ডেল্টা প্লান হচ্ছে ২১০০ সালে বাংলাদেশকে কিভাবে দেখব সে পরিকল্পনা–পরিকল্পনামন্ত্রী

যুগবার্তা ডেস্কঃ পরিকল্পিত অর্থনীতির সুফল পাচ্ছে বাংলাদেশ। বেড়েছে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ও মাথাপিছু আয়। মূল্যস্ফীতি রয়েছে নিয়ন্ত্রণে। সেইসঙ্গে সামাজিক খাতেও অগ্রগতি রয়েছে ব্যাপক। কিন্তু এত সব অর্জন টেকসই হবে কিনা— তা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। এর পেছনে অন্যতম মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিকর প্রভাব। জলবায়ু পরিবর্তনের সেই প্রভাবকে মোকাবিলা করে দেশকে কিভাবে উন্নয়নের সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে, সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত পরিকল্পনা ‘ব-দ্বীপ পরিকল্পন ‘ বা ‘ডেল্টা প্ল্যান’।

আজ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে এই মহাপরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা।

একশ বছরের এই ঐতিহাসিক পরিকল্পনাটি যার হাত ধরে গত সাড়ে তিন বছরে তিলে তিলে পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছে, তিনি পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য সিনিয়র সচিব ড. শামসুল আলম, তিনিই উপস্থাপন করেন মুল প্রবন্ধ।

ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক দলিল। একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত, কারিগরি ও আর্থসামাজিক দলিল এই পরিকল্পনা। প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ, ইচ্ছা ও নির্দেশে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের পক্ষ থেকে এই পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির কারণে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার এই পরিকল্পনা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয়। উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন এবং পানি, জলবায়ু, পরিবেশ ও ভূমির টেকসই ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলাসহ ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ ও ২০৪১ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদা অর্জনের লক্ষ্যে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বাংলাদেশের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করবে।

উন্নত দেশের পথে হাঁটতে হলে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। সেক্ষেত্রে এককথায় বলা যায়, ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন অপরিহার্য। তাছাড়া প্রকল্পটির মূল প্রতিপাদ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো। তাছাড়া এরই মধ্যে ভূমিতে ক্ষয় হচ্ছে ব্যাপক। নদী ভাঙনের ফলে প্রতিবছর ৫০ থেকে ৬০ হাজার পরিবার গৃহহীন হচ্ছে। বন্যায় অনেক ফসলহানি হচ্ছে। এর বাইরেও বিশেষ করে শহর অঞ্চলে সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, কঠিন বর্জ্য ও আবর্জনা ব্যবস্থপনা, কৃষি জমিতে ব্যাপক রাসায়নিক সারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের মতো চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি উৎপাদক শক্তি না কমিয়ে কিভাবে এসব বিষয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা যেতে পারে— বাংলাদেশের ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় এসব বিষয়ের প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠক শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এসব কথা বলেন।

মাননীয় মন্ত্রী আরো জানান, ঝুঁকি বিবেচনায় ছয়টি হটস্পট চিহ্নত করা হয়েছে এই পরিকল্পনায়। সেই সঙ্গে এসব হটস্পটে ৩৩ ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। হটস্পট গুলো হচ্ছে— উপকূলীয় অঞ্চল, বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল, হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, নদী ও মোহনা অঞ্চল এবং নগরাঞ্চল। ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়নে সে অঞ্চলের পানি বিজ্ঞান ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। এক্ষেত্রে দেশের আটটি হাইড্রোলজিক্যাল অঞ্চলকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকি মাত্রার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে একই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির সম্মুখীন জেলাগুলোকে একেকটি গ্রুপের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। পানি ও জলবায়ুজনিত অভিন্ন সমস্যায় কবলিত এই অঞ্চলগুলোকেই হটস্পট হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় হটস্পটগুলোর এসব চালেঞ্জ ও সমস্যা সমাধানে বেশকিছু কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— বন্যার ঝুঁকি কমাতে নদী ও পানিপ্রবাহের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ রাখা; পানিপ্রবাহের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নদীগুলোকে স্থিতিশীল রাখা; পর্যাপ্ত পরিমাণে ও মানসম্মত স্বাদু পানি সরবরাহ করা; নদীগুলোর পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা; নদীগুলোতে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য নৌপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা; যথাযথ পলি ব্যবস্থাপনা; টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য রক্ষা; বন্যা ও জলাবদ্ধতাজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমানো; পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিস্কাশন নিশ্চিত করা; হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকায় জলের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে টেকসই জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করা; বন্যা থেকে কৃষি ও বিপন্ন জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা; সুপেয় পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; সঠিক নদী ব্যবস্থাপনা; টেকসই হাওর প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা; সমন্বিত পানি ও ভূমিসম্পদ ব্যবস্থাপনা; বন্যা ও ঝড় বৃষ্টি থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শহর রক্ষা; সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা; পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা; টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বহুমুখী সম্পদ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির বিকাশ; নগর অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন সক্ষমতা বাড়ানো ও নগর এলাকায় বন্যার ঝুঁকি কমানো; পানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো; নগরে কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও সুশাসন গড়ে তোলা; নতুনভাবে জেগে ওঠা চর এলাকায় নদী ও মোহনা ব্যবস্থাপনা জোরদার করা; জলাভূমি ও প্রতিবেশ সংরক্ষণ, অক্ষুন্ন রাখা ও তাদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা; বিদ্যমান পোল্ডারের কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঝড়বৃষ্টি, জলোচ্ছাস ও লবণাক্ততা অনুপ্রবেশের মোকাবিলা করা; পানির জোগান ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা; উপকূলীয় অঞ্চলে জেগে ওঠা নতুন জমি উদ্ধার এবং সুন্দরবন সংরক্ষণ করা।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মাননীয় মন্ত্রী বলেন, ব-দ্বীপ পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে গঠন করা হবে ডেল্টা তহবিল। এই তহবিলের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বাংলাদেশ সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, পরিবেশ ও জলবায়ু সম্পর্কিত তহবিল, বিশেষ করে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বকে (পিপিপি) বিবেচনা করা হয়েছে। ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ বাস্তবায়নের জন্য ২০৩০ সাল নাগাদ জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থায়ন সম্বলিত বাংলাদেশ ডেল্টা তহবিল গঠনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এর মধ্যে ২ শতাংশ নতুন বিনিয়োগ এবং শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় করা হবে। জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগ সরকারি তহবিল হতে এবং শতকরা ২০ ভাগ বেসরকারি খাত থেকে আসবে। আরও বলা হয়েছে, অর্থায়নের ক্ষেত্রে কস্ট রিকভারির জন্য বেনিফিশিয়ারি পে প্রিন্সিপাল অনুসরণ করা হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে বড় শহরগুলোতে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা খাতে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় আদায়ের ক্ষেত্রে এ নীতিমালা কার্যকর করার চেষ্টা করা হবে এবং তা পর্যায়ক্রমে সময়ের আবর্তনে অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হবে।