জিপিএ ফাইভ পাওয়া বিসিএস অফিসার!!

254

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ
দেখতে দেখতে অর্ধেক রমজানই চলে গেল। আজকাল খুব তাড়াতাড়ি রমজান চলে যাচ্ছে। ছেলেবেলায় রমজান শুরু হলে আর শেষ হতে চাইতো না। প্রতিদিন আঙ্গুলের কড়ি দিয়ে গুনে গুনেও রমজান শেষ করতে পারতাম না। কোনমতে তিন রোজা যাবার পরে রোজা আর এগুতো না। যেমন তেমন ব্যাপার! গুনে গুনে ত্রিশটি রোজা শেষ করা ত্রিশ বছরের মত মনে হতো। এখন বয়স হয়েছে; অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। আর কেমন যেন রোজাও দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। ছোটবেলায় রোজা শেষে ঈদের সালামী পেতাম বাবা-মায়ের কাছ থেকে। এই আশায় দিন গুনতাম। দিন আর এগুতো না; ঈদও আসতো না। এখন পাই না কিছুই; উল্টো দিতে হয়। বেতন, বোনাস সব দেবার ব্যবস্থা করতে করতেই ঈদ চলে আসে।
ছোটবেলায় রমজান আসতো অন্যভাবে সময় উপভোগ করার বার্তা নিয়ে। সারাদেশটাই যেন ঝিমিয়ে পড়তো। থেমে যেত কোলাহল, বেড়ে যেত ইবাদত বন্দেগী। আমরা শিক্ষার্থীরা সারা বছরের সব জটিল বিষয়গুলো জমিয়ে রাখতাম রমজানে শেষ করবো বলে। বছরের সবচেয়ে লম্বা ছুটি মিলতো এই রমজানে। প্রায় দেড়মাসের লম্বা ছুটিই ছিল পড়াশুনা গুছিয়ে নেবার প্রকৃত সময়। ভর দুপুরে কয়েক বন্ধু মিলে স্কুলে এসে স্যারদের কাছে প্রাইভেট পড়তাম। স্যাররা রোজামুখে পড়াতেন; আমরাও রোজামুখে সব শিখে নিতাম।
সেহরী খেয়ে ফজর নামাজ পড়ে আর ঘুমাতাম না। পড়তে বসে যেতাম। একেবারে সকাল আটটা অবধি পড়তাম। এরপর কিছুক্ষন ঘুমিয়ে নিয়ে জোহরের পরে চলে যেতাম প্রাইভেট পড়তে। এসএসসি দেবার বছর তো আরো পড়ার ধুম। যেমন করেই হোক, স্টার মার্ক তো ভাল; স্ট্যান্ড করতে হবে। ফার্স্ট ডিভিশন তো কিছুই না। সিলেবাসের কোন কিছুই পড়ার বাকী থাকতো না। এর বাইরেও খোঁজাখুজি চলতো। টেস্ট পেপার পড়ে তন্ন তন্ন করে ফেলা হতো। যেদিন রেজাল্ট হতো, তার পরদিনের পত্রিকার পাতা জুড়ে থাকতো সারাদেশে ভাল ফল করা শিক্ষার্থীদের ছবিসহ সাক্ষাৎকার। সাথে গর্বিত বাবা-মায়ের ছবিও থাকতো। এ নিয়মই চলে আসছিল দিনের পর দিন। এখন দিন বদলেছে, নিয়মও পাল্টেছে; ফূর্তি করার ধরনও বদলেছে। এখন দল বেঁধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ঢোল বাজিয়ে, রং ছিটিয়ে উল্লাস করে। আগে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে একজন স্ট্যান্ড করলেই সারা এলাকায় রব পড়ে যেত। এখন পুরো স্কুলের সবাই জিপিএ ফাইভ পেলেও কলরব হয় না তেমন। আগেকার দিনে ফার্স্ট ডিভিশন না পেলে শিক্ষার্থীরা যেমন মন খারাপ করতো, এখন জিপিএ ফাইভ না পেলে একই ধাঁচের মন খারাপ করে।
গ্রেডিং বলি আর ডিভিশন বলি, ব্যক্তিগতভাবে আমি পাবলিক পরীক্ষা অর্থাৎ বোর্ডের অধীনে এককেন্দ্রিক পরীক্ষা, কোনটির পক্ষেই নই। যারা আমাকে কোনদিন দেখেনও নি, চেনেনও না, তারাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুটি একাডেমিক সার্টিফিকেট দিয়ে দেন। এটা একটা কথা হলো? আবার এমন পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস করে জাতিকে বাঁশ দেবারও সুযোগ থাকে। একজনের খাতা অন্যজনের দেখাদেখির সুযোগ আর উত্তরপত্র নিয়ে দূর্নীতিরও সুযোগ থাকে। সবই আসলে ফালতু ব্যাপার। একজন শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন হবে প্রতিদিন প্রতিটি ক্লাসে, তার আচরনে, তার মেধা আর মননশীলতার বিচারে। সারা বছরের সব পারফরমেন্সের মূল্যায়ন করে তাকে গ্রেডিং করা হবে। মাত্র তিন ঘন্টার একটি পরীক্ষা আর অচেনা, অজানা কোন শিক্ষক দিয়ে তার উত্তরপত্র মূল্যায়ন; এ দিয়ে আর যাই হোক একজন শিক্ষার্থীর মেধা কোনভাবেই যাচাই করা যায় না।
যায় যে না, সেটা তো পরিস্কার করেছে “মাছরাঙ্গা টিভি” ক’দিন আগেই। ঢাকার বেশ ক’টি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের জিপিএ ফাইভ পাওয়া ক’জন শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎকারমূলক অনুষ্ঠান প্রচার করেছে। যদিও আমি এই অনুষ্ঠানটির ঘোর বিরোধী। দেশের মানুষের সামনে কোমলমতি শিশুদের এভাবে লজ্জা দেয়া মোটেই ঠিক হয়নি। যেসব প্রশ্ন করা হয়েছে, আমার ধারণা মাইক্রোফোন হাতের লোকটিও সবগুলোর উত্তর জানেন না। এর মাধ্যমে সরকার বা শিক্ষামন্ত্রীকে একহাত নেওয়া গেলেও বাচ্চাদের প্রতি ঘোর অন্যায় করা হয়েছে। মানলাম লেখাপড়ার মান ভালো নয়। যে যা জানার না জেনেই নম্বর পাচ্ছে। তাঁরায় তাঁরায় ভরে যাওয়া ফলাফলের আকাশে চাঁদ নেই, সূর্যও নেই। কিন্তু বাচ্চারাতো এজন্য দায়ী না। তারা কিছু নিয়ন্ত্রণ করে না। তাদের অভিভাবকরাও না। টিভির সাথে জড়িতরা একবারও তা ভাবলেন না?
প্রমান করে দিলেন, শিক্ষার্থীরা সব জানে না। কিন্তু না শেখালে জানবে কিভাবে? জানবার সুযোগ পেলে না জানবে! পরীক্ষা পদ্ধতিটা এমনি যে এখানে খুব ভালকরে না জেনেও জিপিএ ফাইভ পাওয়া যায়। পরে এরাই সব বিখ্যাত ব্যক্তিদের জন্ম তারিখ, নাম আর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজধানী এবং মুদ্রার নাম মুখস্ত করে বিসিএস অফিসার হয়ে যায়। আগে অন্তত তাদের সম্মন্ধে আমার ধারনা উঁচু ছিল। কিন্তু গেল ৩১শে মে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম পাঁচ টাকার নোট ইস্যু প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রনালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেখে সে ধারনাটিও পাল্টে গেল।
কোন এক বিসিএস অফিসার কর্তৃক স্বাক্ষরিত ঐ প্রেস বিজ্ঞপ্তি আমার হাতে এসেছে। বাংলায় লেখা মোট ১৪ লাইনের ঐ বিজ্ঞপ্তিতে ৮টি বানান ভুল। এমনকি জাতির পিতার নামের বানান পর্যন্ত ভুল। ভুলে ভরা দেশের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার কারনেই বিসিএস আমলা, নাকি ভাতের গামলা হচ্ছে, সেটা ভাবার সময় এসেছে। যে দেশের প্রশাসন ক্যাডারের বিসিএস অফিসার বাংলা বানানই ঠিকমত জানেন না সে দেশের বারোটা বাজতে যে আর বাকী নেই এটা ভেবেই মাথা আমার নষ্ট হবার যোগাড়। আধা নষ্ট মাথা নিয়ে সেদিন টিভি দেখতে দেখতে সোফাতেই মাথা এলিয়ে দিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই। তবে ঘুমের মধ্যে যে স্বপ্নটি দেখেছিলাম তা পরিস্কার মনে আছে। কয়েকজন জিপিএ ৫ পাওয়া ছেলেমেয়ে নিয়ে বসে আছি। লক্ষ্য করছি ওরা যত না পড়াশুনা নিয়ে গল্প করছে, তার চেয়ে ঢের বেশী করছে দেশের রাজনীতি আর ফেসবুক নিয়ে। সাংঘাতিক জ্ঞান ওদের এসবের উপর। এক পর্যায়ে ওদের থামিয়ে আমি শুরু করলাম। প্রথমেই জানতে চাইলাম, GPA মানে কি? ঝটপট উত্তর; মানে আবার কি: GPA – “যে প্রশ্ন আগে”। আমি স্তম্ভিত। যে সিস্টেমে পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন পায় সেটাই GPA । আপনি বোকা নাকি? কিভাবে প্রশ্নট্রশ্ন ফাঁসটাশ হয় দেখেন না! পটপট করে ওরা বলে গেল। তাহলে গোল্ডেন জিপিএ মানে কি? আমার পাল্টা প্রশ্ন। যখন কেউ সবগুলো বিষয়ে গোল দেন মানে A+ পান সেটাই হলো গোল্ডেন জিপিএ। ওদের তড়িৎ উত্তর।
হা হয়ে শুনছিলাম ওদের কথা। এবার বললাম, BCS মানে কি? খিলখিল করে উত্তর দিল, এইটা সবাই জানে; Best choice of services(BCS)! আমি হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছিলাম না। মোটামুটি নিজেকে সামলে নিয়ে জানতে চাইলাম, রাজনীতি বোঝ? ওরা হাসতে হাসতে বললো,
বুঝবো না কেন? প্রশ্ন করেই দেখেন।
-ওকে! দেশের বড় দু’টি দলের নাম বল।
-এটা তো সোজা প্রশ্ন; পোলাপাইনেও পারে। আওয়ামী লীগ আর বিএনপি।
-গুড, এবার বলো, কবি নজরুল কোন দল করতেন?
-কেন, ছাত্রদল!
-কিভাবে বুঝলে?
-তিনি তো নিজেই লিখে গেছেন, আমরা শক্তি আমরা বল, আমরা ছাত্রদল।
-ও, আচ্ছা। তাহলে কবিগুরু রবি ঠাকুর?
-তিনিও বিএনপি করতেন। না হলে কি তিনি “নৌকাডুবি” উপন্যাস লিখতেন? নৌকা সমর্থক কোন মানুষ কোনদিনই নৌকাকে ডোবাবেন না। আবারো হি হি করে হাসি।
-তোমরা কোন দল করো?
-নো আওয়ামী লীগ, নো বিএনপি!
-সেটা বুঝলাম। কিন্তু, কোন দল করো?
-ফেসবুক দল! আমরা শক্তি আমরা বল, আমরা ফেসবুক দল!!!!!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা