জোর করে চাপিয়ে দিয়েও অর্জিত হচ্ছে কি উপযুক্ত শিক্ষা?

আশিকুল কায়েসঃ বাধ্যতামূলক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত করায় সরকারের এই উদ্যোগকে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্নস্তরের জনগণ স্বাগতম জানিয়েছে। এমনকি শিক্ষাবিদগণও বাদ যাননি। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা কতটা মানুষের উপকারে আসবে সেটা পর্যালোচনা না করে বরং উন্নয়নমুখী কার্য্যক্রমের এই পরিকল্পনাকে সাধুবাদ জানিয়েছে। ২০১০ সালে প্রণীত শিক্ষানীতিতে এমনটা উল্লেখ করা হলেও তা বাস্তবে শেষ ধাপে আসতে সময় লেগেছে ছয় বছর। শিক্ষানীতিতে উল্লেখ করা হয় ২০১৮ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণীতে পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে। এটি ড. কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষানীতির আলোকে প্রণীত হয়।
বর্তমান আইন অনুসারে পঞ্চম শ্রেণী বাধ্যতামূলক এবং অবৈতনিক। কিন্তু ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি, ভর্তি ও পরীক্ষা ফি দিতে হয়। শুধু তাই নয়, এতদিন সাধারণ শিক্ষা বোর্ড ও মাদ্রাসার অধীনে থাকা স্কুল-কলেজ এবং মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংযুক্ত পঞ্চম শ্রেণী পর্য্যন্ত শিক্ষা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনেই পরিচালিত হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা এ মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর গ্রহণ করত। এখন এই সংক্রান্ত বিষয়াদি দেখভাল করবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পাঠদানের অনুমতি, একাডেমিক স্বীকৃতি, বিষয় খোলা, বিভাগ খোলা, শ্রেণী-শাখা খোলা, এমপিওভুক্তি, নতুন শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক এবং শিক্ষক নির্দেশিকাসহ সব শিক্ষা কার্য্যক্রম এই মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সম্পাদিত হবে। যদিও এখন পর্য্যন্ত এ বিষয়ে কোন পরিকল্পনা বা রূপরেখাও তৈরি করেনি । (২০১৬ সালের তথ্যমতে)
দেশে অষ্টম শ্রেণী কেন ? বিএ পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করলে জনগণের কি আসে যায়? শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের পাশের হার শতভাগ নিশ্চিত করা গেলেও শিক্ষার মান সেভাবে উন্নত হয়নি। প্রতিনিয়ত বেকারত্বের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, দেশে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে যখন কোন মানুষ সাবলম্বি হতে স্বপ্ন দেখে, ঠিক সেই মুহুর্তে প্রথম স্বপ্ন দেখতে হয় প্রভাবশালী, ক্ষমতাবান ও প্রশাসনের লোকদের বছরে কত টাকা চাঁদা দিয়ে খুশি করতে হবে। শিক্ষা অধিদপ্তরগুলোর তথ্যসূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬২ হাজারের বেশি, সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৮ হাজার ৮৮টি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিবেশ কখনও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন ছাত্র সদ্ব্য শিখতে থাকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় নিজের কাছে কষ্টসাধ্য বলে মনে করে, সেক্ষেত্রে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের যাওয়ার জন্য পাঁচবছর ধরে স্বপ্ন বুনতে থাকে নিজের মধ্যে। একটানা অষ্টশ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থার পথ পাড়ি দিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া একজন ছাত্রকে অসুস্থ হতে হবে। কাগজে কলমে প্রাথমিকভাবে পড়া হলেও অর্ধেক ছাত্র-ছাত্রী ঝড়ে পড়বে অকাতরে। অষ্টম শ্রেণীর সার্টিফিকেট অর্জিত না হলেও প্রাথমিক শিক্ষার কলেবর একই অবস্থানে থাকবে, সেটা দ্বিতীয় শ্রেণী হোক আর ষষ্ঠ শ্রেণী হোক নিশ্চিততো হলো প্রাথমিক শিক্ষা। মানুষের মধ্যে এতশিক্ষা জোর করে চাপিয়ে দিয়েও আসলেই অর্জিত হচ্ছে কি উপযুক্ত শিক্ষা? সামান্য জমির উপর গড়ে ওঠা ৫ রুমের ভবনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কি হবে? আর যদি সেই বিদ্যালয়ের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাওয়া হয় তাহলে ৬২ হাজারের বেশি প্রথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে কতশত কোটি টাকা ব্যয় করে কত দিন হলে এই উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করবে। তারপরতো থাকলো উপযুক্ত শিক্ষার কথার কথা। আর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বড় বড় দুই তলা তিন তলা ও কয়েক একর জমির কি ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে বাংলাদেশ সরকার, বেসরকারি ব্যবস্থায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চাকরিতে কর্মরত শিক্ষকদেরই বা কি ব্যবস্থা হবে। শিক্ষক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় মোটের উপর তবে কি বেকারত্বের মধ্যে বৃদ্ধি পাবে আরও কিছু শিক্ষিত বেকার? কর্মসংস্থানের কথা বলতে গেলে, অষ্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া ছাত্রদের মধ্যে কখনও কর্মসংস্থানের আবহটা সৃষ্টি করতে পারে না। বরং কর্মসংস্থানটা কি সেটার সঙ্গা মুখস্থ করার উপযুক্ত সময় এটি। ঢাকার বাইরের পরিবেশের কথা বলা যেতে পারে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রীদের অভিভাবক গ্রামীন চাষী কিংবা দরিদ্র জনগণ। বড়বড় ক্লাসে খরচা করে পড়ানোর পয়সা তাদের নেই, কতজনের বাবাই বা পারেন ঢাকাতে পাঠিয়ে ছেলেকে পড়াতে? এখানে একটা প্রশ্ন আসতে পারে, উচ্চশিক্ষা কি শুধু ঢাকাতেই অবস্থান করে? গ্রামে কি উচ্চ শিক্ষা নেই? যদি তাই হতো তাহলে বড় বড় উচ্চবিত্ত লোকজন গ্রামে বুড়ো বুড়েকে রেখে ঢাকায় পড়ে থাকতো না। দেশে প্রধান মন্ত্রীতো একজন, রাষ্ট্রপতিও একজন তবে তারা কেন ঢাকাতে থাকেন? গ্রামের লোকেদের ধারনা ঢাকাতে গেলে বাবু হওয়া যায়। বর্তমান করের বোঝা মাথায় নিয়ে অর্থমন্ত্রী আছেন খুবই দু:শ্চিন্তায়, সুযোগ পেলেই হয়তো কোন কিছুর উপর কর চাপিয়ে দেবেন। বয়সের ভারে অর্থমন্ত্রী হয়তো করের উৎস মোট কতটি সেটা মনে রাখতে পারবেন না। শিক্ষার উপর করারোপ করার চেষ্টা ব্যর্থ হলেও, তাঁর মাথার চিন্তা কোনক্রমেই থেমে নেই। মেডিটেশনের উপরও করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, সরকারি চাকুরিজীবিদের চাকুরি ভাতা বৃদ্ধি করে গ্রামীন কৃষকদের গোলার ধান জোর করে টেনে হেচড়ে আনছে। বাবুদের পেশাভিত্তিক কর্মকাণ্ডে মজুরিতে খুশি হলেও একশ্রেণীর মানুষের সরকারের চাহিদা মেটাতে মাথার ঘাম পায়ে পড়ছে আরও দ্বিগুন হারে। এদিক থেকে তাদের কষ্টের পরিমাণটা বেড়েছে আরও বেশি। এঅবস্থায় গ্রামীন পরিবেশে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণহীন ও ঘরে ঘরে যেভাবে অসুস্থতার পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতেকরে গ্রামীন একটা শিশুর অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াতো দূরে থাক পঞ্চম শ্রেণীর পিএসসি পরীক্ষা মাড়িয়ে যেতে পারবে বলে আমার সন্দেহ হয়।
-লেখকঃ সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ লেখক পরিষদ