ঢাকায় যানজটে দৈনিক ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট: বিশ্বব্যাংক

39

যুগবার্তা ডেস্কঃ দীর্ঘমেয়াদি এবং টেকসই পরিকল্পনার অভাবে ঢাকা ভারসাম্যহীন ও বিশৃঙ্খল নগরে পরিণত হয়েছে। যানজটের কারণে প্রতিদিন এ মহানগরীতে নষ্ট হয় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা।

বুধবার হোটেল সোনারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস আয়োজিত ‘২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকার উন্নয়ন বিকল্প’ শীর্ষক দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এমন পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।

দেশি-বিদেশি নগর পরিকল্পনাবিদ, নীতিনির্ধারক ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। এর সমাধানে কিছু পরামর্শও উঠে আসে। কয়েকটি পর্বে ভাগ করে সাজানো হয় এ সম্মেলন।

আন্তর্জাতিক এ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেন, ঢাকা মহানগরের বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে পরিত্রাণ এবং আশু ভবিষ্যতে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সমাধানের পথ হচ্ছে পূর্বদিকে পরিকল্পিত সম্প্রসারণ। সেটাই হবে অতি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা মেরামতের (রেট্রোফিট) চেষ্টার চেয়ে বেশি কার্যকর ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।

সম্মেলনে জানানো হয়, ‘টুওয়ার্ডস গ্রেট ঢাকা : এ নিউ আরবান ডেভেলপমেন্ট প্যারাডাইম ইস্টওয়ার্ড’ শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের মূল প্রতিবেদনটি আগামী মাসে পূর্ণাঙ্গ আকারে প্রকাশ করা হবে। এতে বলা হয়, মহানগরীর দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে ঢাকার নগর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সামঞ্জস্য রাখতে পারেনি। ফলে একটি বিশৃঙ্খল ও অসম নগরায়ন প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। যথেষ্ট পরিকল্পনার অভাবে অত্যধিক ঘনবসতি, নিম্নমানের বসবাসযোগ্যতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে এবং বন্যা ও ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় ৩৫ লাখ বস্তিবাসীসহ অনেক অধিবাসী প্রায়ই মৌলিক সেবা, অবকাঠামো এবং সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, গত কয়েক মাস যাবৎ ঢাকায় চিকুনগুনিয়ার যে প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, তাও নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট মনোযোগের অভাবে এ রকম রোগ-ব্যাধি এবং জলাবদ্ধতার মতো নাগরিক সংকট তৈরি হচ্ছে; পরিবহন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় যানজটে বিনষ্ট হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কর্মঘণ্টা— এমন বেশ কিছু মৌলিক সমস্যা ও নাগরিক সেবা সংকটের কথা তুলে ধরেন তারা। উন্নয়ন সহযোগীদের পক্ষ থেকে এসব সমস্যা সমাধানে সব ধরনের সহযোগিতারও আশ্বাস দেওয়া হয়।

তারা বলেন, ঢাকা শহরের আধুনিকায়নে যথাযথ এবং টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ, সঠিক বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। নিজস্ব পরিবেশ ও সংস্কৃতির কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন দেশের সফল নগরের মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। তাদের মতে, সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে উন্নত শহরের মডেল অনুসরণ করলে ঢাকা হতে পারে দিল্লি কিংবা সাংহাইয়ের মতো সফল নগর। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে অবকাঠামো উন্নয়ন করা যায়।

অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে ঢাকার নাগরিক পরিস্থিতি নিয়ে তুলে ধরা একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। গত ১০ বছরের ব্যবধানে ঢাকায় যান চলাচলের গতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে ৭ কিলোমিটারে নেমে এসেছে, যা হাঁটার গতির চেয়ে সামান্য বেশি।

এসব সমস্যা বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ ও পদক্ষেপের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফান বলেন, ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকার জনসংখ্যা ৩ কোটি ৫০ লাখ হবে। একে বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করা গেলে ওই জনবলের উৎপাদন-দক্ষতা দেশের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখতে পারবে। সেটা কাজে লাগাতে হলে অবশ্যই সঠিকভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন, সমন্বয় সাধন এবং বিনিয়োগ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হবে। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ঢাকার পূর্বাঞ্চলের অপরিকল্পিত নগরায়ন রাজধানীর পরিবেশের আরও অবনতি ঘটাবে। বন্যা ও ভূমিকম্পের ঝুঁকিও বাড়বে। এসব উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিশ্বব্যাংক সহযোগিতা দিতেও প্রস্তুত বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মার্টিন রামা বলেন, যথাযথ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাসযোগ্য নগরী গড়া ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির দৃষ্টান্ত হতে পারে পূর্ব সাংহাইয়ের পুডং এলাকা। সেখানে পরিকল্পনার মাধ্যমে যানজট নিরসন করা হয়েছে। পুডংকে ঢাকা অনুসরণ করতে পারে।

অনুষ্ঠানে দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত দিল্লি শহর এবং চীনের সাংহাইয়ের সাবেক ভাইস মেয়র কিঝেং ঝাও পুডংয়ের রূপান্তরের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের মোট ভূমির ১ শতাংশজুড়ে থাকা এই ঢাকা থেকেই মোট দেশজ উৎপাদনের ৩৬ শতাংশের জোগান আসে। প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান হয় ৪৪ শতাংশ। এসব গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সরকার শহরটির আধুনিকায়নে বদ্ধপরিকর। গণপরিবহন সেবায় মাস র্যা পিড ট্রানজিট (এমআরটি), বাস র্যা পিড ট্রানজিট (বিআরটি) ও এলিভেটেড এঙ্প্রেসওয়েসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, রাজউকের মধ্যে সমন্বয় করে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ৮০ শতাংশ পানি ভূ-উপরিস্থ থেকে সংগ্রহ করার মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। পয়ঃসুবিধার আধুনিকায়নেও প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানের আরেক পর্বে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অ্যান্থনি ভ্যানেব্যলস এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের পিএইচডি ফেলো জুলিয়া বার্ড ২০৩৫ সালের ঢাকা শহরের একটি মডেল উপস্থাপন করেন। সেই দৃশ্যকল্পে বলা হয়, ঢাকার পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। এতে মূল শহর থেকে মানুষ কাজের জন্য পূর্বাঞ্চলে যাওয়া শুরু করবে এবং মূল ঢাকার ওপর চাপ কমবে। পাশাপাশি পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ এবং সাশ্রয়ী করতে হবে। জনসংখ্যার ঘনত্ব কমানোর জন্য শহরের বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে বিকেন্দ্রীকরণের সুফল মানুষ পাবে।

আরেকটি পর্বে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঢাকার জন্য নীতি নির্ধারণ ও নীতি বাস্তবায়নের দিকেও নজর দিতে হবে। বিশাল একটি জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। তাই কম খরচে গৃহায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

ইফাত শরীফ বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান নিয়ে চিন্তা করতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ আক্তার মাহমুদ বলেন, গত কয়েক বছরে ঢাকার আশপাশ যেমন গাজীপুর, টঙ্গী এলাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনেক বেশি। ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে ভবিষ্যতে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। শহরের মাত্র ৯ শতাংশ মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করলেও যোগাযোগ পরিকল্পনায় সবার আগে তাদের কথাই চিন্তা করা হয়। তিনি পূর্ব ঢাকায় নগরায়ন বাড়ানোর আগে পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দেন।

‘ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং’-এর পরিচালক এসএম মাহবুবুর রহমান জলাবদ্ধতা কমানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দেন।

বিভিন্ন পর্বে আরও অংশ নেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর হরমান, পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত, রাজউকের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান, বিশ্বব্যাংকের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ইফাত শরীফ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, হাতিরঝিল প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাঈদ প্রমুখ।-সমকাল