ঠেকার কোন মাছলা নাই; ঠেকলে মানুষ ভাই ভাই!

261

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ মিশেল এসেছে ফ্রান্স থেকে। জন্মসূত্রে খ্রিস্টান হলেও এখন মনে প্রাণে ইহুদি; একজন খাঁটি ইহুদি যাকে বলে। দয়াল আর ভান্ডারী ইন্ডিয়ান; হরিন্দরও একই দেশের ছেলে। ওরা হিন্দু হলেও মাজিদ মুসলমান; ভারতের দিল্লীতে ওদের আবাস। সাথে একজন বাংলাদেশী মুসলিম ভাইও আছেন। তারা এখানে স্থায়ীভাবেই থাকেন। আমি এসেছি মাস দু’একের জন্যে। এই আবাসে ক্ষণকালের অতিথি। ঠিক অতিথি নয়; বেশীদিন থাকতে হবে বলে হোটেলে না ওঠে এই বাসারই একটি রুম ভাড়া করে উঠেছি জাপানের চিবা শহরে। টোকিওর পাশেই চিবা; যেমনি ঢাকার পাশে গাজীপুর।
বাসাটি ডুপ্লেক্স ধরনের। মানে দোতলা। কিন্তু কিচেন, ডাইনিং, বাথরুম আর টয়লেট কমন। এই জীবনে কোনকালেও এই রকম জায়গায় থাকা হয়নি আমার। উপায় ছিল না বলেই মেনে নিয়েছিলাম। আমার জায়গা হয়েছিল দোতলার একটি ঘরে। প্রথম যেদিন উঠি সেদিন বেশ টেনশানেও ছিলাম। থাকতে পারবো তো এখানে! প্রথম দুদিন ইহুদি মিশেলের সাংঘাতিক সহযোগীতামূলক ব্যবহার। কথায় কথায় হাসি, কথায় কথায় খুশী; বলে, আই লাইক মুসলিম পিপল; মুসলিম পিপল আর ভেরি জেন্টেল; আরো কত কী! তবে ৩য় দিন থেকেই বের হতে লাগলো তার আসল চেহারা।
রমজানের রোজা চলছিল। আমরা তিন মুসলমান সেহেরী খেতে উঠি ভোর রাতে। কিছুটা টুংটাং শব্দ হয়। এতেই মিশেলের আপত্তি। সন্ধ্যায় এক ভিন্ন মিশেলকে দেখলাম। চেহারায় খুবই অখুশীর ছাপ। গেল দুরাত আমি এক ফোটাও ঘুমুতে পারি নাই। ভোর রাতেও মানুষ খাবার খায়! তোমরা মুসলিমরা বোকা। রোজার নামে সারাদিন তোমরা কিছুই খাও না; এমন কি পানিও না। এটা একটা কথা হলো? তোমাদের গডের কি কোন দয়ামায়া নেই? কথাগুলো বলছিল খুবই ঠান্ডা মাথায়। সারাদিন রোজা রেখে মিশেলের কাছ থেকে এমন স্টুপিড মার্কা কথা শুনেও মাথা ঠান্ডা রেখে শুধু বললাম; কাল রাত থেকে আমরা আরো সতর্ক থাকবো যেন তোমার ঘুমের ডিস্টার্ব না হয়। পাশাপাশি বিনয়ের সাথে সতর্ক করে দিলাম এই বলে যে, কারো ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে কখনোই বাজে কথা বলবে না।
এরপর আর বলেনি কিছু কখনো; তবে মুসলিমরা যে মিশেলের সাংঘাতিক অপছন্দের সেটা ওর মুখ দেখলেই বুঝতাম। আড় চোখে তাকাতো আমার দিকে সব সময়। ওর ক্রেজি ভাবের কারনে কোথায়ও তিনমাসের বেশী কাজে টেকে না। অমন ক্রেজি না হলে কি ফ্রান্স থেকে কেউ জাপানে এসে সাধারণ কাজ করে! সেহেরীতে দোতলার রুমের দরজা লাগিয়ে, আধা আলো আধারিতে কোনমতে খাবার গলধঃকরন করতাম। শব্দ তেমন হতো না বললেই চলে। কিন্তু মুশকিল হতো টয়লেট করা নিয়ে। বাসার কমন টয়লেটটি ছিল ওর রুমের দরজার সামনে। এটা ছিল মহা বিপত্তির সবচেয়ে বড় কারন। নীরবে নিস্তব্দে শব্দবিহীনভাবে আর যাই করা যাক মলমূত্র তো ত্যাগ করা যায় না! কী মল, কী মূত্র! বের হওয়ার আগে নিজের মত করে এক আধটু শব্দ তো করবেই। এর সাথে আছে পানি ফ্ল্যাশের শব্দ। এটা সবাই বোঝে; কেবল বোঝে না মিশেল।
মিশেলের ঠিক উল্টো হলো এখানকার চারজন ভারতীয়। বিশেষ করে দয়াল আর ভান্ডারী। সাংঘাতিক অমায়িক ব্যবহার এই দুজনার। সব কিছুতে সব সময় সহযোগীতার মনোভাব। বিছানায় এপাশ থেকে ওপাশে এমনভাবে ফেরে যেন শব্দ না হয়। বাথরুম, টয়লেটে গেলেও বলে যায়। আমার ঘরে ওদের টানানো দেবদেবীর ছবি ছিল; সেসব আগেই সরিয়ে নিয়েছে। ভান্ডারী আবার কঠিন ধর্ম পরায়ণ। সূর্য্য ওঠার লগ্নে সূর্য্য দেবের পূজা করবেই। বিছানায় বসে বসেই পূজা সেরে নেয়। আমার সেহেরী শেষে ঘুমের চোখ যেই না একটু লেগে আসে অমনি ভান্ডারীর পূজা শুরু হয়। ভান্ডারী ফিসফিস করে মন্ত্র যপে যেন আমার ঘুম না ভাঙ্গে। ভান্ডারী পা টিপে টিপে টয়লেট বাথরুমে যায় যেন আমার ডিস্টার্ব না হয়। এসব দেখে আমার লজ্জাবোধ বেড়ে যেতে লাগলো। ওদের মাঝে চেপে বসাতে নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হতে লাগলো আমার। ভান্ডারীর কাছে বলেও ফেললাম আমার মনের অনুভূতি। আমাকে অবাক করে ভান্ডারী বললো, আরে মিঃ, মজবুরীকি কৈই মাছলা নেহি। মজবুরীমে ছব ভাই ভাই, আপ মেরা ভাই লাগতাহে, ছব ঠিক হ্যায়। কুছবি প্রবলেম নেহি হ্যায়। আপ মুসলমান, ম্যায় হিন্দু; মাগার জীছমকা খুন সেইম হ্যায়।
সাধারণত রাতের খাবার আমি পাশের ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টেই সারি। ভান্ডারী এবং দয়াল এই রেস্টুরেন্টেই কাজ করে । সকাল দশটা থেকে রাত ১১ টা পর্যন্ত তাদের কাজ। এরপরেও সারাক্ষন মুখে হাসি লেগেই আছে। হাসি ধরে রাখাটাও কাজেরই একটি অংশ। আমি গেলেও খুব সমাদর করে। একজন রোজাদার হিসেবে খুব যত্ন আত্মিক পেয়েছি পূরোটা মাস। আমাদের এই বাসার বাড়ীওয়ালা জাপানী কাতো সান’ও মাঝে মাঝে আসেন এখানে খেতে। তিনি বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী কিন্তু অনুসারী নন। মাঝে মাঝে দেখা যেত এক টেবিলে চার ধর্মের মানুষ খেতে বসেছি; হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান। এমনটা সাধারণত কোথায়ও ঘটে না। কাতো সান ধর্মীয়ভাবে উদার দৃষ্টিভঙ্গীর। তিনি সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্মকে টেনে এনে মানুষে মানুষে বিভেদ বাড়াতে চান না। তিনি মনে করেন, ধর্ম যার যার, সমাজ এবং রাষ্ট্র সবার। এই পৃথিবীতে যত যুদ্ধ হয়েছে তার সবগুলোর পেছনেই মূল কারন ধর্ম এবং কোন না কোনভাবে ধর্মীয় মতভেদ। এক ধর্মের সাথে অন্য ধর্মাবলম্বী অনুসারীদের যুদ্ধ; আবার একই ধর্মের ভিন্ন মতাবলম্বীদের মাঝের যুদ্ধ। এভাবেই কেটেছে পূরোটা মাস। বাসা ছেড়ে চলে আসার ঠিক একদিন আগের কথা। নীচ থেকে মিশেল ডাকছে আমায়; ভাবলাম কে জানে আজকে আবার কোন প্যাঁচাল পারে। আমি নেমে আসলাম। মাথা নীচু করে মিশেল বেশ কাঁচুমাচু গলায় বললো, গেল ক’দিনে আমি তোমার সাথে খুব অন্যায় করে ফেলেছি। এমন হেন ছোট কাজ নেই যা আমি করিনি। সব কিছুতেই আমার মনের নীচুতাই কেবল প্রকাশ পেয়েছে। গেল তিনটি রাত আমি খুব ভেবেছি। মানুষ হিসেবে আমি এমন খারাপ নই। এরপরেও আমি যা করেছি তা কেবল একজন খারাপ মানুষের পক্ষেই সম্ভব। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। হাত জোর করে ক্ষমা চাইছি তোমার কাছে। তোমরা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধরা মিলেমিশে এক ঘরে থাকতে পারলে। কেবল আমি পারলাম না। আমার পারা উচিত ছিল। আমার বোঝা উচিত ছিল আমাদের সবার সবচেয়ে বড় পরিচয় আমরা মানুষ। আমাদের জাতিস্বত্বা, ভাষা, ধর্ম, বর্ণ আলাদা হতে পারে। কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনে এর চেয়েও বড় পরিচয় আমরা সৃষ্টির সেরা জীব। বনের পশু যা করতে পারে আমরা তা পারি না। জীবনের প্রয়োজনে আমরা চার ধর্মের ক’জন মানুষ একটি বাসায় আছি মাত্র। এখানে সময়, চাহিদা আর প্রয়োজনটিই মূখ্য; ধর্ম বর্ণ মূখ্য নয়। আমাকে তুমি এবং তোমরা মাফ করো।
কথাগুলো বলে মিশেল বেশীক্ষন আর দাঁড়ায়নি আমার সামনে। ক’দিনের দেখা মিশেল আর আজকের মিশেলের মাঝে অনেক পার্থক্য মনে হলো। মনে হলো অনেকটাই অনুশোচনায় ভুগছে মানুষটি। তবে কতদিন এই অনুশোচনা বোধটুকু থাকে সেটাই দেখার বিষয়। সন্দেহ নেই, গোড়া ধর্মীয় বিশ্বাস তার মনুষ্যত্ববোধকে দূর্বল করেছিল; অমানুষ করেছিল। কিন্তু আমাদের বাকী তিন ধর্মের ধর্মীয় সম্প্রীতিবোধ ওর মনের বন্ধ জানালা সাময়িক সময়ের জন্যেও হয়ত খুলে দিয়েছে। ও হয়ত বুঝতে পারছে, বর্ণ গোত্রে বিভেদ থাকলেও আমরা যে ভাই ভাই; সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই!!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা