তাদের পাশে নেই কেউ

রাজশাহী অফিসঃ রাত ১১ টা। রাস্তায় জ্বলে থাকা লাইটের আলোয় খোলা আকাশের নিচে ভাঙা বাড়িতে বসে আছে শাহানা বেগম (৬০)। মুখে কোনো কথা নেই। মাঝে মাঝে বড় বড় নিশ্বাস। ধ্বংসস্তুপ ঠেলে শাহানার কাছে গিয়ে কথা বলতেই কেঁদে উঠলেন তিনি। বললেন, ‘ব্যাটা আমারের সব শেষ হইয়্যা গ্যাছে। বোন মইছে, বোন জামাই মইছে। ছ্যালের পাও ভাঙছে। আমি চলমু কিবা করি?’
রাজশাহী মহানগরীর বহরমপুর সিটি বাইপাস এলাকায় রাস্তার পাশে ছিলো শাহানার ঘর। মঙ্গলবার রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল থেকে ছেড়ে আসা কেয়া পরিবহণ নামের দ্রুতগতির চলন্ত একটি বাস সে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ে। এতে ঘুমন্ত অবস্থায় চাপা পড়ে মারা যান তার বোন রেশমা বেগম (৩৫) ও বোন জামাই ভ্যানচালক বসির আহাম্মেদ (৪০)। পা ভেঙেছে তার ছেলে মানিকের (২০)।
দুর্ঘটনার দ্বিতীয় দিনেও ভাঙ্গাবাড়িকে ঘিরে ছিল উৎসুক সাধারণ মানুষ ও পথচারিদের ভীড়। সেখানে মানুষজনের মধ্যে নানান মন্তব্য। এখন পর্যন্ত বাড়িটি মেরামতের কোন ব্যবস্থা না হওয়ায় অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। টার্নিং পয়েন্টে কোন ব্যারিকেট না থাকায় দুর্ঘটনার আরো একটি কারণ বলে মন্তব্য করেন অনেকে। উল্টো মরার উপরে খাড়া ঘায়ের মতো ভাঙা বাড়িগুলো থেকে চুরি হয়ে গেছে অনেক আসবাবপত্র।
দুর্ঘটনায় নিহত হওয়া রেশমা বেগম ও বসির আহম্মেদের ছেলে রাশিদুল জানায়, মঙ্গলবার রাত সোয়া ১১টায় ধূমকেতু আন্তনগর এক্সপ্রেস ট্রেনে সে ঢাকায় যাচ্ছিল। অনেক কষ্ট করে ঢাকার একটি টিকেট কিনে বাবা তাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসেন। ট্রেন যখন যমুনা সেতুর কাছে, তখন তার মামী জোছনা বেগম মোবাইল ফোন দুর্ঘটনার খবর দেন। এতে ট্রেন থেকে যমুনা সেতুর পাশের স্টেশনে নেমে পড়ে সে। সব শুনে পুলিশ তাকে একটি ট্রাকে তুলে দেয়। সকালে রাজশাহী পৌঁছায়। এসে দেখে ছোট দুই ভাই ছাড়া আর কিছু নেই। বাবা-মা আর নেই। গুঁড়িয়ে গেছে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও।
বাবা মাকে দাফন করে দুই ভাইকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে ভাঙা বাড়িতে বসে বিলাপ করে বলে, এখন পর্যন্ত কেউ এসে মাথা গোজার ঠাইটুকু মেরামত করার জন্য কোন ব্যবস্থা করে দেননি। এখন দুই ভাইকে নিয়ে কোথায় থাকবো? কথাগুলো বলতে বলতে মাঝে মাঝে রাশিদুল নির্বাক হয়ে যায়।
রাশিদুল নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর ঢাকায় একটি ওয়েল্ডিং কারখানায় কাজ নিয়েছিল। কাঁদতে কাঁদতে রাশিদুল ভাঙ্গাবাড়িটি মেরামত করে দেয়ার জন্য সমাজের হৃদয়বান মানুষের প্রতি অনুরোধ জানান।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ইফতে খায়ের আলম বলেন, নগরীর রাজপাড়া থানায় দুর্ঘটনায় নিহতের ছেলে বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় কেয়া পরিবহনের চালক, হেলপার ও সুপার ভাইজার তিন জনকে আসামী করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী কেয়া পরিবহন নামে একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাজশাহী মহানগরীর বহরমপুর বাইপাস এলাকায় দুইটি বাড়িতে ঢুকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই রেশমা বেগম ও তার স্বামীর বসির আহাম্মেদের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত হন আরো তিন জন।