্টন অফিস, সিনিয়র নেতাদের বাসভবনগুলোতে ঘোষিত কমিটি নিয়ে এখন নেতা-কর্মীরা সমালোচনামুখর। তৃণমূলে দানা বাঁধছে ক্ষোভ। ইতোমধ্যে বেগম খালেদা জিয়ার দফতরে তৃণমূল থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে তাদের ক্ষোভের কথা জানিয়ে। সিনিয়র এবং জুনিয়ার সর্বস্তরের নেতারা ত্যাগী পরীক্ষিত নেতাদের যথার্থ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গুলশান অফিসে চলছে পদ বাণিজ্য। সেখানে বসেই দলের দুজন শীর্ষ স্থানীয় নেতা এবং চেয়ারপারসনের একজন কর্মকর্তা দলীয় হাইকমান্ডের দেয়া কমিটির তালিকা নিজেদের মতো করে কাটছাঁট করছেন। উল্টোপাল্টা করছেন।
তারা বেগম জিয়াকে নানাভাবে প্রভাবিত করছেন। তারা সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে এমনভাবে পদোন্নতি দেয়া নেতাদের নাম খালেদা জিয়ার সামনে উপস্থাপন করছেন যেন তার সায় মেলে। এই তিনজনের একজনকে কমিটি নিয়ে বিতর্ক সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সব ম্যাডাম করছেন। আমরা শুধু তার নির্দেশনা ফলো করছি।
এদিকে এসব নিয়ে দলের কোনো সিনিয়র নেতা তাদের বক্তব্যে নাম প্রকাশ করতে চান না। কারণ এখনো স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পদ ঘোষণা করা হয়নি। তারা বলেন, ঘোষিত আংশিক কমিটির বড় অংশই লবিং ও তদবির করেই পদোন্নতি পেয়েছেন। সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে চলার অভিযোগও আছে পদোন্নতি পাওয়া কোনো কোনো নেতার বিরুদ্ধে। সাংগঠনিক কর্মকা- কিংবা আন্দোলনে কোনোটাতেই ভূমিকা ছিল না এমন ব্যক্তিরাও ভালো পদ পেয়েছেন।
বিএনপির প্রায় সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সদ্য ঘোষিত কমিটির যুগ্ম মহাসচিব চট্টগ্রাম উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক লায়ন আসলাম চৌধুরী। ২০০৮ সালে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। এর আগে তিনি অন্য দল করতেন। তাকে নবাগত হিসেবেই জানে মাঠ কর্মীরা। বিগত আন্দোলনে তাকে কাছে পায়নি তৃণমূল।
রাজশাহী বিভাগে যুগ্ম মহাসচিব করা হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিএনপির হারুন অর রশীদকে। তার বিরুদ্ধে মাঠ নেতাদের অভিযোগের অন্ত নেই। বিগত দুইটি বড় আন্দোলনে মাঠে দেখা যায়নি তাকে। সারা বছরই থাকতেন ঢাকায়। বিগত সরকার বিরোধী আন্দোলনে তার বিরুদ্ধে কোন মামলাও হয়নি। কুমিল্লা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে ব্যবসায়ী আনোয়ারুল আজিমকে। তিনি গুরুতর অসুস্থ।
নীলফামারী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান জামানকে সদ্য ঘোষিত কেন্দ্রীয় কমিটির রংপুর বিভাগের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। নীলফামারির একাধিক নেতা জানান, জামান বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন কয়েক বছর আগে। তিনি ব্যবসায়ী হিসাবে এলাকায় পরিচিত। আওয়ামী লীগ সরকারের একজন মন্ত্রীর সঙ্গে তার উঠাবসা। বিগত আন্দোলনেও তার কোন ভূমিকা নেই। দিনাজপুর পৌরসভার মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম রংপুর বিভাগের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক। জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক। আন্দোলন সংগ্রামে তার উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকাই ছিল না।
ফরিদপুর বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে শামা ওবায়েদকে, যার নেতৃত্ব মানতে রাজি নয় দলের বেশিরভাগ নেতাকর্মী। বরিশাল বিভাগে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে সিনিয়রদের টপকিয়ে শিরিনকে। তার নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ চলছে।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার অব. আসম হান্নান শাহ গণমাধ্যকে বলেন, সদ্য ঘোষিত কমিটির কারো কারো ব্যাপারে আমার কাছেও অনেক অভিযোগ এসেছে, আসছে। যতদূর জানি যে সব নেতাকে বিতর্কিত বলা হচ্ছে এই সব নেতা নিকট অতীতে তৃণমূল থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। মাঝে তারা ডান বামও করেছেন।
দলের অন্য একজন গুরুত্বপূর্ণ সিনিয়র নেতা জানান, দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা প্রতিদিন যোগাযোগ করছেন। ঘোষিত কমিটি নিয়ে ক্ষোভ অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। যারা বেগম জিয়াকে প্রভাবিত করে তাদের চাহিদা পূরণ করছেন তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝাড়ছেন। তারেক রহমানকে এই কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় পরিপূর্ণভাবে হস্তক্ষেপ করার অনুরোধ করছেন। ঐ নেতা বলেন, ছাত্রদলের সাবেক ত্যাগী নেতাদের প্রাধান্য দিয়ে কমিটি করার জন্য খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের নির্দেশনা থাকলেও তা উপেক্ষিত হচ্ছে। যাদেরকে দলের মূল কমিটিতে আনা হচ্ছে তাদের দিয়ে বিএনপি উঠে দাঁড়াতে পারবে না।এম কবির, আমাদের সময়.কম