তবু সেই ডোনাল্ড ট্রাম্পই ৪৫তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট

ফজলুল বারীঃ সংখ্যালঘুদের আক্রমণ, অভিবাসীদের দেশ থেকে তাড়ানোর হুঁশিয়ারি, ইরাকে শহিদ মুসলিম সেনার পরিবারকে অপমান— প্রচারে নেমে কী বলেননি!‌ রোজ ভূরি–‌ভূরি বিতর্কে জড়িয়েছেন। কখনও তাঁর বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে। আবার কখনও নিজের মেয়ের দিকেই যৌন উস্কানি–‌দেওয়া মন্তব্য ছুঁড়েছেন। তবু সেই ডোনাল্ড ট্রাম্পই ৪৫তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আর এর কারণও কিন্তু সেই বিতর্কই। অন্তত তেমনই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
১৯৮৭ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ার কথা তাঁর মাথায় ঘুরছিল। সিদ্ধান্তটা নাকি পাকাপাকি ভাবে নিয়ে ফেলেন ২০১১ সালে। হোয়াইট হাউসে করেসপন্ডেন্ট নৈশভোজে শিল্পপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে ঠাট্টা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তার পরেই ওবামার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ট্রাম্প। ২০১১–এর মে মাসে পাকিস্তানের অ্যাবটাবাদে আল–কায়দা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে মারে মার্কিন নৌসেনা কমান্ডো। ফলে আরও একবার দেশবাসীর মন জিতে নেন ওবামা। চার বছর পর পাকাপাকি ভাবে রিপাবলিকানদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে নেমে পড়েন ট্রাম্প। তিনি ছাড়া আরও ১৭ জন ছিলেন প্রতিযোগিতায়। তালিকায় প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লু বুশের ভাই জেব বুশেরও নাম ছিল। কীসের জোরে বাকি ১৬ জনকে পিছনে ফেললেন এই ধনকুবের? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিতর্কিত মন্তব্য আর ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা করে। প্রচারে নেমে বার বার সন্ত্রাসের জন্য মুসলিমদের দায়ী করেছেন। আমেরিকার আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া, বেকারত্বের জন্য অভিবাসীদের দিকে আঙুল তুলেছেন। তাতেই মন গলে আম–‌আদমির। রিপাবলিকানদের শীর্ষ নেতা পল রায়ান, সেনেটর টেড ক্রুজ প্রকাশ্যে তাঁর বিরোধিতা করেন। তাতে কী!‌‌ তত দিনে মার্কিন মধ্যবিত্তদের ভোট নিশ্চিত করে ফেলেছেন ৭০ বছরের শিল্পপতি।
নিউ ইয়র্কের সম্পত্তি–‌ব্যবসায়ী ফ্রেড ট্রাম্পের চতুর্থ সন্তান ডোনাল্ড ট্রাম্প। তা সত্ত্বেও ধনকুবের বাবার প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে নিচু পদে কাজ করতে হয়েছিল তাঁকে। স্কুলে দুষ্টুমি ও উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য ১৩ বছর বয়সে তাঁকে সেনা অ্যাকাডেমিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পেনসিলভ্যানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হোয়ার্টন স্কুলে পড়াশোনা করেন ট্রাম্প। তাঁর বড় ভাই ফ্রেড পাইলট হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে, বাবা তাঁকেই নিজের উত্তরসূরি নির্বাচন করেন। অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে ফ্রেড ট্রাম্প মারা যান। তার পর থেকে আর মদ ও সিগারেট ছোঁননি ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ট্রাম্পের কথায়, বাবার প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ১০ লাখ ডলার ঋণ নিয়ে সম্পত্তির ব্যবসা শুরু করেন। পাশাপাশি নিউ ইয়র্ক শহরে ছড়ানো বাবার বিপুল আবাসিক সম্পত্তি দেখাশোনার কাজেও সহায়তা করতেন। ক্রমে তিনি বাবার ব্যবসা হাতে নেন এবং ১৯৭১–‌এ প্রতিষ্ঠানের নাম দেন ‘‌ট্রাম্প অর্গানাইজেশন’‌। তাঁর বাবা মারা যান ১৯৯৯ সালে। ব্রুকলিন আর কুইন্স এলাকার আবাসিক ভবন কেনাবেচার পারিবারিক ব্যবসাকে তিনি নিয়ে যান অন্য মাত্রায়। ম্যানহ্যাটানের অভিজাত এলাকায় বিভিন্ন ভবন–‌প্রকল্প গড়ে তোলেন তিনি, ভগ্নদশা কমোডর হোটেল ভেঙে তিনি তৈরি করেন গ্র্যান্ড হায়াত হোটেল এবং ম্যানহ্যাটানের অভিজাত রাস্তায় নির্মাণ করেন তাঁর সবচেয়ে চোখধাঁধানো ৬৮তলা আবাসন ‘‌ট্রাম্প টাওয়ার’‌। নিজের নাম দিয়ে আরও বহু–‌বিখ্যাত আবাসন তিনি গড়ে তোলেন। ‘‌ট্রাম্প প্লেস’‌, ‘‌ট্রাম্প ওয়ার্ল্ড টাওয়ার’‌, ‘‌ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড টাওয়ার’‌ এর মধ্যে অতি–‌পরিচিত কয়েকটি ভবন। এমন-কি মুম্বই, ইস্তানবুল এবং ফিলিপিন্সেও তিনি তৈরি করেছেন ‘‌ট্রাম্প টাওয়ার’‌। তাঁর অসংখ্য হোটেল ও ক্যাসিনোর মধ্যে কয়েকটিকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়। বিনোদন–‌ব্যবসাতেও ছাপ ফেলেছেন তিনি। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৫ পর্যন্ত মিস ইউনিভার্স, মিস ইউ এস এ–‌সহ বিভিন্ন সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা প্রযোজনা করেছেন। ২০০৩ সালে এন বি সি টেলিভিশনে চালু করেন জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো ‘‌অ্যাপ্রেনটিস’‌। এই শোয়ে বিজয়ীকে ট্রাম্প নিজের প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ পদে কাজের সুযোগ দেন। শোয়ের ১৪টা সিজন চলেছিল। শুধু এই শোয়ের জন্য টেলিভিশন নেটওয়ার্ক তাঁকে দিয়েছিল ২১ কোটি ৩০ লক্ষ ডলার। তিনি বেশ কিছু বইও লিখেছেন। ফোবর্স–‌এর তৈরি ধনীদের তালিকা অনুযায়ী মিস্টার ট্রাম্পের সম্পদের পরিমাণ ৩৭০ কোটি ডলার। যদিও ট্রাম্পের দাবি, তাঁর সম্পদের পরিমাণ আসলে এক হাজার কোটি ডলার। তিনবার বিয়ে করেছেন ট্রাম্প। প্রথম স্ত্রী ইভানা জেলনিকোভা ছিলেন চেক অ্যাথলেট এবং মডেল। তাঁদের তিন সন্তান— ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র, ইভাঙ্কা এবং এরিক। ১৯৯০ সালে তাঁদের বিয়ে ভেঙে যায়। অভিযোগ, স্ত্রী ইভানাকে নির্যাতন করতেন স্ত্রী। ১৯৯৩ সালে তিনি মারলা ম্যাপলসকে বিয়ে করেন। তাঁদের কন্যাসন্তানের নাম টিফানি। দ্বিতীয় ওই বিয়েও ভেঙে যায় ১৯৯৯ সালে। এর পর ২০০৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিয়ে করেন তাঁর বর্তমান স্ত্রী, মডেল মেলানিয়া ক্নাউসকে। তাঁদের এক ছেলে, নাম ব্যারন উইলিয়াম ট্রাম্প। প্রথম পক্ষের সন্তানেরা ‘‌ট্রাম্প অর্গানাইজেশন’‌ পরিচালনায় তাঁকে সহায়তা করেন।-লেখকঃ সাংবাদিক, প্রবাসী