জাসদ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি কেন, ইনুর প্রশ্ন

42

স্বাধীনতা পরবর্তী জাসদের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের এক বক্তব্যের পর তার সমর্থনে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানান ইনু। জাসদ বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের অংশীদার। শেখ হাসিনার সরকারে তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন দলটির বর্তমান সভাপতি ইনু।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, “বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে জাসদকে জড়ানোর যে অপচেষ্টা বা ষড়যন্ত্র, এটার কোনো ভিত্তি নেই।…দীর্ঘ তদন্ত শেষে দীর্ঘদিন বিচার প্রক্রিয়া শেষে বিচারকরা রায় ও পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। সাক্ষীর জেরা থেকে অভিযোগপত্র কোনো জায়গায় জাসদ সম্পর্কে একটি শব্দও লেখা নেই।” ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে জাসদ গঠনের পর বঙ্গবন্ধু হত্যার আগে-পরে দলটির বিভিন্ন কার্যক্রম গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, “যারা একই সুরে জাসদের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করেছেন, আমি তাদের সঙ্গে কোনো বাকযুদ্ধে লিপ্ত হতে চাচ্ছি না। “আমি শুধু বলব, হঠাৎ করে জাসদকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি কেন শুরু করলেন, আমি জানি না। বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা একই ভাষায় একই ধরনের সমালোচনার যোগসূত্র কী, এটাও আমি জানি না।”
গত ২৩ অগাস্ট জাতীয় শোক দিবসের এক অনুষ্ঠানে শেখ সেলিমকে উদ্ধৃত করে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, “স্বাধীনতাবিরোধীরা কখনও বঙ্গবন্ধুর ওপর আঘাত হানতে পারত না, যদি এই গণবাহিনী, জাসদ বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করে বিভিন্ন জায়গায় ডাকাতি করে, মানুষ হত্যা করে, এমপি মেরে পরিবেশ সৃষ্টি না করত। সুতরাং বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল রহস্য বের করতে হবে, কারা কারা জড়িত ছিল।” শেখ সেলিমের বক্তব্যের পরের দিন বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপনও সংবাদ সম্মেলনে জাসদের ১৯৭২-৭৫ সময়কার ভূমিকার তদন্ত দাবি করেন। এরপর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ আবার বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্র তৈরির জন্য জাসদকে দায়ী করে বক্তব্য দেন। বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও বলেন, ইনুরা তখন অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন।
শেখ সেলিম যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা ১৪ জোটের বৃহত্তম শরিক আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান নয় বলে মনে করছেন জাসদ সভাপতি ইনু। তবে তার মতে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের অভিন্ন বক্তব্যে তাদের জোটের ঐক্যর ভেতর বিভ্রান্তির জাল তৈরি করছে। আওয়ামী লীগ থেকে সমালোচনা হওয়ায় জোট থেকে বেরিয়ে যাবেন কি না- সাংবাদিকদের এ প্রশ্নে ইনু বলেন, “এটা তো আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান না। “আওয়ামী লীগ ও জাসদ নীতিগতভাবে ঐক্যবদ্ধ, আন্দোলন-নির্বাচন এবং সরকার পরিচালনায় আমরা একসঙ্গে আছি এবং আমরা মনে করি, এই লড়াইটা শেষ পর্যন্ত নেওয়ার জন্য ঐক্য দরকার।”
বঙ্গবন্ধুর রক্ত মাড়িয়ে মোশতাক আহমেদের মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগ নেতাদেরই যোগদানের দিকে ইঙ্গিত করে ইনু বলেন, “হালুয়া-রুটির ভাগের জন্য মোশতাক সরকারে কারা ভিড়েছিল, তা সবাই জানে।” পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর মোশতাকের সরকারে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার দেড় ডজন সদস্য যোগ দিয়েছিলেন। এদের অনেকেই পরে বিএনপি ও জাতীয় পার্টিতে সক্রিয় হন। তবে আব্দুল মান্নান, আব্দুল মোমেন, দেওয়ান ফরিদ গাজীসহ কয়েকজন ফিরে আসেন আওয়ামী লীগে। ইনু বলেন, “জাতীয় চার নেতাসহ হাতে গোনা কয়েকজন ত্যাগী নেতা ছাড়া বহুজনই সেই দিন মোশতাকের করুণাভিক্ষার জন্য হালুয়ারুটির ভাগাভাগির জন্য তার চারপাশে ভিড় জমিয়েছিল।”
পঁচাত্তরে মোশতাক সরকারের বিরোধিতা করে জাসদের প্রচারপত্র বিলির কথাও তুলে ধরেন দলটির সভাপতি। “মোশতাকের ৮৩ দিনের শাসনকালে জাসদের অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, ৭০ এর বেশি নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। মোশতাকের ক্ষমতা দখলের পরে জাসদের কোনো নেতা এবং দলগতভাবে জাসদ মোস্তাকের সঙ্গে হাত মেলায়নি।”
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সঙ্গে জাসদকে জড়িয়ে যারা কথা বলছেন তারা ইতিহাস না জেনে অথবা সচেতনভাবে অন্য কোনো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলেও দাবি করে ইনু। “জঙ্গিবাদ, মৌলবাদের বিরুদ্ধে জানবাজির লড়াই চলছে…খালেদা জিয়ার হত্যা, খুনের ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে চলেছি। সেই সময়ে কতিপয় ব্যক্তি এমন কিছু কথা বলা শুরু করেছেন, যা ঐক্যের ভেতর বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে।”
জাসদের উপর আক্রমণের মধ্য দিয়ে বিএনপি-জামায়াতকে বাঁচানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে কি না- সেই প্রশ্ন তুলে তথ্যমন্ত্রী বলেন, এই আক্রমণ বিএনপি-জামায়াত ও জঙ্গিবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াইকে দুর্বল করবে, তাদের রাজনৈতিকভাবে আড়াল করবে।
“মহাজোট সরকারের সফলতা যাদের সহ্য হচ্ছে না, তারাই ঐক্যর ভেতর বিভ্রান্তির জাল তৈরি করছেন।”